পরিবারের ব্যয়ভার গ্রহণের বিধান

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ

প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করার বিষয়টি পার্থিব মনে হলেও এটি মহান দায়িত্ব ও কর্তব্য। কোরআন ও হাদিসের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা হলো, ব্যক্তি কৃপণতা ছাড়াই পরিবারের জন্য খরচ করবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সন্তানের পিতার ওপর সন্তানের মায়ের জন্য উত্তম পন্থায় অন্ন-বস্ত্রের ব্যবস্থা করা একান্ত দায়িত্ব।’ (সুরা বাকারা : ২৩৩)। এ আয়াতের মর্মার্থ হলো- শিশুকে স্তন্যদান করা মায়ের দায়িত্ব। আর মায়ের ভরণ-পোষণ ও জীবন ধারণের অন্যান্য যাবতীয় খরচ বহন করা পিতার দায়িত্ব। এ দায়িত্ব ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ শিশুর মা স্বামীর বিয়েবন্ধনে থাকে বা তালাক-পরবর্তী ইদ্দতের মধ্যে থাকে। তালাক ও ইদ্দত অতিক্রান্ত হলে স্ত্রী হিসেবে ভরণ-পোষণের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়; কিন্তু শিশুকে স্তন্যদানের পরিবর্তে মাকে পারিশ্রমিক দিতে হবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের ওপর তাদের অধিকার হলো, তোমরা (যথাসম্ভব) তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ ও আহারের ব্যবস্থা করবে।’ (তিরমিজি : ৩০৮৭)।

 

হাদিসের ভাষায় উত্তম অর্থ : যে পরিমাণ অর্থ পরিবারের পেছনে খরচ হয়, সেটিই উত্তম অর্থ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। রাসুল (সা.)-এর ভাষায়, ‘মানুষের সর্বোত্তম মুদ্রা সেটি, যা সে তার পরিবারের খরচে ব্যয় করে।’ (মুসলিম : ৯৯৪)। তবে সামর্থ্যরে বাইরে চাপাচাপি আরোপ করে না ইসলাম। তাই সামর্থ্যানুযায়ী খরচ করতে হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সচ্ছল ব্যক্তি তার সচ্ছলতা অনুসারে ব্যয় করবে। আর যার রিজিক সীমিত করা হয়েছে, সে ব্যয় করবে আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন, তা থেকে। আল্লাহ যাকে যতটা দিয়েছেন, তার অতিরিক্ত বোঝা তার ওপর চাপান না। আল্লাহ কষ্টের পর সহজ করে দেবেন।’ (সুরা তালাক : ৭)। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ তার পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করতে কৃপণতা করে, তাহলে সে পাপী হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কেউ পাপী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার ওপর নির্ভরশীলদের রিজিক নষ্ট করে।’ (সুনানে আবি দাউদ : ১৬৯২)।

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্ব : আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার অসিলা দিয়ে তোমরা একে অপরের কাছে আত্মীয়তার অধিকার প্রার্থনা কর।’ (সুরা নিসা : ১)। অন্য আয়াতে এসেছে, ‘আত্মীয়-স্বজনরা একে অন্যের তুলনায় অগ্রগণ্য, আল্লাহর কিতাবে। নিশ্চয় আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ে মহাজ্ঞানী।’ (সুরা আনফাল : ৭৫)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার রিজিকের প্রশস্ততা ও হায়াত বৃদ্ধি চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (বোখারি : ২০৬৭)। রাসুল (সা.) আরও বলেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (বোখারি : ৫৯৮৪)।

ভরণ-পোষণের দায়িত্ব যেভাবে বর্তায় : ভরণ-পোষণের ব্যয়ভার দুটি কারণে বর্তায়- এক. বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে, দুই. আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে। শরিয়ত বিয়ের পর থেকেই স্বামীর ওপর স্ত্রীর জন্য যেসব অধিকার সাব্যস্ত করেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো- স্ত্রীর ব্যয়ভার গ্রহণ করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা স্ত্রীদের জন্য তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী নিজেদের ঘরে বাসস্থানের ব্যবস্থা কর।’ (সুরা তালাক : ৬)। হাদিসে স্ত্রীদের ব্যাপারে রাসুল (সা.) পুরুষদের নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তুমি যখন খাবে, তাকেও খাওয়াবে এবং যখন পরবে, তাকেও পরাবে। চেহারায় কখনও প্রহার করবে না, অসদাচরণ করবে না।’ (সুনানে আবি দাউদ : ২১৪২)।

আত্মীয়তার সম্পর্কে ব্যয়ভার : আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে যারা ভরণ-পোষণের খরচ পেতে পারে, এককথায়- শরিয়তের ভাষায় তারা হলো, রক্তের সম্পর্কের মাহরাম আত্মীয়-স্বজন। এরা হলেন চার ধরনের আত্মীয়-স্বজন- ১. মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি ও তাদের ঊর্ধ্বতন। ২. ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি ও তাদের অধস্তন। ৩. ভাইবোন ও তাদের সন্তান। ৪. চাচা-ফুফু, মামা-খালা। তবে একসঙ্গে সবার খরচ চালানো একপক্ষের ওপর ওয়াজিব নয়, বরং এ ক্ষেত্রে শরিয়ত নিকটবর্তী ও দূরবর্তীদের মধ্যে স্তর নির্ধারণ করে দিয়েছে। প্রত্যেক পক্ষের নিকটবর্তী আত্মীয়ের উপস্থিতি ও সামর্থ্য অবস্থায় দূরবর্তীদের ওপর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব বর্তাবে না। তবে নিকটবর্তীর অনুপস্থিতি ও অসামর্থ্যতায় দূরবর্তীদের ওপরও ভরণ-পোষণের দায়িত্ব বর্তাবে। (তাবয়িনুল হাকায়েক : ৩/৬৩)।

মা-বাবা ও ঊর্ধ্বতন আত্মীয়ের ব্যয়ভারের শর্ত : মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি- এ ধরনের ঊর্ধ্বতন আত্মীয়রা ভরণ-পোষণের অধিকারী হওয়ার জন্য শর্ত দুটি- এক. তারা এমন দরিদ্র হতে হবে যে, নিজের মালিকানার সম্পদে চলতে অক্ষম। এখন কথা হলো, যদি তারা উপার্জনের শক্তি রাখে, তাহলেও তাদের সন্তানদের ভরণ-পোষণ দিতে হবে কিনা? এ ক্ষেত্রে বিধান হলো, তাদের উপার্জনের শক্তি থাকলেও যদি তাদের কাছে চলার মতো নগদ টাকা-কড়ি না থাকে, তাদের সন্তানদের ভরণ-পোষণ দিতে হবে। তাদের সন্তানরা এ কথা বলতে পারবে না যে, আপনি তো উপার্জনে সক্ষম, আপনি নিজে উপার্জন করে চলুন। তবে যদি তারা ধনী হন, অর্থাৎ তাদের মালিকানায় নগদ এমন সম্পত্তি থাকে, যা দ্বারা তারা শান্তিতে দিনাতিপাত করতে পারেন, তাহলে সন্তানদের ওপর তাদের ভরণ-পোষণ দেওয়া ওয়াজিব নয়।

দুই. সন্তান-সন্ততি সামর্থ্যবান ও উপার্জনে সক্ষম হতে হবে। তাদের সামর্থ্যবান হওয়ার পরিমাণ হলো, তাদের মালিকানার সম্পত্তি বা উপার্জনকৃত আয়ের দ্বারা নিজের ও নিজের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির স্বাভাবিক ভরণ-পোষণের পর অতিরিক্ত সম্পদ থাকতে হবে। অন্যথায় তাদের উপার্জনকৃত আয়ের মধ্য থেকে যদি তার নিজের ও স্ত্রী বা সন্তান-সন্ততির ভরণ-পোষণের অতিরিক্ত সম্পদ না থাকে, তাহলে মা-বাবা ও ঊর্ধ্বতন আত্মীয়ের ভরণ-পোষণ দেওয়া ওয়াজিব নয়। যদিও এ ক্ষেত্রে উত্তম হলো, কষ্ট হলেও যথাসাধ্য মা-বাবারও ভরণ-পোষণের খরচ চালিয়ে যাবে। (তাবয়িনুল হাকায়েক : ৩/৬৪; রদ্দুল মুহতার : ২/৬৭৮)। এ ব্যাপারে রাসুল (সা.) বলেন, ‘খরচের ব্যাপারে তুমি আগে নিজের প্রয়োজনীয় খরচের দায়িত্বশীল, তারপর তোমার স্ত্রীর, তারপর সামর্থ্য হলে তোমার নিকটাত্মীয়ের খরচ তোমার ওপর বর্তাবে।’ (মুসলিম : ৯৯৭)।

অসমর্থ মা-বাবাকে সঙ্গে নেবে যে সন্তান : সন্তান তার উপার্জনকৃত আয় থেকে নিজের, স্ত্রীর ও সন্তান-সন্ততির ভরণ-পোষণের পর অতিরিক্ত সম্পদ না থাকলে তবুও অভাবগ্রস্ত ও উপার্জনে অক্ষম মা-বাবাকে নিজের দারিদ্র সত্ত্বেও নিজের সংসারের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে। কষ্ট হলেও যথাসাধ্য মা-বাবারও ভরণ-পোষণ চালিয়ে যাবে। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া : ১/৪৬৫)।

অভাবগ্রস্ত মা-বাবার খরচ না দেওয়ার বিধান : সামর্থ থাকা সত্ত্বেও সন্তান অভাবগ্রস্ত মা-বাবার খরচ না দিলে গোনাহগার হবে। এ ক্ষেত্রে সন্তান স্বেচ্ছায় না দিলে অভাবগ্রস্ত মাতাপিতা ছেলে-মেয়ের সম্পদ থেকে প্রয়োজন পরিমাণ তাদের অনুমতি ছাড়াও নিতে পারবেন। তবে মা-বাবা বিত্তবান হলে অনুমতি ছাড়া ছেলে-মেয়ের সম্পদ থেকে নেওয়া বৈধ হবে না। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া : ১/৫৬৪)।

মা-বাবার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব যার ওপর : মা-বাবার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব সন্তানের ওপর ওয়াজিব। এ দায়িত্ব সব সাবালক সামর্থ্যবান ছেলেমেয়ের ওপর সমভাবে বর্তাবে। তাই কোনো মেয়ে যদি সামর্থ্যবান ও বিত্তবান হয়, তাহলে ছেলেদের মতো সমভাবে তার ওপরও মা-বাবার খরচের দায়িত্ব বর্তাবে। কেননা, মা-বাবার জীবিত অবস্থায় সন্তানের জন্য খরচ ও উপহারে মেয়েরাও তাদের ভাইদের মতো সমণ্ডঅধিকারী। তাই মা-বাবার খরচ বহনে তারাও সামর্থ্যরে শর্তে তাদের ভাইদের সমদায়িত্বশীল হবে। ছেলেমেয়ে না থাকলে তারপর নাতি-নাতনিদের দায়িত্ব। অতএব, তাদের ওপর সমভাবে এ দায়িত্ব বর্তাবে। (ফাতহুল কাদির : ৪/৪১৭)।

লেখক : আলেম গবেষক ও প্রাবন্ধিক