ঢাকা শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সাহাবিদের রমজান

আল আমিন রাহমানী
সাহাবিদের রমজান

পবিত্র রমজান মাস অবারিত রহমত, বরকত ও ক্ষমার ফল্গুধারায় অবগাহিত হওয়ার মাস। পাপাচার-অনাচারের কলুষমুক্ত হয়ে মহান রবের অনুগ্রহের চাদরে আশ্রয় নেওয়ার মাস। ইন্দ্রীয় শক্তির অবাধ চর্চাকে নিয়ন্ত্রণ করে শুদ্ধতার আবেশে অন্তকরণকে সুশোভিত করার মাস। মহিমান্বিত এ মাসে রাশি রাশি পুণ্যের সমারোহে সেজে ওঠে মোমিনের আমলের সোনালি জীবন। রাসুল (সা.) পুণ্যময়ী এ মাসের অনাবিল রহমত, বরকত ও ক্ষমা অর্জনের জন্য উম্মতকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছেন। তাই পবিত্র রমজানের আগমনে রাসুল (সা.)-এর অনুচর সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর জীবনচিত্র পাল্টে যেত। পার্থিব সব ব্যস্ততাকে এক পাশে ঠেলে নিবিড় ঐকান্তিকতায় ডুবে যেতেন মহামহিম রবের ইবাদত-অর্চনায়। সাহাবি জীবনে ফুটে ওঠা রমজানের সে সোনালি চিত্রে আমাদের জন্য রয়েছে অনুপম শিক্ষার অমূল্য উপকরণ। পবিত্র রমজানে সাহাবি-জীবনের কিছু চিত্র তুলে ধরা হলো-

আবু হুরায়রা (রা.) : রাসুল (সা.)-এর সর্বক্ষণের সঙ্গী বিখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) রমজান মাসে দিনের সময়টুকু মসজিদেই কাটিয়ে দিতেন। আবু নুআইম (রহ.) তার সম্পর্কে বলেন, ‘আবু হুরায়রা (রা.) ও তার সঙ্গীরা রমজানে মসজিদে অবস্থান করতেন। তারা বলতেন, আমরা আমাদের রোজা পবিত্র করছি।’ (হিলয়াতুল আউলিয়া : ৩৮২/১)।

পরম নির্মোহ এ সাহাবি (রা.) রমজানে খুব সামান্য খাবার গ্রহণ করতেন। কয়েকটি খেজুর দিয়েই তিনি সাহরি ও ইফতার সম্পন্ন করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মুক্তদাস আবু জিয়াদ (রহ.) তার ব্যাপারে বলেন, ‘তিনি একবার বললেন, আমার কাছে পনেরোটি খেজুর আছে। আমি পাঁচটি দিয়ে ইফতার করব, পাঁচটি দিয়ে সাহরি করব এবং পাঁচটি পরবর্তী ইফতারের জন্য রেখে দেব।’ (হিলয়াতুল আউলিয়া : ৩৮৪/১)।

আবু হুরায়রা (রা.) রমজানে অধিক পানাহার করলে আলস্য পেয়ে বসার ভয় পেতেন। তিনি নিজেই বলতেন, ‘আমার পেটের জন্য অভিশাপ! যখন তাকে পরিতৃপ্ত করি, আমাকে ভারি করে তোলে। আর যখন তাকে ক্ষুধার্ত রাখি, আমাকে গালমন্দ করে।’ (হিলয়াতুল আউলিয়া : ৩৮২/১)।

আবু হুরায়রা (রা.) রমজানে অধিকহারে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন। তিনি নিজেও আদায় করতেন এবং পরিবারকেও উদ্বুদ্ধ করতেন। আল্লামা ইবনুল জাওযি (রহ.) বর্ণনা করেন, ‘তিনি রাতকে তিনভাগে ভাগ করতেন। তার স্ত্রী, তাদের সেবক এবং তিনি পালাক্রমে এ সময়ে ইবাদতে মশগুল হতেন। একজন ঘুমিয়ে পড়লে অপরজনকে ডেকে দিতেন। যেন রাতের কোনো অংশে তাদের ঘর ইবাদতশূন্য না হয়।’ (সিফাতুস সাফওয়া : ২৬৯/১)।

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) : বিখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) সর্বদা অসহায়-দুস্থদের নিয়ে ইফতার করতেন। তার পরিবার কখনও আপত্তি করলে তিনি সে রাতে আর খাবার খেতেন না। কখনও খাবার খাওয়া অবস্থায় কোনো ভিক্ষুক চলে এলে তিনি তার অংশ নিয়ে তাকে দিতেন। নিজে অভুক্ত অবস্থায় রাত পার করতেন।’ (লাতায়িফুল মাআরিফ : ১৬৮/১)।

ইবনে ওমর (রা.) এর হাতেগড়া শিষ্য ইমাম নাফে (রহ.) বলেন, ‘রমজানে ইবনে ওমর (রা.) বাড়ি থাকতেন। যখন (রাতে) মসজিদ থেকে লোকজন চলে যেত, তিনি পানির একটি মশক নিয়ে মসজিদে নববিতে চলে যেতেন। সারারাত ইবাদতে কাটিয়ে ফজর পড়ে বেরুতেন।’ (সিফাতুস সাফওয়া : ২৭১/১)।

আনাস ইবনে মালেক (রা.) : রাসুল (সা.)-এর দীর্ঘকালের খাদেম আনাস (রা.) রমজানের রাতে প্রিয় রাসুল (সা.)-এর পেছনে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। তিনি বলেন, রাসুল (সা.) রমজানে (রাতে) সালাত আদায় করতেন। একদিন আমি এসে তার পাশে দাঁড়ালাম। এরপর এক ব্যক্তি এসে দাঁড়াল। এভাবে কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা একটি দলে পরিণত হলাম। রাসুল (সা.) যখন টের পেলেন, আমরা তার পেছনে দাঁড়ানো, তখন সংক্ষেপে সালাত আদায় করতে লাগলেন। এরপর তিনি তার ঘরে ঢুকে একাকী সালাত আদায় করলেন। সকালে আমরা তাকে বললাম, ‘আপনি রাতে কৌশলে আমাদের থেকে সরে পড়েছেন!’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ। তোমরা জড়ো হওয়ায় আমাকে কৌশল করতে হয়েছে।’ (মুসলিম : ১১০৪)।

ওসমান (রা.) : বোখারি শরিফের ব্যাখ্যাকার ইবনে বাত্তাল (রহ.) বর্ণনা করেন, ‘ইসলামের তৃতীয় খলিফা ওসমান ইবনে আফফান (রা.) প্রতি রাতে পূর্ণ এক খতম কোরআনে কারিম তেলাওয়াত করতেন।’ (শরহু ইবনে বাত্তাল : ৩৯০/২)।

তামিম দারি (রা.) : প্রসিদ্ধ সাহাবি তামিম দারি (রা.) রমজানের রাতে পূর্ণ কোরআন খতম করতেন। (শরহু ইবনে বাত্তাল : ৩৯০/২)।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত