প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
আলোকিত বাংলাদেশ : আপনার রাজনৈতিক পথচলা সম্পর্কে বলুন।
রিদওয়ান হাসান : আমি দীর্ঘদিন ধরে দাওয়াতি কার্যক্রম, সামাজিক সংস্কার, নৈতিক নেতৃত্ব তৈরি আর নাগরিক অধিকার নিয়ে কওমি মাদ্রাসার জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করছি। নৈতিক জায়গা থেকেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ‘সাধারণ আলেম সমাজ’-এর ব্যানারে কারফিউ ভেঙে রাজপথে নামার সাহস করেছি। জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কার ও নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে জাতীয় নাগরিক কমিটি, তারপর এনসিপি, পরে আপ বাংলাদেশে কাজ করেছি। এটাকে আমি পোস্ট-জুলাই একটা পলিটিক্যাল জার্নি হিসেবে দেখি। বর্তমানে ‘বাংলাদেশ গ্রীন পার্টি’র আহ্বায়ক হিসাবে কাজ করছি। আমার কাজের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে, কীভাবে ইনসাফভিত্তিক রাজনীতি, পরিবেশের সুরক্ষা আর তরুণ নেতৃত্ব একসঙ্গে দাঁড় করানো যায়, তা নিয়ে ভাবা।
আলোকিত বাংলাদেশ : বাংলাদেশ গ্রীন পার্টির আত্মপ্রকাশ কবে, কীভাবে, কাদের উদ্যোগে কোন লক্ষ্যে? উল্লেখযোগ্য নেতৃত্বের কথা জানতে চাই?
রিদওয়ান হাসান : বাংলাদেশ গ্রীন পার্টির অনাড়ম্বর যাত্রা শুরু হলো গত ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। এটা কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত ছিল না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা বুঝেছি, শুধু সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানো জরুরি। সেই জায়গা থেকেই আলেম, তরুণ গবেষক, পেশাজীবী আর জুলাইয়ে অংশ নেওয়া সংগঠকদের যৌথ উদ্যোগে একটা পার্টি করার ভাবনা আসে। লক্ষ্য খুব পরিষ্কার, ইনসাফকে রাজনীতির কেন্দ্রে আনা, প্রকৃতি ও জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আর এমন তরুণ নেতৃত্ব তৈরি করা, যারা নৈতিকতা ও দক্ষতা দুটোই ধারণ করে। নেতৃত্বে আছেন মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা চিন্তাশীল তরুণরা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাতে কাজ করা পেশাজীবীরা এবং মাঠে থাকা সংগঠকরা। আমরা এরইমধ্যে জুলাই জজবার বৈষম্যহীন ইনকিলাবের আজাদি সিলসিলাকে ধারণ করে, মানবিক মর্যাদাভিত্তিক গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় তরুণ ও নৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে এবং ইনসাফের যাত্রা শুরু করেছি। আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে আমরা আনুষ্ঠানিক গ্রান্ড আয়োজনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করব। যেহেতু জুলাই থেকে আমাদের যাত্রা শুরু, তাই আত্মপ্রকাশের ফোকাসে রয়েছে ইন্টেরিমকাল। এজন্য শেষ সময়ে হলেও পার্টির যাত্রাটা শুরু হলো। এখনও পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে নামে-বেনামে অনেক তরুণ আছেন। সদস্য সচিব হিসেবে আছেন তরুণ চিন্তক সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর, সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে আছেন লেখক এহসান সিরাজ। আছেন বরেণ্য শিক্ষক আরিফ খান সাদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবু উবায়দা ও হাফেজ কেফায়েত, জুলাই যোদ্ধা যিয়াদ বিন সাঈদ প্রমুখ। এ ছাড়া থিংকট্যাংক হিসেবেও একটি কার্যকর বডি রয়েছে।
আলোকিত বাংলাদেশ : বাংলাদেশ গ্রীন পার্টির নাম ও শ্লোগান কার আইডিয়া? কেন এই নাম ও শ্লোগান? অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এই নাম ও শ্লোগানের স্বাতন্ত্র্য কী?
রিদওয়ান হাসান : এই নাম আর শ্লোগান কোনো একজনের মাথা থেকে আসেনি। দফায় দফায় বৈঠক ও আলোচনার পর আমরা বুঝেছি, দেশের রাজনীতিতে উন্নয়নের কথা অনেক হয়েছে, কিন্তু ইনসাফ আর প্রকৃতির কথা একসঙ্গে কেউ বলেনি। ‘গ্রীন’ বলতে আমরা শুধু গাছ বোঝাই না; আমরা মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, খাদ্য, পানি, নদী সবকিছুর নিরাপত্তা বোঝাই। আর ‘ইনসাফ’ শুধু আদালতের বিষয় নয়, এটা শিক্ষা, অর্থনীতি, প্রশাসন- সব জায়গায় ন্যায্যতার প্রশ্ন। এ দুটো শব্দ একসঙ্গে এনে আমরা একটা আলাদা রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করতে চেয়েছি, যা অন্য কোনো দলের সঙ্গে মেলে না। আমরা বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের রাজনৈতিক সত্তাকে ধারণ করে ইনসাফের রাজনীতি করতে চাই। দেখবেন, বাংলাদেশের পতাকা কিন্তু লাল-সবুজ। লাল রঙের মধ্য দিয়ে আমাদের ৭১ রক্তিম সংগ্রামকে বুঝানো হয়, শুধু একাত্তর নয়। সেই ৪৭ থেকে শুরু হয়ে এখনও পর্যন্ত যত সংগ্রাম বাংলাদেশের জমিনে হয়েছে, প্রতিটির রঙ লাল। আমরা সেই সংগ্রামকে ধারণ করি। সেই সংগ্রামের আলোকে বলতে চাই, বাংলাদেশে ৭১-এর গণহত্যা আর ফিরে না আসুক। আর যেন শাপলা, পিলখানা ও লাল জুলাই না ঘটে। এ চিন্তা থেকেই এভারগ্রীন বাংলাদেশকে আমরা নির্মাণ করতে চাই। বাংলাদেশের এত এত রাজনৈতিক দল আছে, কিন্তু দলীয় প্রতিহিংসার লড়াইয়ে কত মানুষের জীবন বিপন্ন হয়, আমরা তা চাই না। এজন্য আমরা ননভায়োলেন্ট পলিটিক্যাল পার্টি হিসেবে গ্রীন পার্টি ফরমেশন করছি। এটাই আমাদের অন্য দলগুলোর থেকে স্বাতন্ত্র্য।
আলোকিত বাংলাদেশ : ‘সাধারণ আলেম সমাজ’-এর ব্যানারে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আপনারা ভূমিকা রেখেছেন। ২৪-এর ৫ আগস্টে সরকার পতনের পর প্রায় বছর দেড়েক সময় পেরিয়ে গেল। ছাত্রজনতা নতুন দল গঠন করে এরইমধ্যে ১০ দলীয় জোটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। আপনারা দল গঠনে এত বিলম্ব করলেন কেন? দল যখন গঠন করবেনই, তাহলে তাদের মতো আগেভাগে মাঠে নেমে নির্বাচনে অংশ নিতেন! ভোটের লড়াইটাও লড়তেন অন্তত!
রিদওয়ান হাসান : আমরা রাজনীতিকে শুধু নির্বাচন হিসেবে দেখি না। আমাদের কাছে রাজনীতি মানে মানুষের জীবনের দায় নেওয়া। জুলাইয়ের পরপরই চাইলে দল ঘোষণা করে মাঠে নামা যেত; কিন্তু তাতে একটা তাড়াহুড়া থাকত, গভীরতা থাকত না। এই দেড় বছরে আমরা মাঠ বুঝেছি, মানুষের কথা শুনেছি, স্বাস্থ্যসেবা, রক্তদান, পরিবেশ নিয়ে বাস্তবসম্মত কাজ শুরু করেছি। আমরা শুধু ভোটের সময় মানুষকে ডাকতে চাইনি। আগে মানুষের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছি। এ প্রস্তুতি ছাড়া নির্বাচনে নামা আমাদের কাছে দায়িত্বশীল রাজনীতি মনে হয়নি। কারণ, রাজনীতি যদি মানুষের জীবন ছুঁয়ে না যায়, তাহলে সেটা শুধু ক্ষমতার খেলা। বাংলাদেশে অনেক দল আছে, যাদের কোনো সামাজিক কাজ নেই; কিন্তু আমরা উল্টোটা করছি। কাজ আগে করছি, যাতে মানুষ গ্রীন পলিটিক্স নিজেদের জীবনে ধারণ করতে পারে এবং বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন করে ইনসাফের ন্যায্য হিস্যা বুঝে পায়।
আলোকিত বাংলাদেশ : দেশে নতুন-পুরাতন ডজনখানেক ডান-বাম রাজনৈতিক দল রয়েছে, বাংলাদেশ গ্রীন পার্টির আত্মপ্রকাশে স্বাতন্ত্র্য কী হলো? সবাই শুরুতে নানান উন্নয়ন, জনসেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন, আপনারা কী করতে চান? কেন করতে চান?
রিদওয়ান হাসান : আলাদা জায়গাটা খুব পরিষ্কার। আমরা শ্লোগান দিয়ে শুরু করিনি, কাজ দিয়ে শুরু করছি। খুব দ্রুত হিউম্যান বডি ব্লাডব্যাংক নেটওয়ার্ক তৈরি করব, যাতে রক্তের লাল বন্ধনও অহিংস সবুজ-শ্যামল বাংলার কথা বলে। সেই সঙ্গে আমরা স্বাস্থ্যসেবার মডেল দাঁড় করাচ্ছি, পরিবেশ নিয়ে মাঠে কাজ করছি। এত কিছুর মধ্য দিয়েও আমরা সেবা আর রাজনীতির মধ্যে দেয়াল রেখেই কাজ করছি, তবে সেটা মানুষের কষ্ট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নয়। আরেকটা বড় পার্থক্য অর্থনীতি। আমরা বড় ডোনার বা এলিট নির্ভর দল হতে চাই না। দৈনিক তিন টাকার অনুদানের ধারণা এনে আমরা রাজনীতিকে সাধারণ মানুষের হাতে ফিরিয়ে দিতে চাই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দেশের আলেম সমাজকে আমরা ভোটব্যাংক হিসেবে দেখি না, বরং আমরা তাদের রাষ্ট্রচিন্তার অংশ করতে চাই।
আলোকিত বাংলাদেশ : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজনৈতিক দল ‘এনসিপি’ গত দেড় বছরে নানা কারণে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকের ধারণা, তারা জুলাইয়ের চেতনাকে ব্যবহার করে নতুন দল গঠন করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করেছে। আবার অনেকের ধারণা, তারা একটা প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করছে। আপনারা আসলে হাঁটতে চান কোন পথে? আপনাদের চেতনা কী? আপনারাও কি কারোর প্রতিনিধিত্ব করতে মাঠে আসতে চাইছেন?
রিদওয়ান হাসান : আমরা কারো বিরুদ্ধে বা কারো ছায়ায় রাজনীতি করতে আসিনি। আমাদের চেতনা খুব স্পষ্ট, জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের কাছে ক্ষমতার লড়াই নয়, নৈতিক দাবির জায়গা, একটা বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জায়গা। আমরা মনে করি, প্রগতিশীলতা মানে ধর্মবিচ্ছিন্ন হওয়া নয়। প্রগতিশীলতা মানে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, ইনসাফ নিশ্চিত করা। আমরা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতিনিধি নই। আমরা সাধারণ মানুষ, তরুণ, আলেম, শ্রমজীবী আর ভবিষ্যত প্রজন্মের পক্ষে দাঁড়াতে চাই।
আলোকিত বাংলাদেশ : বাংলাদেশ গ্রীন পার্টি আসলে ইসলামি রাজনীতির নতুন প্যাকেজ কিনা?
রিদওয়ান হাসান : আমরা কোনো নতুন কোনো আইডিওলজি রপ্তানি করছি না; বরং বাংলাদেশের বাস্তবতা থেকে রাজনীতি করছি। আমাদের অনুপ্রেরণায় ধর্মীয় নৈতিকতা আছে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে আমরা গণতান্ত্রিক ও নাগরিক কাঠামোতে কাজ চালিয়ে যাব। আমরা কথায় কম, কাজে বিশ্বাসী।
আলোকিত বাংলাদেশ : দেশ ও দশকে নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা ও রোডম্যাপ কী?
রিদওয়ান হাসান : আমাদের রোডম্যাপ খুব বাস্তবসম্মত। প্রথমে মানুষ ও তার স্বাস্থ্য, কর্মমুখর পরিবেশ এবং তরুণদের দক্ষতা। এরপর প্রকৃতি যেমন- নদী, পরিবেশ, প্লাস্টিক দূষণ রোধ। আর এ ধারাবাহিকতা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রে ইনসাফভিত্তিক অর্থনীতি, স্বচ্ছ প্রশাসন, নৈতিক নেতৃত্ব। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে উন্নয়ন মানুষের ওপর চাপ হয়ে দাঁড়াবে না, আর রাজনীতি মানুষকে ব্যবহার করবে না।