ঢাকা শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

স্বাগতম মাহে রমজান

জাহিদ হাসান
স্বাগতম মাহে রমজান

আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দাদের প্রতি যে মহান নেয়ামতগুলো দান করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো- তিনি তাদের জন্য ইবাদতের বিভিন্ন বিশেষ সময় বা মৌসুম নির্ধারণ করেছেন। এসব সময়ে নেক আমল বৃদ্ধি পায়, বিচ্যুতি ক্ষমা করা হয়, পাপরাশি মোচন হয় এবং সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এ সময়গুলোতে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয় এবং তাঁর দান ও অনুগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়। এসব মৌসুমের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানিত হলো পবিত্র রমজান মাস। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রমজান মাস, যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ।’ (সুরা বাকারা : ১৮৫)। এ মাস বরকত ও কল্যাণের মাস; সিয়াম (রোজা) ও কিয়ামের (রাতের ইবাদত) মাস। এটি রহমত, মাগফিরাত এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার মাস। এটি দান-সদকা, বদান্যতা, পরোপকার ও ইহসানের মাস।

নবীজি (সা.)-এর রমজানের সুসংবাদ ও উৎসাহদান : রাসুলুল্লাহ (সা.) তার সাহাবিদের এ মহান মাসের আগমনের সুসংবাদ দিতেন। তিনি তাদের এ মাসে ফরজ ও নফল আমল যেমন- নামাজ, সদকা, পরোপকার ও আল্লাহর আনুগত্যে ধৈর্য ধরার মাধ্যমে কঠোর পরিশ্রম করতে উৎসাহিত করতেন। এ ছাড়া দিনের বেলা রোজা রেখে এবং রাতে কিয়ামের মাধ্যমে সময়গুলোকে আবাদ করা এবং জিকির, শোকর, তাসবিহ-তাহলিল ও কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে এ বরকতময় সময়গুলোকে কাজে লাগানোর প্রেরণা দিতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এই তো রমজান তোমাদের মাঝে এসে গেছে; এতে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়।’ (সুনানে নাসাঈ : ২১০৩)। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘যখন রমজান মাসের প্রথম রাত আসে, তখন শয়তান ও অবাধ্য জিনদের বন্দি করা হয়। জাহান্নামের সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়, একটি দরজাও খোলা রাখা হয় না। আর জান্নাতের সব দরজা খুলে দেওয়া হয়, একটি দরজাও বন্ধ রাখা হয় না। এরপর একজন ঘোষণাকারী ডাক দিয়ে বলতে থাকে- হে কল্যাণের অন্বেষণকারী! এগিয়ে এসো। হে মন্দের অন্বেষণকারী! থেমে যাও। এ মাসে প্রতি রাতেই আল্লাহতায়ালা অনেক মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।’ (তিরমিজি : ৬৮২)।

কল্যাণ ও বরকতময় মাস : রমজান মাস উপস্থিত হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলতেন, ‘তোমাদের কাছে বরকতময় মাস রমজান এসেছে। আল্লাহ তোমাদের ওপর এ মাসের রোজা ফরজ করেছেন। এতে জান্নাতের দরজাগুলো উন্মুক্ত করা হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো রুদ্ধ করা হয় এবং শয়তানদের শিকলবদ্ধ করা হয়। এ মাসে এমন একটি রাত রয়েছে, যা হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ; যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে প্রকৃতপক্ষেই বঞ্চিত হলো।’ (মুসনাদে আহমদ : ৭১৪৮)। রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসকে ‘বরকতময় মাস’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এটি সত্যিই একটি মোবারক মাস; এর প্রতিটি মুহূর্ত বরকতে ভরপুর। এ বরকত পরিলক্ষিত হয় সময়ে, আমলে এবং আমলের প্রতিদান ও সওয়াবের ক্ষেত্রে। এ মাসেই রয়েছে সেই মহিমান্বিত লাইলাতুল কদর, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াব লাভের আশায় রমজানের রোজা পালন করবে, তার পূর্ববর্তী সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াব লাভের আশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদতে মগ্ন থাকবে, তারও পূর্ববর্তী সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (বোখারি : ২০১৪)।

বঞ্চনা ও ক্ষতির সতর্কবার্তা : মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় ক্ষতি এবং চরম বঞ্চনা আর কিছুই হতে পারে না যে, সে এ মহান বরকতময় রমজান পেল, অথচ তার গোনাহগুলো মাফ করিয়ে নিতে পারল না। নিজের সীমালঙ্ঘন, তওবার অনীহা এবং এ পবিত্র সময়ে আল্লাহর দিকে রুজু হওয়া, বিনয়াবনত হওয়া এবং ক্ষমা প্রার্থনায় অবহেলার কারণেই এমনটি ঘটে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, অনেকের জীবনে এ মহিমান্বিত মাস আসে এবং চলে যায়, অথচ সে তার পাপের ওপর অবিচল থাকে, ভুল পথে গোঁড়ামি করে এবং বিভ্রান্তিতেই নিমজ্জিত থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জিবরাইল (আ.) আমার কাছে এসে বললেন, হে মুহাম্মদ! যে ব্যক্তি তার পিতামাতার কোনো একজনকে পেল, অথচ (তাদের সেবা না করার কারণে) মারা যাওয়ার পর জাহান্নামে প্রবেশ করল, আল্লাহ তাকে স্বীয় রহমত থেকে দূর করে দিন। আপনি বলুন, আমিন। আমি আমিন বললাম। তিনি আবার বললেন, হে মুহাম্মদ! যে ব্যক্তি রমজান মাস পেল, অথচ (গোনাহ মাফ করাতে না পেরে) মারা যাওয়ার পর জাহান্নামে প্রবেশ করল, আল্লাহ তাকে নিজ রহমত থেকে দূর করে দিন। আপনি বলুন, আমিন। আমি বললাম, আমিন।

তিনি আরও বললেন, যার কাছে আপনার নাম উল্লেখ করা হলো, অথচ সে আপনার ওপর দুরুদ পাঠ করল না, এরপর সে মারা গিয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করল, আল্লাহ তাকে নিজ রহমত থেকে দূর করে দিন। আপনি বলুন, আমিন। আমি বললাম, আমিন।’ (আল মুজামুল কাবির : ২০২২)। সালাফে সালেহীন বা পূর্ববর্তী নেককারগণের কাছে রমজানের গুরুত্ব এমনই ছিল, চরম একাগ্রতা ও প্রচেষ্টা, সিয়াম ও কিয়াম, ইবাদত ও কোরআন তেলাওয়াত, তাহলিল ও তাসবিহ এবং দয়া, সহমর্মিতা ও অন্যকে খাবার খাওয়ানোর মাস। তারা চাইতেন, বেশি বেশি ইবাদতে লিপ্ত থেকে এ মাসের ফায়দা হাসিল করতে।

রমজানকে সম্মানিত অতিথিরূপে বরণ : রমজান মাস মুসলমানদের কাছে এক অতি আদরণীয় মেহমান এবং সম্মানিত আগন্তুক। তাই এ মেহমানকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বরণ করে নেওয়া আমাদের কর্তব্য। স্বাভাবিকভাবে কোনো সম্মানিত অতিথি যখন মানুষের দ্বারে আসেন, তখন মানুষ তার আগমনে আনন্দিত হয় এবং তাকে আপ্যায়ন করতে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়। আর রমজান হলো সবচেয়ে সম্মানিত, পবিত্র ও মহিমান্বিত অতিথি। তাই এ মাসটি পাওয়ার সুযোগ হওয়ায় আমাদের আনন্দিত হওয়া উচিত এবং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত যে, তিনি আমাদের এ পর্যন্ত হায়াত দিয়েছেন।

আমাদের কত আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশী গত রমজানে আমাদের সঙ্গে ছিলেন, কিন্তু মৃত্যু তাদের ছিনিয়ে নিয়েছে; তারা এ রমজান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি। তাই এ মাসটি পাওয়ার নেয়ামতের শোকরিয়া হিসেবে আমাদের উচিত, এর প্রতিটি বরকতময় মুহূর্তকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনকারী ইবাদত, নেক আমল, খাঁটি তওবা এবং ইহসানের মাধ্যমে অতিবাহিত করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়ায়; কাজেই এতেই তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। তারা যা জমা করে, এটি তার চেয়ে উত্তম।’ (সুরা ইউনুস : ৫৮)।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত