মেসওয়াক কখন করবেন
যোবায়ের ইবনে ইউসুফ
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মেসওয়াক শুধু অজু-নামাজের আমল নয়; বরং আরও অনেক ক্ষেত্রে মেসওয়াক করতে হয়। কারণ, রাসুল (সা.) বলেন, ‘মেসওয়াক মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত। (মুসলিম : ২৬১)। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ক্ষেত্র হলো-
১. মুখের অপরিচ্ছন্নতা : দাঁত হলুদ বর্ণ হলে, মুখে দুর্গন্ধ হলে বা কোনো কিছু খাওয়ার পর মুখ অপরিচ্ছন্ন হলে মেসওয়াক করা চাই। রাসুল (সা.) বলেন, ‘মেসওয়াক মুখের পবিত্রতা, রবের সন্তুষ্টির মাধ্যম।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৮৯)।
২. কোরআন তেলাওয়াত : কোরআন তেলাওয়াত করার আগে মেসওয়াক করা ভালো। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, কোনো এক রাতে আমি রাসুল (সা.)-এর পাশ দিয়ে যাই। তিনি ঘুম থেকে উঠে পানির কাছে গেলেন। মেসওয়াক নিয়ে দাঁত পরিষ্কার করলেন। তারপর এ আয়াত পাঠ করলেন, ‘নিশ্চয় আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে এবং রাতদিনের আবর্তনে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৯০)। তিনি সুরাটি প্রায় শেষ করেন বা পূর্ণ সমাপ্ত করেন। (সুনানে আবি দাউদ : ৫৮)।
৩. তাহাজ্জুদের সময় : রাসুল (সা.) তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার আগে মেসওয়াক করতেন। হুজায়ফা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) যখন রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার জন্য উঠতেন, তখন মেসওয়াক দিয়ে প্রথমে নিজের মুখ পরিষ্কার করে নিতেন।’ (মুসলিম : ৩৪৮)।
৪. সাক্ষাতের আগে : কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আগে মেসওয়াক করা চাই। এক সফরে কয়েকজন সাহাবি তাদের ভাইদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। রাসুল (সা.) তাদের বললেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাইদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছ, তাই নিজেদের বাহন, আসবাবপত্র ঠিকঠাক করে নাও। সুন্দর ও উত্তম বেশভূষা ধারণ কর; যেন তোমাদেরকে মানুষদের মাঝে তিলকের মতো মনে হয়।’ (সুনানে আবি দাউদ : ৪০৮৯)।
৫. ঘরে ঢোকার পর : ঘরে প্রবেশ করে সর্বপ্রথম মেসওয়াক করা ভালো; তারপর অন্য কাজ করা চাই। শুরাইহ (রহ.) বলেন, আমি আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘রাসুল (সা.) ঘরে প্রবেশ করে প্রথমে কোন কাজটি করতেন?’ তিনি বললেন, ‘প্রথমে মেসওয়াক করতেন।’ (মুসলিম : ২৫৩)।
৬. ঘুম থেকে ওঠার পর : আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) ঘুমানোর সময় মেসওয়াক পাশে রাখতেন। ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই তিনি মেসওয়াক করতেন।’ (মুসনাদে আহমদ : ৫৯৬৯)। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) রাতে বা দিনে যখনই ঘুম থেকে উঠতেন, অজু করার আগে মেসওয়াক করতেন।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ : ৩৫২)।
৭. মসজিদে প্রবেশের সময় : মসজিদে প্রবেশ করার সময় মেসওয়াক করে নেওয়া উচিত। কেননা, মসজিদে মুসল্লিদের সমাগম হয়; ফেরেশতারা উপস্থিত হন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে আদম সন্তান! প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা সাজসজ্জা গ্রহণ করে নাও।’ (সুরা আরাফ : ৩১)।
৮. দ্বীনি মজলিসে বসার আগে : দ্বীনি মজলিসে ফেরেশতারা আগমন করেন। মানুষের মুখের দুর্গন্ধে তাদের কষ্ট হয়। তাই দ্বীনি মজলিসে বসার আগে মেসওয়াক করে নেওয়া উচিত। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন কেউ আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন ফেরেশতারা তাদের ঘিরে রাখে। আল্লাহর রহমত তাদের ঢেকে নেয়। তাদের ওপর সাকিনা নাজিল হয়। আল্লাহতায়ালা তার প্রিয় ফেরেশতাদের সামনে তাদের কথা উল্লেখ করেন।’ (মুসলিম : ৭০০)।
৯. অবসরে-কাজের ফাঁকে : দিন রাতের যেকোনো সময় সুযোগ পেলেই মেসওয়াক করা চাই। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি তোমাদেরকে অধিক মাত্রায় মেসওয়াকের নির্দেশ দিচ্ছি। (অর্থাৎ তোমরা বেশি বেশি মেসওয়াক কর)।’ (বোখারি : ৮৮৮)। সালেহ ইবনে কায়সান (রহ.) বলেন, ‘উবাদা ইবনে সামেত (রা.) এবং রাসুল (সা.)-এর অন্য সাহাবিরা চলাফেরা করার সময় তাদের কানের ওপর মেসওয়াক গুজে রাখতেন।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : ১৮০৫)।
১০. মৃত্যুর আগমুহূর্তে : মৃত্যুশয্যায় শায়িত লোকের যদি জ্ঞান থাকে, তাহলে সম্ভব হলে মেসওয়াক করে নেওয়া উচিত। রাসুল (সা.)-এর জীবনের সর্বশেষ আমল ছিল মেসওয়াক। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) আমার ঘরে আমার পালার দিনে আমার বুকে মাথা রাখাবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তিনি অসুস্থ হলে আমাদের মধ্যকার কেউ দোয়া পড়ে তাকে ঝাড়-ফুঁক করত। (এ অবস্থায়) আমি তাকে ঝাড়-ফুঁক করছিলাম।
এমন সময় আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রা.) এলেন। তার হাতে মেসওয়াকের একটি তাজা ডাল ছিল। রাসুল (সা.) সেদিকে তাকালেন। বুঝতে পারলাম, তিনি মেসওয়াকের প্রয়োজন বোধ করছেন। আমি সেটি নিয়ে চিবিয়ে প্রস্তুত করে তাকে দিলাম। তিনি এর দ্বারা সুন্দরভাবে মেসওয়াক করলেন, যেমনটি তিনি (সুস্থতার সময়) করতেন। তারপর তিনি তা আমাকে দিলেন।
পরক্ষণেই তার হাত ঢলে পড়ল। আল্লাহতায়ালা আমার থুথুকে রাসুল (সা.)-এর থুথুর সঙ্গে তার দুনিয়ার শেষ দিনে এবং পরকালের প্রথম দিনে মিলিয়ে দিলেন।’ (বোখারি : ৪৪৫১)।
