মসজিদে নববিতে জুমার খুতবা
দোয়ার ফজিলত ও শিষ্টাচার
শায়খ ড. খালেদ বিন সুলাইমান আল মুহান্না
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দোয়া হলো ইবাদতের মূল ও সারাংশ, বরং দোয়া হলো প্রকৃত ইবাদত। কারণ দোয়ার আসল অর্থ হলো, আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করা এবং তাঁর সাহায্য ছাড়া নিজের কোনো শক্তি নেই- এ কথা স্বীকার করা। এটিই প্রকৃত বান্দার পরিচয়। দোয়ায় আরও একটি বিষয় আছে যে, এতে আল্লাহর প্রশংসা করা হয় এবং তাঁর দয়া ও উদারতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। নুমান ইবনে বশির (রা.) তার পিতার মাধ্যমে বর্ণনা করেন, তিনি রাসুল্লাহ (সা.)-কে মিম্বারে বলতে শুনেছেন, ‘দোয়াই হলো ইবাদত।’ এরপর তিনি এই আয়াত তেলাওয়াত করেন, ‘তোমাদের প্রতিপালক বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। যারা অহংকারবশে আমার ইবাদতে বিমুখ, এরা অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।’ (সুরা মোমিন : ৬০)।
বান্দা যখন একমাত্র তার রবের কাছেই দোয়া করে, তখন তা তার তাওহিদের সত্যতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এতে বোঝা যায়, সে তার রবকে ভালোবাসে ও সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বান্দার তাওহিদ যত দৃঢ় হয়, তার দোয়াও তত বেশি হয়; সে বেশি বেশি দোয়া করতে ভালোবাসে এবং সবসময় তার প্রভুর কাছেই চায়। দোয়ার স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয় শুধু সেই ব্যক্তি, যে শাস্তির মুখে পড়েছে; আর যে দোয়া থেকে দূরে থাকে, সে আসলে অহংকারী ও বঞ্চিত। দোয়া শক্তিশালী ও দুর্বল- সবার অস্ত্র; এটি নবী ও নেককারদের আশ্রয়। এর মাধ্যমে তারা সব বিপদণ্ডআপদ দূর করার চেষ্টা করেন। সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যার কাছে আল্লাহ দোয়াকে প্রিয় করে দেন, দোয়া কবুল হওয়ার কারণগুলো বুঝতে দেন, এর আদব শেখান ও যেসব বিষয় দোয়া কবুলে বাধা দেয়, সেগুলো থেকে দূরে রাখেন।
যে ব্যক্তি তার রবকে এমনভাবে ডাকে, যেমনটি আল্লাহ পছন্দ করেন- আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেন, নিজের কাছে টেনে নেন, আশ্রয় দেন ও মর্যাদা বাড়ান। যাকে দোয়া করার তাওফিক দেওয়া হয়েছে, তার জন্য কবুল হওয়ার ইচ্ছাও করা হয়েছে। বান্দাকে যখন এই চাবি দেওয়া হয়, তখন বোঝা যায় আল্লাহ তার জন্য দরজা খুলতে চান। হযরত ওমর (রা.) বলেছেন, ‘আমি দোয়া কবুল হবে কি না তা নিয়ে চিন্তিত নই; বরং চিন্তা করি দোয়া করতে পারছি কি না। কারণ যখন আমাকে দোয়া করার তাওফিক দেওয়া হয়, তখন কবুলও তার সঙ্গে থাকে।’
সমস্ত জগতের রব আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, প্রশংসার যোগ্য, সীমাহীন দাতা, সর্বজ্ঞ, দয়ালু, নিকটবর্তী ও দোয়া কবুলকারী। তাই তিনি ভালোবাসেন যে, তাঁর বান্দারা তাদের সব ধর্মীয় ও দুনিয়াবি ছোট হোক বা বড় প্রয়োজন তাঁর কাছেই চাইবে, যা তাদের উপকার করে ও কষ্ট দূর করে, তা প্রার্থনা করবে। কারণ বান্দা যখন তার প্রয়োজনের কথা আল্লাহর কাছে বলে, তখন সে নিজের অসহায়ত্ব ও আল্লাহর প্রতিনির্ভরতা প্রকাশ করে। আর এটিই আল্লাহ পছন্দ করেন। মহান আল্লাহ চান তাঁর বান্দা বেশি বেশি দোয়া করুক, কারণ দোয়ার ফল কখনোই বৃথা যায় না। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান যখন দোয়া করে, আল্লাহ তাকে তিনটির একটি দেন। হয় তা সঙ্গে সঙ্গে কবুল করেন, নয়তো আখেরাতের জন্য জমা রাখেন, অথবা সমপরিমাণ কোনো বিপদ তার থেকে দূর করেন। সাহাবিরা বললেন, তাহলে আমরা বেশি বেশি দোয়া করব।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ তো আরও বেশি দান করেন।’
আল্লাহ আরও ভালোবাসেন যখন বান্দা বারবার ও আন্তরিকভাবে তাঁর কাছে দোয়া করে। ইমাম সুফিয়ান সাওরি (রহ.) বলেছেন, ‘বারবার অনুরোধ করা আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে সুন্দর বা উপযুক্ত নয়।’ বান্দা যত বেশি আন্তরিকভাবে নিজের রবের কাছে দোয়া করে, আল্লাহ তত বেশি তাকে ভালোবাসেন, নিজের কাছে টেনে নেন ও দান করেন। বান্দা তো সেই রবের কাছেই চায়, যিনি তাকে লালন-পালন করেছেন, অসংখ্য নেয়ামত দিয়েছেন ও তার প্রতি দয়া করেছেন। তাই দোয়ার সময় বড় আশা রাখা উচিত ও বেশি করে চাওয়া উচিত। নবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যখন আল্লাহর কাছে জান্নাত চাইবে, তখন ‘ফিরদাউস’ চাইবে; কারণ সেটিই জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান, মাঝখানে অবস্থিত, আর এর ছাদ হলো রহমানের আরশ।’
আল্লাহ চান বান্দা নিজের কাছে মর্যাদাবান হোক, কিন্তু রবের কাছে বিনয়ী হোক; মানুষের কাছে হাত না পেতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুক। মানুষের কাছে নির্ভরশীল না হয়ে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল থাকুক। অথচ এটা বান্দার জন্য লজ্জার বিষয় যে, সে মানুষের কাছে চায়, অথচ তার রবের কাছে তার সব প্রয়োজনই পূরণ হওয়ার ক্ষমতা আছে। যে বান্দা তার রবকে ভালোবাসে ও তাঁকে স্মরণ করে, সে সুখে-দুঃখে সব অবস্থায় দোয়া করে; শুধু বিপদের সময় দোয়া করার জন্য অপেক্ষা করে না। আবু দারদা (রা.) বলেছেন, ‘সুখের সময় আল্লাহকে ডাকো, তাহলে দুঃখের দিনে তিনি তোমার ডাকে সাড়া দেবেন।’ এটি রাসুল (সা.)-এর এই কথার অর্থ থেকেই নেওয়া যে, ‘স্বচ্ছল অবস্থায় আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলো, তিনি কঠিন সময়ে তোমাকে চিনবেন।’ অনেক সময় আল্লাহ বান্দাকে কষ্টে ফেলেন, যাতে সে আল্লাহর বিস্তৃত রহমতের দিকে ফিরে আসে, কান্নাভেজা চোখে দোয়া করে ও বিনয়ের সাথে তাকে ডাকে।
মহান আল্লাহ নিজেই শিখিয়েছেন কীভাবে তাকে ডাকতে হবে। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর জন্যে আছে সুন্দর সুন্দর নাম। কাজেই তোমরা তাকে সেই সকল নামেই ডাকবে; যারা তাঁর নাম বিকৃত করে তাদেরকে বর্জন করবে; তাদের কৃতকর্মের ফল তাদের দেওয়া হবে।’ (সুরা আরাফ : ১৮০)। বান্দা যখন আল্লাহর নাম ও গুণাবলি উল্লেখ করে, সঠিক অর্থ বুঝে দোয়া করে তখন তা আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় হয় এবং কবুল হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে। বিশেষ করে যখন বান্দা সত্যিকারের অসহায়ত্ব নিয়ে, একান্তভাবে, আন্তরিকতার সাথে, পবিত্র অবস্থায়, হাত তুলে কিবলামুখী হয়ে দোয়া করে তখন আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন, কষ্ট দূর করেন ও রহমতের দরজা খুলে দেন। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘বরং তিনি, যিনি আর্তের আহ্বানে সাড়া দেন, যখন সে তাঁকে ডাকে এবং বিপদণ্ডআপদ দূরীভূত করেন।’ (সুরা নামল : ৬২)।
যে ব্যক্তি চায় তার দোয়া কবুল হোক তার জন্য দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত আল্লাহর আদেশ মানা ও তাঁর আনুগত্য করা। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, ‘আমার বান্দাগণ যখন আমার বিষয়ে তোমাকে প্রশ্ন করে, আমি তো নিকটেই। প্রার্থনাকারী যখন আমার নিকট প্রার্থনা করে আমি তার প্রার্থনায় সাড়া দেই। সুতরাং তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক আর আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা ঠিক পথে চলতে পারে।’ (সুরা বাকারা : ১৮৬)। দ্বিতীয়ত, দোয়ার সময় শিষ্টাচার ও ভদ্রতা বজায় রাখা। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা বিনীতভাবে ও গোপনে তোমাদের প্রতিপালককে ডাক; তিনি সীমালঙ্ঘন-কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ : ৫৫)।
বিনয়ের মধ্যে আছে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করা, আর নীরবে দোয়া করা আন্তরিকতার প্রমাণ, এটি বোঝায় যে, আল্লাহ তাঁর বান্দার খুব কাছেই আছেন। এ কারণেই বিনয় ও গোপনে করা দোয়া বড় বড় বিপদ থেকেও রক্ষা করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, বলো, ‘কে তোমাদের ত্রাণ করে স্থলভাগের ও সমুদ্রের অন্ধকার হতে যখন তোমরা কাতরভাবে ও গোপনে তাঁর কাছে অণুনয় কর?’ আমাদের এটা হতে ত্রাণ করলে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হব।’ বল, ‘আল্লাহই তোমাদের তা হতে ও সমস্ত দুঃখকষ্ট হতে পরিত্রাণ করেন। এতদসত্ত্বেও তোমরা তাঁর শরিক কর।’ (সুরা আনআম : ৬৩-৬৪)।
দোয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আদব হলো, প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করা, তাঁর গুণগান করা, তারপর নবীর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করা; এরপর নিজের প্রয়োজন আল্লাহর কাছে তুলে ধরা। কিন্তু অনেকেই দোয়া করে, অথচ তার মন থাকে অমনোযোগী! তাই দোয়ার সময় এমন কথা বেছে নেওয়া উচিত, যা আল্লাহর মহিমা ও মর্যাদার সঙ্গে মানানসই। ইমাম খাত্তাবি (রহ.) বলেছেন, ‘দোয়া ও আল্লাহর প্রশংসার জন্য সবচেয়ে সুন্দর, সম্মানজনক ও অর্থপূর্ণ শব্দ বেছে নেওয়া উচিত; কারণ এটি হলো বান্দার পক্ষ থেকে সেই মহান সত্তার সঙ্গে কথা বলা, যার কোনো তুলনা নেই।’
সংক্ষিপ্ত কিন্তু অর্থবহ সেই দোয়াগুলোই সবচেয়ে উত্তম যেগুলোতে অল্প কথায় দুনিয়া ও আখিরাতের সব কল্যাণ চাওয়া হয়। আমাদের মা আয়েশা (রা.) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন সংক্ষিপ্ত ও ব্যাপক অর্থবোধক দোয়া পছন্দ করতেন এবং অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ দোয়া পরিহার করতেন। হযরত আনাস রা. বলেছেন, মহানবী (সা.) সবচেয়ে বেশি এই দোয়াটি পড়তেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দাও এবং আখিরাতে কল্যাণ দাও। আর আমাদের দোজখের শাস্তি হতে রক্ষা কর।’ (সুরা বাকারা : ২০১)।
দোয়ার গুরুত্বপূর্ণ আদবগুলোর মধ্যে আছে যে, শরীর ও মনে বিনয় আনা, নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করা, আল্লাহর সামনে ভেঙে পড়া ও দোয়া গোপনে করা। কারণ আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা বিনীতভাবে ও গোপনে তোমাদের প্রতিপালককে ডাক; তিনি সীমালঙ্ঘন-কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ : ৫৫)। আর তিনি তাঁর বান্দা জাকারিয়া (আ.) সম্পর্কে বলেছেন, ‘যখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করেছিল নিভৃতে।’ (সুরা মরিয়ম : ৩)।
দোয়া কবুল হওয়ার জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাড়াহুড়া না করা। তাড়াহুড়া মানে হলো দ্রুত ফল আশা করা ও দোয়া কবুল হতে দেরি হচ্ছে মনে করা। দোয়ার আদবের আরেকটি বিষয় হলো, দোয়ায় শর্ত না জুড়ে দেওয়া।
(১৮-০৮-১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ০৬-০২-২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগের- মুহাদ্দিস আবদুল কাইয়ুম শেখ)
