ঢাকা শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

গোনাহ ছাড়ুন তওবা করুন

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ
গোনাহ ছাড়ুন তওবা করুন

মানুষ ভুলের উর্ধ্বে নয়। কিন্তু ভুল নিয়ে বসে থাকাও কাম্য নয়। এর জন্য তওবা করা প্রয়োজন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক আদম সন্তানই বারবার ভুল করে। আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে ভুলের পর তওবা করে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৫১)। এ কারণে তওবা অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। এটি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি ও প্রতিনিধি মানুষের জন্য বড় নেয়ামত। তাঁর করুণা ও অশেষ দয়া প্রাপ্তির অনন্য মাধ্যম।

তওবার মাধ্যমে মানুষ পাপ-পঙ্কিলতা মোচন করে। শরিয়তবহির্ভূত কাজ ছেড়ে ইসলাম নির্দেশিত পথে ফিরে আসে। আল্লাহর বিধানের ওপর অটল-অবিচল থাকে। তাই আল্লাহতায়ালা সবাইকে তওবার প্রতি আহ্বান করেছেন। তিনি বলেন, ‘হে মোমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো; যেন সফল হতে পারো।’ (সুরা নুর : ৩১)। আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘হে মোমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি মনে তওবা করো।’ (সুরা তাহরিম : ৮)।

মাহে রমজানের শেষ দশক গোনাহ মাফের মোক্ষম সময়। বান্দা গোনাহ করে। আর আল্লাহ বান্দাকে ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। তবে তাঁর কাছে মাফ চাইতে হবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করে ফিরে এসো।’ (মুসলিম : ৭০৩৪)। বিশেষজ্ঞ আলেমগণ সর্বসম্মতিক্রমে বলেন, ‘সর্বদা তওবা করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আবশ্যক।’ ইমাম কুরতুবি (রহ.) ও ইমাম নববি (রহ.) এ কথাই তাদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

তওবা জান্নাত প্রাপ্তি ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও ভালোবাসা লাভের একটি বড় সুযোগ ও উপায়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অধিকহারে তওবাকারীকে ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা : ২২২)। হাদিসে তওবার অনেক উপকারিতা ও গুরুত্বের কথা উল্লিখিত হয়েছে। এর মধ্যে বিপদাপদ, সঙ্কট ও দুশ্চিন্তা দূর হওয়া এবং অকল্পনীয় রিজিক পাওয়া অন্যতম। (সুনানে আবি দাউদ : ১৫১৮)। আল্লাহর ভালোবাসার পাথেয় হলো তওবা। আর এই তওবা হতে হবে শুধু আল্লাহর জন্য। কর্মের ফলাফল নির্ভর করে নিয়তের ওপর। সুতরাং তওবা আল্লাহর জন্য হলে এর কাঙ্ক্ষিত ফজিলত লাভ করা যাবে।

গোনাহ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গেই তওবা করা জরুরি। গোনাহের সঙ্গে সঙ্গে তওবা না করে শেষ জীবনে দাড়ি-চুল পাকলে তওবা করার অপেক্ষায় না থাকা কিংবা অবহেলা না করা উচিত। কারও নসিবে সে সময় নাও জুটতে পারে। এর আগেই মৃত্যু এসে যেতে পারে। আর মৃত্যু চলে এলে তওবা করার আর সুযোগ থাকবে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা অজান্তে মন্দ কাজ করল, নিশ্চয়ই তাদের তওবা কবুল করা আল্লাহর দায়িত্ব। এরপর অনতিবিলম্বে তারা তওবা করে। তারপর আল্লাহতায়ালা এদের তওবা কবুল করবেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, অতি প্রজ্ঞাময়। আর তওবা নেই তাদের, যারা অন্যায় কাজগুলো করতে থাকে; অবশেষে যখন তাদের কারও মৃত্যু এসে পড়ে, তখন বলে- আমি এখন তওবা করলাম। তওবা তাদের জন্যও কাজের নয়, যারা কাফের অবস্থায় মারা যায়। আমি এদের জন্যই যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রেখেছি।’ (সুরা নিসা : ১৭-১৮)।

মৃত্যুকালে আল্লাহর শাস্তি অনুভব করার পর তওবা কোনো কাজে আসে না। কারণ, মৃত্যুর সময় ফেরাউনের ঈমান তার কোনো উপকারে আসেনি। সুতরাং কেউ আল্লাহর আজাব গ্রাস করার মুহূর্তে তওবা করলে তা তার কোনো কাজে দেবে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা যখন আমার আজাব দেখল, তখন বলল- আমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলাম। যাদেরকে আমরা তাঁর সঙ্গে শরিক করতাম, তাদের প্রত্যাখ্যান করলাম। সুতরাং তারা যখন আমার আজাব দেখল, তখন তাদের ঈমান তাদের কোনো কাজে এলো না। এটা আল্লাহর বিধান। তাঁর বান্দাদের মধ্যে চলে এসেছে। আর তখনই ওই ক্ষেত্রে কাফেররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ (সুরা মোমিন : ৮৪-৮৫)।

মহান আল্লাহর হক বা অধিকার সম্পর্কিত তওবার তিন শর্ত- এক. পাপ পুরোপুরিভাবে ছেড়ে দিতে হবে; দুই. পাপের জন্য অনুশোচনা করতে হবে, লজ্জিত ও অনুতপ্ত হতে হবে; তিন. ওই পাপ দ্বিতীয়বার না করার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। এর ওপর অটল অবিচল থাকতে হবে। আর মানুষের হক বা অধিকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তওবায় সেই ব্যক্তির কাছে মাফ চেয়ে নিতে হবে অথবা তার পাওনা-প্রাপ্তি বা হক ফিরিয়ে দিতে হবে। এ শর্তগুলো পূরণ করলেই তওবা শুদ্ধ হবে।

তওবার জন্য প্রথমে ভালোভাবে অজু করতে হবে। এরপর দু’রাকাত নামাজ পড়ে বিগত জীবনের সব পাপ ও আদেশ অমান্য করার অপরাধ থেকে মাফ চাইতে হবে। তবে এই একবার নফল নামাজ সারাজীবনের তওবার জন্য যথেষ্ট নয়। তওবার সময়সীমা মৃত্যুর নিদর্শন প্রকাশ পাওয়ার আগ পর্যন্ত। রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবা কবুল করেন, যতক্ষণ না সে (মৃত্যু যন্ত্রণায়) গরগর করে।’ (তিরমিজি : ৩৫৩৭)। তওবার মানে এই নয়, সেই শেষ সময়ের প্রতীক্ষা করব; আর মৃত্যুর সময় কাছাকাছি এলে তওবা করে নেব। প্রকৃত সত্য হলো, আমরা কেউই জানি না- ঠিক কখন আমাদের মৃত্যুসময় ঘনিয়ে আসবে। তাই পাপে মগ্ন থাকার সুযোগ নেই। সর্বোচ্চ এ সময়সীমা মানুষের জন্য আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো। কেননা, আমি প্রতিদিন শতবার তাঁর কাছে তওবা করি।’ (মুসলিম : ৭০৩৪)। তাই অবসর পেলেই মন দিয়ে ‘আসতাগফিরুল্লাহা রাব্বি মিন কুল্লি যামবিউ ওয়া আতুবু ইলাইহি’ ইসতিগফারটি পাঠ করা চাই।

লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক গবেষক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত