মক্কা শরিফের জুমার খুতবা
তাকদিরে ঈমান ও তার প্রভাব
ড. ইয়াসির বিন রাশেদ আদ-দাওসারি
প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভালো-মন্দ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে হওয়ার তাকদির বা ভাগ্যের ওপর ঈমান রাখা ঈমানের মূল স্তম্ভ। এ কথা রাসুলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করে, জান্নাতে প্রবেশের সৌভাগ্য অর্জন করে ও জাহান্নাম থেকে রক্ষা পায়। জায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘তোমার কাছে যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনা থাকে, যা তুমি আল্লাহর পথে ব্যয় কর, তবু তা গ্রহণ করা হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাকদিরে বিশ্বাস কর। অর্থাৎ তুমি বিশ্বাস করবে যা তোমার কাছে পৌঁছেছে, তা কখনোই তোমাকে এড়িয়ে যাওয়ার ছিল না; আর যা তোমাকে এড়িয়ে গেছে, তা কখনোই তোমার কাছে আসার ছিল না। আর যদি তুমি এর বাইরে অবস্থায় মারা যাও, তবে তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৭৭)। যখন এ বিশ্বাস অন্তরে দৃঢ়ভাবে স্থির হয়, তখন তা মানুষকে তার আমলে উৎসাহিত করে ও জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে পূর্ণতার উচ্চ স্তরে উন্নীত করে।
তাকদির আল্লাহর সৃষ্টির গোপন রহস্য : আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, সবই তাঁর প্রজ্ঞার ভিত্তিতে ঘটে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি সবকিছু নির্ধারিত পরিমাপে সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা কমার : ৪৯)। তিনি আরও বলেন, ‘তিনি যথাযথ অনুপাতে সবকিছু সৃষ্টি করেছেন ও প্রত্যেককে পরিমিত করেছেন।’ (সুরা ফোরকান : ২)। তিনিই সৃষ্টি করেন ও ধ্বংস করেন, দারিদ্র্য দেন ও সম্পদ দেন, মৃত্যু দেন ও জীবন দেন, পথভ্রষ্ট করেন ও সঠিক পথ দেখান। তিনি যা আমাদের জানিয়েছেন, আমরা তা বিশ্বাস করি ও গ্রহণ করি। আর যা তিনি নিজের জ্ঞানে রেখে দিয়েছেন ও যার হেকমত আমাদের অজানা, সেটাও আমরা মেনে নিই ও সন্তুষ্ট থাকি। আমরা আল্লাহর পূর্ণ প্রজ্ঞা, মহান নির্ধারণ, তাঁর ইচ্ছার কার্যকারিতা ও উত্তম ব্যবস্থাপনার ওপর বিশ্বাস রাখি। তিনি এমন এক প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞ সত্তা, যাকে তাঁর কাজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয় না, বরং মানুষকেই জিজ্ঞেস করা হবে। তিনি সর্বাবস্থায় প্রশংসার যোগ্য। তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।
ঈমান সত্য হলে কথায়-কাজে বাস্তবায়ন : যে ব্যক্তি সত্যিকারার্থে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে ও বিশ্বাস করে, সবকিছুই প্রজ্ঞাময় দয়ালু আল্লাহর নির্ধারণ অনুযায়ী ঘটে, তার ঈমান সত্য হলে সে কথায় ও কাজে তা বাস্তবায়ন করে। আল্লাহ তার অন্তরকে সন্তুষ্টিতে স্থির রাখেন ও তাকে আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের পথে পরিচালিত করেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে আল্লাহকে বিশ্বাস করে, তিনি তার অন্তরকে সুপথে পরিচালিত করেন। আল্লাহ সব বিষয়ে সম্যক অবহিত।’ (সুরা তাগাবুন : ১১)। যে ব্যক্তি অন্তর দিয়ে আল্লাহর ওপর নির্ভর করে তাঁর সাহায্য চায়, আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন। যে তাঁর আশ্রয় নেয়, আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন। যে তাঁর পথে কষ্ট ও ভার বহন করে, আল্লাহ তা তার জন্য সহজ করে দেন। আর যে সত্যভাবে তাঁর দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হন ও তাকে কল্যাণের পথ সুগম করে দেন। অতএব, যে লোক জানে- মৃত্যু নির্ধারিত, সে কেন মানুষের ভয় করবে? যে জানে রিজিক বণ্টিত, সে কেন দারিদ্র্যের ভয় করবে? যে জানে- বিপদাপদ আল্লাহর নির্ধারণ, সে কেন অসন্তুষ্ট হবে? আর যে জানে- এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে, সে কেন এর প্রতিদান আশা করবে না? বান্দা যখন এভাবে বিশ্বাস করে, আল্লাহ তার জন্য বিপদ ও কষ্ট সহজ করে দেন এবং বিপদের সময় তাকে দৃঢ়তা দান করেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা শাশ্বত বাণীতে বিশ্বাসী, তাদেরকে দুনিয়ার জীবনে ও আখেরাতে আল্লাহ সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন।’ (সুরা ইবরাহিম : ২৭)। এ ছাড়া এর মাধ্যমে সে মহান সওয়াব ও বিপুল প্রতিদান লাভ করে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর জমিন প্রশস্ত, ধৈর্যশীলদের তো অপরিমিত পুরস্কার দেওয়া হবে।’ (সুরা জুমার : ১০)। এটি ঈমানদারদের জন্য আল্লাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিদান।
তাকদিরের ওপর ঈমানের চার স্তর : তাকদিরের ওপর ঈমানের চারটি স্তর রয়েছে- প্রথম স্তর হলো জ্ঞান। এটি হলো আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞ হওয়াতে বিশ্বাস করা। তিনি জানেন- যা ঘটেছে, যা ঘটছে, যা ঘটবে, এমনকি যা ঘটেনি তা যদি ঘটত, কেমন করে ঘটত! তাও তিনি জানেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি যে কোনো অবস্থায় থাক ও সে সম্পর্কে তুমি কোরআন থেকে যা তেলাওয়াত কর এবং তোমরা যে কোনো কাজ কর, আমি তোমাদের পরিদর্শক- যখন তোমরা এতে প্রবৃত্ত হও। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অণু পরিমাণও তোমার প্রতিপালকের অগোচর নয়। এ অপেক্ষা ক্ষুদ্রতর বা বৃহত্তর কিছুই নেই, যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।’ (সুরা ইউনুস : ৬১)।
দ্বিতীয় স্তর হলো লেখা। এটি এ কথা বিশ্বাস করা- আল্লাহ সব সৃষ্টির ভাগ্য লওহে মাহফুজে লিখে রেখেছেন। তিনি আয়ু, জীবনকাল, সুখ-দুঃখ, রিজিক ও আমল সবকিছু লিখে রেখেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর আগে সব সৃষ্টির তাকদির লিখে রেখেছেন।’ (মুসলিম : ৬৬৪১)।
তৃতীয় স্তর হলো ইচ্ছা ও সংকল্পের স্তর। এটি হলো এ বিশ্বাস রাখা- এ বিশ্বে যা কিছু ঘটে, সবই আল্লাহর কার্যকর ইচ্ছার মাধ্যমেই ঘটে। তাঁর ইচ্ছা ও সংকল্পের বাইরে কিছুই ঘটে না, ছোট-বড় কিছুই নয়। আল্লাহ যা চান তা-ই হয়, আর যা তিনি চান না তা কখনোই হয় না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কখনোই তুমি কোনো বিষয়ে বলো না- আমি তা আগামীকাল করব, আল্লাহ ইচ্ছা করলে- এ কথা না বলে।’ (সুরা কাহফ : ২৩-২৪)।
চতুর্থ স্তর হলো সৃষ্টি বা সৃষ্টির স্তর। এটি হলো এ বিশ্বাস রাখা- আল্লাহতায়ালাই সবকিছুর স্রষ্টা। তিনি ছাড়া আর কোনো স্রষ্টা নেই, আর কোনো প্রতিপালকও নেই। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা। আর তিনি সবকিছুর কর্মবিধায়ক।’ (সুরা জুমার : ৬২)।
তাকদিরে ঈমান আনার ফলাফল : তাকদিরে ঈমান আনার অনেক বড় বড় ফল ও উপকারিতা রয়েছে, যা গণনা করা যায় না, সীমাবদ্ধ করা যায় না। তার মধ্যে রয়েছে, মনের প্রশান্তি ও হৃদয়ের শান্তি এবং যা হারিয়ে গেছে বা চলে গেছে তার জন্য দুঃখ না করা। মোমিন ব্যক্তি প্রিয় কিছু হারালে দুঃখিত হয় না, আর কাঙ্ক্ষিত কিছু পেলে অতিরিক্ত আনন্দিত হয় না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এটা এ জন্য যে, তোমরা যা হারিয়েছ তাতে যেন তোমরা বিমর্ষ না হও এবং যা তিনি তোমাদের দিয়েছেন তার জন্য হর্ষোৎফুল্ল না হও। আল্লাহ উদ্ধত ও অহংকারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা হাদিদ : ২৩)। যে ব্যক্তি জানে- সবকিছু তাকদির অনুযায়ী ঘটে, তার জন্য কষ্ট সহ্য করা সহজ হয়ে যায়। সে নিজেকে বিপদের সময় ধৈর্য ধরার জন্য প্রস্তুত করে এবং এমন কিছু করে না বা বলে না, যা তার প্রতিপালককে অসন্তুষ্ট করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা তাদের ওপর বিপদ আপতিত হলে বলে- আমরা তো আল্লাহরই এবং নিশ্চিতভাবে তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।’ (সুরা বাকারা : ১৫৬)।
দ্বিতীয় ফল হলো, আল্লাহর আদেশের প্রতি আত্মসমর্পণ করা ও এ বিশ্বাস রাখা, বান্দার জন্য ভালো সেটিই, যা তার প্রতিপালক নির্বাচন করেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের জন্য যুদ্ধের বিধান দেওয়া হলো যদিও তোমাদের কাছে তা অপ্রিয়। কিন্তু তোমরা যা অপছন্দ কর, সম্ভবত তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর আর যা ভালোবাস সম্ভবত তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন আর তোমরা জান না।’ (সুরা বাকারা : ২১৬)। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন, ‘আমি কোনো অবস্থার পরোয়া করি না। আমি যা পছন্দ করি তা-ই হোক বা যা অপছন্দ করি তা-ই হোক। কারণ, আমি জানি না- কল্যাণ কোনটিতে, যা আমি পছন্দ করি নাকি যা অপছন্দ করি!’
তৃতীয় ফল হলো, আল্লাহর নির্ধারিত ভাগ্যের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা ও বৈধ উপায় গ্রহণ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তাতে সন্তুষ্ট থাকো, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে ধনী হবে।’ (তিরমিজি : ২৩০৫)।
চতুর্থ ফল হলো- হিংসা, বিদ্বেষ ও অন্তরের ক্ষোভ থেকে হৃদয়কে পবিত্র রাখা। কারণ, এগুলো খারাপ হৃদয়ের রোগ; যা মানুষকে আল্লাহর নির্ধারণের ওপর আপত্তি করতে নিয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের থেকে যারা নিচে আছে তাদের দিকে তাকাও, আর যারা ওপরে আছে তাদের দিকে তাকিও না। এতে তোমরা আল্লাহর নেয়ামতকে তুচ্ছ মনে করবে না।’ (মুসলিম : ৭৩২০)।
পঞ্চম ফল হলো, পরীক্ষার সময় ধৈর্য ধরা ও নেয়ামতের সময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মোমিনের অবস্থা আশ্চর্যজনক; তার প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর। এটি কেবল মোমিনের জন্যই। যদি সে সুখ পায়, সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। এটি তার জন্য কল্যাণকর; আর যদি সে কষ্ট পায়, সে ধৈর্য ধারণ করে। এটিও তার জন্য কল্যাণকর।’ (মুসলিম : ৭৩৯০)। আতা ইবনে আবি রাবা (রহ.) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) আমাকে বললেন, ‘আমি কি তোমাকে একজন জান্নাতি নারীকে দেখাব?’ বললাম, ‘হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, ‘এ কালো নারী। সে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বলেছিল, আমার খিঁচুনি হয় ও তাতে আমার শরীর উন্মুক্ত হয়ে যায়। আপনি আমার জন্য দোয়া করুন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তুমি চাইলে ধৈর্য ধর, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত; আর চাইলে আমি আল্লাহর কাছে তোমার সুস্থতার জন্য দোয়া করি। সে বলল, আমি ধৈর্য ধরব। তারপর বলল, তবে আমার শরীর যেন উন্মুক্ত না হয়, এজন্য দোয়া করুন। তখন তিনি তার জন্য দোয়া করলেন।’ (মুসলিম : ৬৪৬৫)।
২৯ শাওয়াল ১৪৪৭ (১৭ এপ্রিল ২০২৬) তারিখে মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন- আবদুল কাইয়ুম শেখ
