মক্কা শরিফের জুমার খুতবা
জবানের হেফাজত ও ব্যবহারে সতর্কতা
শায়খ ড. বান্দার বিন আবদুল আজিজ বালিলা
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সৃষ্টিজগতে আল্লাহর অনেক রহস্য ও তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। সৃজিত বস্তুরাজির মাঝে আছে নানা উপদেশ ও শিক্ষা। এগুলো সৃষ্টির মাহাত্ম্য ঘোষণা করে। আল্লাহর ভাগ্য নির্ধারণে প্রজ্ঞার সাক্ষ্য দেয়। এসব নিয়ে চিন্তা-গবেষণা সুদৃঢ় বিশ্বাসের সুফল বয়ে আনে। জ্ঞানজগত সমৃদ্ধ করে। ঈমান শক্তিশালী করে। জিহ্বা আল্লাহর সেসব চমৎকার সৃষ্টি ও উজ্জ্বল নিদর্শনের একটি। জিহ্বা হলো বাগযন্ত্র। কথা বলার উপায়। অন্তরের সাক্ষী। হৃদয়ের ভাষ্যকার। জিহ্বা দ্বারাই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়। সম্বোধনকে সুস্পষ্ট করা হয়। প্রয়োজনীয় আকাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভ করা যায়। জিহ্বা আল্লাহর অনেক বড় নেয়ামত। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তিনি রহমান, যিনি কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আবার সেই মানুষকে শিখিয়েছেন মনের ভাব ব্যক্তকরণ।’ (সুরা আর রহমান : ১-৪)।
জিহ্বার ব্যবহার ও সতর্কতা : জিহ্বার কর্মপরিধি বিশাল। এর ক্রিয়া ব্যাপক। ঝুঁকিটাও খুব। জিহ্বার ব্যবহারেই মানুষ সম্মানের সুউচ্চ শিখরে পৌঁছে। আবার এটিই তাকে নামিয়ে দেয় ধ্বংসের অতল গহ্বরে। কবি বলেন, ‘জিহ্বা আকারে যদিও অনেক ছোট, কিন্তু তার অপরাধ অনেক বড়।’ রাসুল (সা.) বলেন, ‘পরিণাম চিন্তা না করে মানুষ যখন কোনো কথা বলে, এর কারণে সে জাহান্নামের পূর্ব মেরু আর পশ্চিম মেরুর দূরত্বসম অতলে পতিত হয়।’ (বোখারি : ৬৪৭৭, মুসলিম : ২৯৮৮)। তিনি আরও বলেন, ‘জিহ্বাসমূহের কর্তিত ফসল ছাড়া আর কোন বস্তু মানুষকে মুখ থুবড়ে জাহান্নামে ফেলবে?’ (তিরমিজি : ২৬১৬)। একবার রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘কোন বস্তু মানুষকে অধিক পরিমাণে জাহান্নামি করবে?’ তিনি বললেন, ‘মুখ ও লজ্জাস্থান।’ (তিরমিজি : ২০০৪)।
জিহ্বা আল্লাহর আমানত : জিহ্বা মানুষের কাছে আল্লাহর আমানত। এটি এমন গচ্ছিত বস্তু, যে ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। জিহ্বা সবধরনের কথা বলার যোগ্যতা রাখে। তাকে যেদিকে ঘুরানো হবে, সেদিকেই ঘুরবে। কবি বলেন, ‘জিহ্বাকে ভালো কথা বলায় অভস্ত করো, কল্যাণ লাভ করবে। কারণ জিহ্বাকে যাতে অভ্যস্ত করবে, তাতেই সে অভ্যস্ত হবে।’ মানুষের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দই সংরক্ষিত হচ্ছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা লেখার জন্য রয়েছে সদা প্রস্তুত প্রহরী।’ (সুরা কাফ : ১৮)। তিনি আরও বলেন, ‘কখনও নয়, সে যা কিছু বলেছে, আমি তা লিখে রাখব এবং আমি তার শাস্তি আরও বৃদ্ধি করে দেব।’ (সুরা মারইয়াম : ৮৯)। কথা যদি ভালো হয়ে থাকে, তাহলে তার পরিণাম কতই না শুভ ও সুন্দর! আর মন্দ হয়ে থাকলে, তা হবে বিপদ ও দুর্ভাগ্যের কারণ।
সুন্দর ও সুমিষ্ট ভাষায় বাক্যালাপের গুরুত্ব : আল্লাহতায়ালা মানুষকে উৎকৃষ্ট ও সুন্দর কথা বলার আদেশ দিয়েছেন। উদ্বুদ্ধ করেছেন সুন্দর ও সুমিষ্ট ভাষায় বাক্যালাপে। তিনি বলেন, ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে সুন্দর কথা বলো।’ (সুরা বাকারা : ৮৩)। তিনি আরও বলেন, ‘হে নবী! আমার বান্দাদের বলো, তারা যে কথা বলে, তা যেন সুন্দর হয়।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৫৩)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে, নইলে চুপ থাকে।’ (বোখারি : ৬০১৮, মুসলিম : ৭৪)। সুন্দর কথামালা জিহ্বার অলঙ্কার। বর্ণনাশক্তির উপঢৌকন। শ্রবণের আগে তা হৃদয়ে রেখাপাত করে। মূর্খকে শিক্ষিত করে। উদাসীনকে সতর্ক করে। উ™£ান্তকে দিকনির্দেশনা দেয়। কল্যাণের বিস্তার ঘটায়। উপদেশ প্রদান করে। মানুষের বিবাদ মেটায়। এটা আল্লাহর জিকিরও বটে।
জবানের নিকৃষ্ট ও ভয়ঙ্করতম বিপদ : প্রতিটি মানুষকেই নিজের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দাঁত দ্বারা তার বিপদসমূহ ঠেকিয়ে রাখতে হবে। জবানের নিকৃষ্ট ও ভয়ঙ্করতম বিপদ হলো, না জেনে আল্লাহর সম্পর্কে কিছু বলা। তাঁর নাম, গুণাবলি ও কর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতাবশত মন্তব্য করা। তিনি নিজেকে যেসব বিশেষণে বিশেষায়িত করেননি, তাঁর ওপর সেসব আরোপ করা। রাসুল (সা.)-এর ক্ষেত্রেও ভিত্তিহীন গুণাবলির ব্যবহার করা। আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তাকে হালাল করা। তিনি যা হালাল করেছেন, তাকে হারাম করা। জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ছাড়াই আল্লাহর শরিয়ত নিয়ে গবেষণা করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে নবী! তুমি বলো, আমার রব প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সবধরনের অশ্লীলতা হারাম করেছেন। হারাম করেছেন পাপাচার, অন্যায়ভাবে কারও ওপর সীমালঙ্ঘন, আল্লাহ যে সম্পর্কে কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি, এমন জিনিসকে আল্লাহর সঙ্গে শরিক সাব্যস্তকরণ এবং আল্লাহ সম্পর্কে এমন কথা বলাকে, যে সম্পর্কে তোমাদের বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই।’ (সুরা আরাফ : ৩৩)। আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘তোমাদের মুখের কথা যেন মিথ্যাভাবে বলো না যে, এটা হালাল-ওটা হারাম। কারণ তাতে তোমরা আল্লাহর সম্পর্কেই মিথ্যা বলবে। যারা আল্লাহর সম্পর্কে মিথ্যা বলে, তারা কিছুতেই সফলকাম হবে না।’ (সুরা নাহল : ১১৬)।
জিহ্বার বড় বড় বিপদ : জবানের কিছু বড় বড় বিপদ (যেমন- উপহাস করা, অন্যের দোষচর্চা, চোগলখুরি, অপবাদ আরোপ ও গালি দেওয়া) নিকৃষ্ট ধরনের কাজ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কোনো গোত্র অন্য কোনো গোত্রকে নিয়ে উপহাস করবে না।’ (সুরা হুজুরাত : ১১)। রাসুল (সা.) জিহ্বার অনেক গোনাহ থেকে নিষেধ করেছেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘মিথ্যা পাপাচারের পথ দেখায়। পাপাচার জাহান্নামের দিকে ধাবিত করে।’ (বোখারি : ৬০৯৪)। তিনি আরও বলেন, ‘চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (মুসলিম : ১৬৩)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘প্রতিটি মুসলমানের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান অপর মুসলমানের ওপর হারাম।’ (মুসলিম : ২৫৬৪)। তিনি আরও বলেন, ‘কোনো মোমিনকে অভিসম্পাত করা তাকে হত্যা করার নামান্তর।’ (মুসনাদে আহমদ : ১৬০৯০)। অন্য হাদিসে এসেছে, ‘মুসলমানকে গালি দেওয়া পাপ।’ (বোখারি : ৪৮)। আরেক হাদিসে এসেছে, ‘প্রকৃত মুসলমান সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ।’ (বোখারি : ৬৪৮৪)।
যে চুপ থাকে সে মুক্তি পায় : যে নিজের জিহ্বার হেফাজত করে, সে নিজের প্রশান্তির ব্যবস্থা করে। যে চুপ থাকে, সে মুক্তি পায়। চুপ থাকার ফলে মানুষের ভালোবাসা লাভ হয়। চাল-চলনে গাম্ভীর্য ফুটে ওঠে। বিকৃত, বিভ্রান্তিকর ও অনর্থক কথা থেকে বেঁচে থাকা যায়। উপরন্তু এটি বিনা কষ্টের একটি ইবাদত। কবি বলেন, ‘চুপ থাকা মূর্খতার আবরণস্বরূপ। যদিও কথাই মানুষের বুদ্ধিমত্তার পরিচয়ের উন্মোচিত গ্রন্থ।’ ইমাম নববি (রহ.) বলেন, ‘প্রতিটি মানুষকে কল্যাণকর কথা ছাড়া অন্য সবধরনের কথা থেকে জবানকে হেফাজত করতে হবে। কথা বলা ও না বলা উপকারের দিক দিয়ে যখন সমান হবে, তখন কথা না বলা সুন্নত। কারণ কখনও বৈধ কথাও হারাম বা মাকরুহ হয়। সমাজে এটি প্রচুর দেখা যায়। চুপ থাকলে নিরাপদ থাকা যায়। নিরাপত্তার চেয়ে বড় কিছু নেই।
মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন- মুফতি মুইনুল ইসলাম
