সামাজিক কল্যাণ ও মানবাধিকার

ড. মাওলানা শহীদুল ইসলাম ফারুকী

প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্র মানবজাতির ‘দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জীবনের কল্যাণ’ নিশ্চিত করার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা তাওহিদভিত্তিক সার্বভৌমত্ব, আদল ও ইনসাফ, দায়িত্বশীল স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও আমানতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। শাসনব্যবস্থায় শুরাভিত্তিক সিদ্ধান্তগ্রহণ, যোগ্য নেতৃত্ব ও ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিশ্চিত করা হয়।

আইন ও বিচার বিভাগ কোরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী পরিচালিত হয়, যেখানে বিচারকের স্বাধীনতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা প্রাধান্য পায়। অর্থনৈতিক কাঠামো সুদমুক্ত, জাকাত ও বাইতুল মাল ব্যবস্থার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও শ্রমিক-ভোক্তা অধিকার রক্ষা করে। সামাজিক কল্যাণ, শিক্ষা-সংস্কৃতি, নৈতিকতা, নারী ও শিশু অধিকার, সংখ্যালঘু নাগরিকদের সুরক্ষা- এ বিষয়গুলো রাষ্ট্রকে মানবকল্যাণমুখী ও নৈতিকভাবে শক্তিশালী করে। সুতরাং ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্র শুধু একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং ‘মানবকল্যাণ, ন্যায় ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বাস্তবমুখী মডেল’, যা যুগে যুগে সমাজ ও রাষ্ট্রকে নৈতিক ও কার্যকরী পথে পরিচালিত করতে পারে।

ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রের লক্ষ্য : ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো- সমাজের প্রতিটি নাগরিকের মানবিক, নৈতিক ও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। এর জন্য রাষ্ট্র নির্দিষ্ট নীতি ও কার্যক্রম গ্রহণ করে যা দরিদ্র, অসহায়, সংখ্যালঘু ও নারী-শিশুর অধিকার রক্ষা করে। যেমন-

ক. দরিদ্র, এতিম ও অসহায়দের দায়িত্ব : রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো সমাজের দুর্বল ও অসহায় জনগোষ্ঠী- দরিদ্র, এতিম ও অসহায়দের কল্যাণ নিশ্চিত করা। ইসলামে এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক কর্তব্য হিসেবে নির্ধারিত। জাকাত, সদকা ও বাইতুল মালের মাধ্যমে তাদের জীবনমান উন্নত করা হয়। ফলে দারিদ্র?্য হ্রাস, সামাজিক সমতা বৃদ্ধি এবং মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

খ. নারী ও শিশুর অধিকার : ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্র নারী ও শিশুর অধিকার রক্ষা করে। নারীদের শিক্ষার সুযোগ, আর্থিক স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা এবং পরিবারের প্রতি ন্যায্য দায়িত্ব নিশ্চিত করা হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা।

গ. সংখ্যালঘু নাগরিকদের অধিকার : ইসলামি রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিকদেরও সমান অধিকার রয়েছে। তাদের ধর্ম, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক চর্চা বজায় রাখা, নিরাপত্তা প্রদান এবং বৈষম্যবিহীন সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

ঘ. সামাজিক ন্যায় ও নিরাপত্তা : সামাজিক ন্যায় ও নিরাপত্তা ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রের ভিত্তি। রাষ্ট্রের আইন, প্রশাসন এবং নীতি এমনভাবে পরিচালিত হয়, যাতে সমাজে ন্যায়, শান্তি, সামাজিক ভারসাম্য এবং মানবিক কল্যাণ বজায় থাকে। প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং সমাজে সহমর্মিতা ও সংহতি বৃদ্ধি করা রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য।

মোটকথা, দরিদ্র ও অসহায়দের দায়িত্ব, নারী ও শিশুর অধিকার, সংখ্যালঘু নাগরিকদের সুরক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়-নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রকে একটি সমতাভিত্তিক, মানবকল্যাণমুখী ও নৈতিক সমাজব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এ নীতিগুলো ছাড়া সমাজে স্থায়ী শান্তি, ভারসাম্য ও কল্যাণ অর্জন সম্ভব নয়।

শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নৈতিকতা : ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নৈতিকতা নীতিমালা সমাজের নৈতিক, জ্ঞানভিত্তিক ও সৃজনশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করে। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হলো নাগরিকদের পূর্ণাঙ্গ কল্যাণ সাধনের জন্য শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে মানবকল্যাণমুখী এবং নৈতিকভাবে সমন্বিত করা।

ক. সমন্বিত শিক্ষাদর্শন : ইসলামি রাষ্ট্রে শিক্ষা শুধু জ্ঞানার্জন নয়, বরং নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করে। শিক্ষাদর্শনে ধর্মীয় জ্ঞান ও আধুনিক জ্ঞান সমন্বয় করা হয়। শিশু ও যুব সমাজকে নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে শিক্ষিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

খ. জ্ঞান, গবেষণা ও বিজ্ঞান : ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্র জ্ঞান ও গবেষণাকে উৎসাহিত করে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিক্ষাবিদ্যায় উন্নতি সমাজের কল্যাণ ও দেশের সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রাষ্ট্র নীতিমালার মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা ও গবেষণাকেন্দ্র সমৃদ্ধ করা হয়, যাতে নাগরিকরা সৃজনশীল ও দক্ষ হয়ে উঠতে পারে।

গ. নৈতিকতা ও সামাজিক শালীনতা : শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে নৈতিকতা ও সামাজিক শালীনতা সমন্বিত। নাগরিকদের সৎচরিত্র, সামাজিক দায়িত্ববোধ, মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিক সততা গড়ে তোলা হয়। এটি সমাজে আস্থা, শান্তি ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করে এবং কল্যাণমুখী জীবনব্যবস্থা নিশ্চিত করে।

মোটকথা, সমন্বিত শিক্ষাদর্শন, জ্ঞান ও গবেষণার বিকাশ এবং নৈতিক ও সামাজিক শালীনতার প্রতিপালন ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রকে একটি সাম্প্রদায়িকভাবে সমৃদ্ধ, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। রাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো শুধু অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক উন্নয়ন নয়, বরং মানুষকে নৈতিক ও জ্ঞানভিত্তিকভাবে সম্পূর্ণ উন্নত করা।

পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক : ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নৈতিক, শান্তিপ্রিয় ও মানবকল্যাণমুখী। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য শুধু নিজস্ব স্বার্থ নয়, বরং আন্তর্জাতিক শান্তি, ন্যায় ও মানবিক দায়িত্বকে নিশ্চিত করা।

ক. শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক কূটনীতি : ইসলামি রাষ্ট্র সবসময় শান্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে কূটনীতি প্রয়োগ করে। অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক ন্যায্যতা বজায় রাখা হয়। যুদ্ধ বা সংঘাত শুধু প্রতিরক্ষা বা ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সীমিত, আর তা ছাড়া আগ্রাসন বা অন্যায় গ্রহণযোগ্য নয়।

খ. আত্মরক্ষা ও আগ্রাসননীতি : ইসলামি রাষ্ট্র আত্মরক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে গ্রহণ করে। কোনো রাষ্ট্রের বা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আক্রমণ হলে তা প্রতিরোধ করার অধিকার রয়েছে। তবে আগ্রাসন বা অন্যায়ের ভিত্তিতে হামলা ইসলামি নীতির পরিপন্থী। আত্মরক্ষার নীতি নিশ্চিত করে রাষ্ট্র ও জনগণ নিরাপদ থাকে এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা হয়।

গ. নিপীড়িত জনগণের প্রতি দায়িত্ব : ইসলামি রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক নীতি নিপীড়িত ও অত্যাচারিত জনগণের প্রতি সহানুভূতি ও সহায়তা প্রদানের ওপর ভিত্তি করে। অন্য রাষ্ট্রের জনগণ যদি নিপীড়িত হয়, ইসলামি রাষ্ট্র তাদের মানবিক ও নৈতিক সহায়তা প্রদান করে। এটি আন্তর্জাতিক ন্যায়, মানবাধিকার রক্ষা এবং শান্তিপ্রিয় সমাজ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মোটকথা, শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক কূটনীতি, আত্মরক্ষা ও আগ্রাসননীতি এবং নিপীড়িত জনগণের প্রতি দায়িত্ব- এ তিনটি উপাদান ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রকে নৈতিক ও মানবিক আন্তর্জাতিক নীতি অনুসরণকারী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শুধু রাষ্ট্র স্বার্থের জন্য নয়, বরং মানবকল্যাণ, ন্যায় ও শান্তি নিশ্চিত করার জন্য পরিচালিত হয়।

সমালোচনা ও সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ : ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা যুগে যুগে সমালোচনা ও বিতর্কের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। সমালোচনার মূল কারণ হলো- আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে ইসলামি নীতি ও বিধানের মিল বা অভাব।

ক. ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্র নিয়ে প্রচলিত আপত্তি : প্রচলিত সমালোচনায় বলা হয়, ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্র আধুনিক বিশ্বের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কিছু সমালোচক মনে করেন, আজকের বহুপাক্ষিক রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতায় ইসলামি বিধান কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা কঠিন। তা ছাড়া মানবাধিকার, নারী-শিশু অধিকার এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে ইসলামি রাষ্ট্রের কিছু নিয়মের সামঞ্জস্যহীনতা তুলে ধরা হয়।

খ. আধুনিক বাস্তবতায় প্রয়োগগত চ্যালেঞ্জ : ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রের বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়, যেমন- ১. আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সুদমুক্ত বিনিয়োগ ও সমবণ্টন ব্যবস্থা কার্যকর করা, ২. বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শুরাভিত্তিক সিদ্ধান্তগ্রহণ ও নেতৃত্বের যোগ্যতা নিশ্চিত করা, ৩. সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ বজায় রেখে প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের সঙ্গে ইসলামি নীতি সমন্বয় করা, ৪. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতি চলাকালীন ন্যায় ও মানবিক নীতির বাস্তবায়ন।

সম্ভাব্য সমাধান : সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন-

১. শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি : নাগরিক, প্রশাসক ও আইনপ্রণেতাদের মধ্যে ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রের মূলনীতি ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি।

২. আইন ও নীতি সমন্বয় : আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ইসলামি বিধানের মধ্যে সমন্বয় সাধন।

৩. অর্থনৈতিক সংস্কার : সুদমুক্ত ব্যাংকিং, জাকাত ও বাইতুল মালের কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং দারিদ্র্য বিমোচন।

৪. প্রযুক্তি ও জ্ঞানচর্চা : বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ইসলামি নীতি ও নৈতিকতার সঙ্গে সমন্বয় করা।

৫. শুধু তাত্ত্বিক নয়, বাস্তবমুখী পরিকল্পনা : ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্র শুধু একটি ধারণা নয়, বরং বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা ও নীতিগ্রহণ।

লেখক : পরিচালক, মাকাসিদ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ;

আমির, পয়ামে ইনসানিয়াত বাংলাদেশ