প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
ভোট আমানত। ভোটের মাধ্যমে একজন প্রতিনিধিকে সমাজ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। সৎ, যোগ্য, দক্ষ এবং দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে ভোট দিতে হবে। নির্বাচিত হলে যে মানুষের কল্যাণে কাজ করবে। সমাজ ও দেশের জন্য নিবেদিত থাকবে। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অপরাধ করবে না। যার কাছে নিরাপদ থাকবে দেশ, ধর্ম এবং ইমান।
গোষ্ঠী বা দলীয় স্বার্থের কারণে অসৎ, অযোগ্য, অদক্ষ ও পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিনিধিকে ভোট দেওয়া যাবে না। এরকম প্রতিনিধিকে ভোট দিলে সমাজ ও জাতির ভাগ্যে মন্দ বা ধ্বংসাত্মক ছাড়া কিছুই জুটবে না। সমাজে অশিক্ষা, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বাড়বে। দেশের ধমনিতে ঢুকে পড়বে অন্যায়-অপরাধ ও জুলুম।
ভোট কী : মুফতি মুহাম্মাদ শফি (রহ.)-এর মতে, ভোট হচ্ছে তিনটি বিষয়ের সমষ্টি। এক. সাক্ষ্য প্রদান। দুই. সুপারিশ ও তিন. প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা প্রদান করা।
সাক্ষ্য দেওয়া : প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার অর্থ এ সাক্ষ্য প্রদান করা যে, লোকটি সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে সৎ ও যোগ্য। অযোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দেওয়ার অর্থ হলো মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করা। ইসলামে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া বড় অপরাধ ও গোনাহের কাজ। আল্লাহ বলেন, ‘মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া ও সাক্ষ্য গোপন করা সবচেয়ে বড় গুনাহ।’ (সুরা বাকারা : ২৮৩)।
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাক আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদাতা হিসেবে, যদিও সেটি তোমাদের নিজেদের কিংবা তোমাদের পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়।’
সুপারিশ করা : প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অর্থ হলো, তাকে নির্বাচিত করার জন্য সুপারিশ করা। আপনি তাকে ভোটের মাধ্যমে সুপারিশ করে সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি বানাতে চাচ্ছেন। কোরআনে আছে, ‘যদি কেউ ভালো (কাজের) সুপারিশ করে, তাহলে তাতে তার অংশ থাকবে। কেউ মন্দ (কাজের) সুপারিশ করলে তাতে তার অংশ থাকবে। আল্লাহ সব বিষয়ে দৃষ্টি রাখেন।’ (সুরা নিসা : ৮৫)।
প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা প্রদান : ভোট দেওয়া মানে প্রার্থীকে প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা প্রদান করা। অযোগ্য, অদক্ষ ও অসৎ লোককে প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতার জন্য মনোনয়ন করা জুলুম। এতে মানুষের ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন এবং রাষ্ট্রীয় জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাষ্ট্র নানাভাবে সংকটের মুখে পড়ে। অযোগ্য ব্যক্তি দায়িত্ব পাওয়া কিয়ামতের আলামতও। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন আমানত বিনষ্ট হয়ে যাবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করবে। সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমানত কেমন করে নষ্ট হয়ে যাবে? তিনি বললেন, যখন অযোগ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে, তখনই তুমি কিয়ামতের অপেক্ষা করবে।’ (বোখারি : ৬০৫২)।
দায়িত্ব পালনে সতর্কতা : সঠিক জায়গায় ভোট দেওয়া ইমানি দায়িত্ব। প্রার্থীদের মধ্যে যোগ্য ও সৎ প্রার্থী খুঁজে বের করে তাকে ভোট দেওয়া ইমানি দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জেনে রেখো, তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল; তোমরা প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। ইমাম জনগণের দায়িত্বশীল, তিনি তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। পুরুষ গৃহকর্তা তার পরিবারের দায়িত্বশীল; সে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। নারী তার স্বামীর পরিবার, সন্তান-সন্ততির ওপর দায়িত্বশীল, সে এসব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (বোখারি : ৬৬৫৩)।
ভোটের মাধ্যমে যেহেতু সাক্ষ্য দেওয়া, সুপারিশ করা ও প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা প্রদান করা হয়, তাই ব্যক্তিস্বার্থে ভোট দেওয়া যাবে না। টাকার বিনিময়ে ভোট বিক্রি করে অযোগ্য ব্যক্তিকে দেওয়া যাবে না। অসৎ প্রার্থীর পক্ষ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। যারা প্রকাশ্যে ইসলামি শিক্ষা, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধাচারণ করে এবং অন্যায়-জুলুমের সঙ্গে জড়িত, তাদের ভোট দেওয়া যাবে না।
প্রার্থী নির্বাচনের আগে একজন মুসলমান প্রার্থীর বাহ্যিক যোগ্যতা ও দক্ষতার পাশাপাশি তার দেশপ্রেম, নীতি-নৈতিকতা ও ইসলামে নিবেদিতপ্রাণ কিনা যাচাই করতে হবে। কারণ, ভোট দেওয়া দ্বীনি দায়িত্বও।
কী দেখে ভোট দেওয়া উচিত : আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, ‘প্রার্থীদের মধ্যে যে সৎ এবং যোগ্য, তাকে ভোট দিতে হবে। সে জিতবে নাকি হারবে, এটা চিন্তার বিষয় নয়। অনেকে বলেন, তাকে ভোট দিয়ে লাভ কি, ভোট তো নষ্ট হবে। ভোট নষ্ট হয় না। একজন ভালো মানুষ কিছু ভোট পেলে এর ওপর ভিত্তি করে আরও ভোট পাবে। এভাবে তার ভোট বাড়তে থাকবে। সে কম ভোট পাবে, এ চিন্তা করে যদি আরেকজন ভোট দেন, এ সুযোগে খারাপ মানুষগুলো তাদের খারাপের রাজত্ব আরও বেশি করে গড়তে পারবে।’
‘আপনার কাছে মতামত চাওয়া হয়েছে, আপনি সবচেয়ে যোগ্য এবং ভালো লোকের পক্ষে মতামত দেবেন। এটা আপনার কাজ। যাকে ভোট দিলে আপনার ইমান-আমল ঠিক থাকবে, দেশের উন্নতি হবে, চুরি-ডাকাতি হবে না, দুর্নীতি হবে না, তাকে ভোট দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে দল এবং গোষ্ঠীর ঊর্ধ্বে গিয়ে ভোট দিতে হবে।’ জানালেন শায়খ আহমাদুল্লাহ।
মনে রাখতে হবে, আপনার ভোটের মাধ্যমে যে প্রতিনিধি সংসদে যাবেন, তার ভালো-মন্দ পদক্ষপের দায় আপনার ওপরও বর্তাবে। আপনিও তার সঙ্গে পাপ-পুণ্যের অংশীদার হবেন। তাই সৎ, যোগ্য, দক্ষ ও ইমানদার ব্যক্তিকে ভোট দিতে হবে।