মক্কা শরিফের জুমার খুতবা
মানব পাচার রোধে নির্দেশনা
শায়খ ড. সাউদ বিন ইব্রাহিম আশ শুরাইম
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আল্লাহতায়ালা বনি আদমকে সম্মানিত করেছেন। জলে-স্থলে তাদের ভ্রমণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তাদের উত্তম রিজিক দান করেছেন। অন্যান্য মাখলুকের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। তিনি বনি আদমের জন্য একটি শরিয়ত প্রণয়ন করেছেন। যাতে দৃঢ়ভাবে মানবাধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মানুষের ওপর অর্পিত দায়িত্বসমূহের কথা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। ইসলামি শরিয়ত ছাড়া অন্য কোনো জীবনব্যবস্থা এত সুন্দরভাবে মানুষের অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারেনি। কারণ, মানুষের এ সম্মান আল্লাহপ্রদত্ত; কোরআনের ভাষায় প্রমাণিত। এগুলো কোনো ব্যক্তির আবেগসঞ্জাত নয়, এটি পরিপূর্ণ। এতে পূর্ণতা সাধনের জন্য সংযোজনের প্রয়োজন নেই। পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, পৃথিবীতে যত মানবাধিকার সংস্থা, যত সংগঠন আর মানুষের অধিকার রক্ষায় তাদের যত আইন-কানুন, এর মধ্যে যেগুলো সুন্দর, শ্রেয় ও কল্যাণকর, তার পূর্বধারণা ইসলামে অবধারিতভাবে বিদ্যমান। কারণ, ইসলাম আল্লাহপ্রদত্ত জীবনবিধান। এটি আল্লাহর রঙ। আল্লাহর রঙের চেয়ে সুন্দর রঙ আর কী হতে পারে! হুজাইফা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) আমাদের খুতবা দিতে উঠলেই কেয়ামত পর্যন্ত কী হবে না হবে, বলে দিতেন। কেউ বুঝত, কেউ বুঝত না।’ (বোখারি : ৬৬০৪; মুসলিম : ২৮৯১)।
মানুষের ন্যূনতম অধিকার : সাধারণ মানবাধিকার সংরক্ষণ শরিয়তের অন্যতম আইন। রাসুল (সা.) এ ব্যাপারে খুবই গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমাদের রক্ত, সম্পদ, সম্মান, চর্ম তোমাদের ওপর হারাম ও সম্মানিত। যেমন সম্মানিত আজকের দিন, এ মাস এবং তোমাদের এ দেশ।’ (বোখারি : ৭০৭৮ )। এ হাদিসে রাসুল (সা.) সাধারণ মানবাধিকারের প্রতি খুবই গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি মানুষের রক্ত হারাম করেছেন; কেউ কারও জীবন অন্যায়ভাবে বধ করতে পারবে না। হারাম করেছেন চর্ম; কেউ কারও শরীরে অন্যায়ভাবে আঘাত করতে পারবে না। কারও অঙ্গহানি করতে পারবে না। পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করা হারাম করেছেন। কম হোক, বেশি হোক জোরপূর্বক কেউ কারও সম্পদ গ্রহণ করতে পারবে না। এমনকি হারাম করেছেন কারও সম্মান হরণকে। ব্যভিচার, সমকামিতা, ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ বা এ জাতীয় কোনো কাজের মাধ্যমে কারও সম্মানে আঘাত করা যাবে না। এর সবই চরম পর্যায়ের হারাম।
মানব পাচারের ভয়াবহ পরিণাম : বর্তমানে মানবসমাজ একটি ভয়ঙ্কর সমস্যায় জর্জরিত। দিন দিন এর ক্ষতি বেড়েই চলেছে। এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন কাজ করছে। বিভিন্ন শাস্তির ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। তবুও এর প্রকোপ যেন থামছেই না। সমস্যাটি হলো ‘মানব পাচার’। মানব পাচার মূলত চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। বর্তমান পরিভাষায় মানব পাচার হলো, কিছু মানুষকে জোরপূর্বক বা ধোঁকা দিয়ে কিংবা অর্থের লোভ দেখিয়ে কোনো দলে ভর্তি করা বা স্থানান্তর করা, আশ্রয় দেওয়া; যাতে পাচারকৃত ব্যক্তি পাচারকারীর জন্য বা তার নির্দেশমতো কাজ করে। মানব পাচার শুধু মানুষ কেনাবেচার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যদিও কেনাবেচা এর একটা অংশ। মানব পাচারের অনেকগুলো স্তর আছে। সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে কারও জীবন নিয়ে খেলা করা; আর সর্বনিম্নে রয়েছে মানুষের সম্মান ও পবিত্রতা ধ্বংস করা। পাচারের পর তাকে দিয়ে টাকা কামানো হয়, জোরপূর্বক ভিক্ষা করতে বাধ্য করা হয়। মোটকথা, মানব পাচার যেন আরেকজনের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া। পার্থিব সামান্য স্বার্থসিদ্ধির জন্য পাচারকৃতের বুদ্ধি, সম্মান, সম্পদ ও ব্যক্তিত্ব নিলামে তোলা হয়। ব্যবসা যদি একটি সম্মানিত পেশা হয়ে থাকে, তাহলে এরই চরম ঘৃণ্য রূপ হলো মানব পাচার।
মানব পাচারের সবচেয়ে ঘৃণ্য ধরন : মানুষের সামাজিক সংকট বা দুর্যোগকে কাজে লাগিয়ে মানব পাচারের বাজার রমরমা করাই মানব পাচারের সবচেয়ে ঘৃণ্য লক্ষ্য। যখন সবাই সংকটের মোকাবিলায় ব্যস্ত, ঠিক তখন কিছু মানুষ নিজেদের আখের গোছাতে যার পরই-না মরিয়া। চোর নানা ধরনের আছে। কেউ পথে-ঘাটে মানুষের সম্পদ চুরি করে, কেউ ঘরে সিঁদ কাটে; কিন্তু আরেক প্রকার চোর হলো দুর্যোগ চোর। এরা মানুষের সংকটের সময়কে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লুটে। মানব পাচার সম্পূর্ণ একটি কালোবাজারি প্রক্রিয়া, নিকৃষ্ট ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এর কোনো ভালো দিক নেই। এটি কারও সমস্যার সমাধান করে না; বরং এতে রয়েছে কালো টাকা সাদা করার পরিবর্তে তার বৈধ ব্যবহারের প্রচেষ্টা। এটি একটি নিকৃষ্ট কাজ।
এতে দুর্বল মানুষের সরলতাকে পুঁজি করে তাদের অধিকার ও স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়া হয়; যাতে তারা পাচারকারীর কাছে দাসের মতো অনুগত থাকে। মানব পাচারকারীরা যদি তাদের কর্মকাণ্ডের নিকৃষ্টতা অনুধাবনে সচেষ্ট হতো, তাহলে কিছুতেই এ ঘৃণ্য কাজে পা বাড়াত না। আবু মাসউদ বদরি (রা.) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, একবার আমার দাসকে ছড়ি দিয়ে প্রহার করলাম। তখন পেছনে কারও আওয়াজ টের পেলাম। ফিরে দেখি, রাসুল (সা.)। তিনি বললেন, ‘তুমি এ গোলামের ওপর যতটা ক্ষমতা রাখ, আল্লাহ তোমার ওপর তার চেয়েও অধিক ক্ষমতা রাখেন।’ বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাকে মুক্ত করে দিলাম।’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘এটি না করলে তুমি জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হতে।’ (মুসলিম : ১৬৫৯)।
মানব পাচারের জঘণ্য বর্ণনা : নানাভাবে মানুষ পাচারের শিকার হয়। এ ক্ষেত্রে মানুষের দুর্বলতাকেই বেশি কাজে লাগানো হয়। পাচার করে তাদের দিয়ে মাদক চাষ করানো হয়, মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করানো হয়, কখনও জোরপূর্বক ভিক্ষাও করানো হয় কিংবা তাদের দিয়ে কারও অঙ্গহানিও করানো হয়। বিনিময়ে তাদের সামান্য অর্থ দেওয়া হয়। আয়ের বড় অংশ নিয়ে নেয় পাচারকারী। বাধ্যতামূলক কোনো কাজ করানোর জন্য মানুষ সংগ্রহটাও মানব পাচারের অন্তর্ভুক্ত। অনেক মানুষই এর শিকার হয়। সমাজে পাচারকারীদের দালাল ছড়ানো থাকে। তাদের মাধ্যমে পাচারকারীরা আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলার চেষ্টা করে। দালালদের ঢাল বানিয়ে পাচারকারীরা অবৈধ উপার্জন করে। মানব পাচারের আরেকটি বড় ক্ষেত্র আছে; যেখানে দুর্বল মানুষকে নানাভাবে দেশান্তরের চেষ্টা করা হয়। তাদেরকে নিজ দেশ ত্যাগ করে অভিবাসী হিসেবে অন্য দেশে আশ্রয় গ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়। নানা প্রলোভনে ফাসানো হয়। তারা দেশ ত্যাগে প্রস্তুত হয়ে যায়। নানা ঝুঁকির মোকাবিলা করে, ভয়-ভীতির সম্মুখীন হয়ে অবশেষে পৌঁছাতে পারে প্রতিশ্রুত দেশে। এরপর তাদের নিয়ে শুরু হয় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। বাধ্যতামূলক দেহব্যবসায় জড়ানো হয়। ঠেলে দেওয়া হয় ধ্বংসাত্মক কাজে। তাদের দিয়ে পাচারকারীরা নিজেদের নানা মতাদর্শিক স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করে। এতে যদিও তাদের বাহ্যিক কোনো অর্থনৈতিক লাভ থাকে না; কিন্তু ভবিষ্যতে এর যে চৈন্তিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত সঙ্কট তৈরি হয়, তা অর্থনৈতিক অপরাধের চেয়ে কম কিছু নয়।
মানব পাচার ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি : মানব পাচার একটি নতুন পরিভাষা। ইসলামে সরাসরি এ ব্যাপারে কিছু নেই। তবে ইসলাম এমন কিছু কাজের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যেগুলোর সমষ্টি দিয়েই মানব পাচারের ধারণা গঠিত হয়েছে। শরিয়তের মৌল লক্ষ্যসমূহ সম্পর্কে যারা অবগত, তারা মানব পাচারকে নির্দ্বিধায় শরিয়তবিরোধী বলে সাব্যস্ত করবেন। উদাহরণস্বরূপ, নারীকে দিয়ে দেহব্যবসার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন। ইসলামে এটি নিষিদ্ধ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘পার্থিব স্বার্থসিদ্ধির জন্য তোমরা নিজ দাসীদের ব্যভিচারে বাধ্য করো না, যদি তারা পবিত্র থাকতে চায়। (সুরা নুর : ৩৩)। ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘জাহেলি যুগে মানুষ নিজ দাসীদের ব্যভিচারের জন্য পাঠাত। প্রতিবার ব্যভিচারের জন্য তারা একটি ফি নির্ধারণ করত। ইসলাম এসে মুসলমানদের এ থেকে নিষেধ করেছে।’ এসব নির্দেশনা ও বিধান মানব পাচারের মাধ্যমে সংঘটিত নানা অপরাধের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তাই ব্যক্তি, সমাজ ও সব মানবাধিকার সংস্থার মানব পাচার রোধে কাজ করা উচিত। তাদের সব অপকৌশলের পথ বন্ধ করে দিতে হবে। তারা দুর্বলদের ঘাড়ে পা ফেলে ওপরে উঠতে চায়। পরের ঘর অন্ধকার করে নিজেদের ঘর আলোকিত করার চেষ্টা করে। অন্যের দারিদ্র্যের সুযোগে নিজেরা কাড়ি কাড়ি সম্পদ লাভ করতে চায়। তাদের কোনো ধরনের সহযোগিতা করা যাবে না। এমনকি তাদের অপরাধের ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করাও যাবে না। এটিও তাদের গর্হিত কাজে সহযোগিতার নামান্তর।
মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন- মুফতি মুইনুল ইসলাম
