মক্কা শরিফের জুমার খুতবা
হজের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষার আহ্বান
শায়খ আবদুর রহমান বিন আবদুল আজিজ আস সুদাইস
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আল্লাহর পবিত্র ঘরের আগত প্রতিনিধিদল বিভিন্ন দিক থেকে আসা শুরু করছে। আল্লাহ বলেছেন, ‘মানুষের কাছে হজের ঘোষণা করে দাও। এরা তোমার কাছে আসবে পদব্রজে ও সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উটের পিঠে। এরা আসবে দূর-দূরান্তের পথ পাড়ি দিয়ে।’ (সুরা হজ : ২৭)। সুতরাং আপনাদের সবাইকে আন্তরিক স্বাগতম হে দয়াময়ের অতিথিরা! এ সবচেয়ে পবিত্র ভূমি ও স্থানসমূহে, সবচেয়ে পবিত্র অঞ্চল ও প্রান্তরে। আপনারা সুন্দরভাবে সহজেই পদার্পণ করেছেন। এটাই মক্কা মোকাররমা; ধর্ম ও ইসলামের সূতিকাগার, সম্মানিত নবী-রাসুলদের প্রেরণের স্থান। যুগে যুগে ও কালের পরিক্রমায় এটি মর্যাদা ও সম্মানের কেন্দ্র। মহান আল্লাহ এটিকে নির্বাচন করেছেন, এর আশপাশে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে, এখানেই মানবজাতির নেতা মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ, লালন-পালন ও নবুওয়তপ্রাপ্ত হয়েছেন।
কাবাঘরের মর্যাদা ও পবিত্রতা স্মরণ রাখুন : মহান আল্লাহ এ বরকতময় দেশ সৌদি আরবকে বিশেষ মর্যাদা ও মহান বৈশিষ্ট্যে সম্মানিত করেছেন। এর মধ্যে একটি হলো, এতে রয়েছে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম স্থাপিত আল্লাহর ইবাদতের ঘর; যা তাওহিদ, ঐক্য, ইবাদত ও অনুভূতির প্রতীক এবং নিরাপত্তা ও শান্তির কেন্দ্র। আল্লাহ এ পবিত্র ঘরকে বরকতময় ও সমগ্র বিশ্বের জন্য পথনির্দেশ করেছেন তাঁর মহান অনুগ্রহ ও উদারতার অংশ হিসেবে। যারা এ পবিত্র নগর ও প্রাচীন ঘরের উদ্দেশ্যে আসে, তাদের জন্য এখানে নামাজের সওয়াব বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, আর প্রতিদানও বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। আল্লাহ মহান! কী মহান ঐশী অনুগ্রহ, কী দয়ালু দান, যা আল্লাহ এ পবিত্র ঘর ও এর আগতদের জন্য নির্দিষ্ট করেছেন। তাই সর্বদা এ স্থানের মহিমা, মর্যাদা, পবিত্রতা ও সম্মান স্মরণ রাখুন। আল্লাহ বলেন, ‘পবিত্র কাবাঘর, পবিত্র মাস, কোরবানির জন্য কাবায় প্রেরিত পশু ও গলায় মালা পরিহিত পশুকে আল্লাহ মানুষের কল্যাণের জন্য নির্ধারণ করেছেন।’ (সুরা মায়িদা : ৯৭)। এটিও এর বরকত ও বিশ্বজনীন পথনির্দেশনার একটি দিক। আরেকটি দিক হলো, সেই বরকতময় দোয়াগুলো, যা ইবরাহিম (আ.) তাঁর রবের কাছে করেছিলেন। যাতে মক্কাকে নিরাপত্তা, প্রশান্তি, খাঁটি তাওহিদ ও ঈমানের শহর বলা হয়। কোরআনে এসেছে, ‘স্মরণ কর, ইবরাহিম বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক! এ নগরীকে নিরাপদ কর এবং আমাকে ও আমার সন্তানদের প্রতিমা পূজা থেকে দূরে রেখ।’ (সুরা ইবরাহিম : ৩৫)।
বিশ্ববাসীর জন্য সর্বোচ্চ পথনির্দেশনা : খাঁটি তাওহিদ প্রতিষ্ঠা করা এবং তাকে সন্দেহ, বিকৃতি ও নব উদ্ভাবিত বিষয় থেকে মুক্ত রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যা এ নিরাপদ নগরের আগতদের জন্য অপরিহার্য। বিশেষ করে, সম্মানিত কাবার কাছে ও সাধারণভাবে সব স্থানে। এটিই বিশ্ববাসীর জন্য সর্বোচ্চ পথনির্দেশনা, যা প্রাচীন ঘরের ছায়ায় ও দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তার পরিবেশে বাস্তবায়িত হয়, যা এ বরকতময় সৌদি আরব ভোগ করছে। এটি দুই পবিত্র মসজিদের রক্ষক, নিরাপত্তা ও শান্তির শেখর এবং তাওহিদ ও ঈমানের আশ্রয়স্থল। এর নিরাপত্তা রক্ষা করা ইবাদত ও নৈকট্য লাভের মাধ্যম; যার মাধ্যমে বান্দারা তাদের রবের নিকটবর্তী হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এরা কি দেখে না- আমি হারামকে নিরাপদ স্থান করেছি; অথচ এর চারপাশে যেসব মানুষ আছে, তাদের ওপর হামলা করা হয়।’ (সুরা আনকাবুত : ৬৭)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘সেই সময়কে স্মরণ কর, যখন আমি কাবাঘরকে মানবজাতির মিলনকেন্দ্র ও নিরাপত্তাস্থল করেছি।’ (সুরা বাকারা : ১২৫)। এখানে অস্থির মানুষ শান্তি পায়, ভীতসন্ত্রস্ত লোকেরা নিরাপত্তা অনুভব করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এ নগরকে আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টি করার দিন থেকেই পবিত্র করেছেন; সুতরাং কেয়ামত পর্যন্ত এটি আল্লাহর পক্ষ থেকেই পবিত্র থাকবে।’ (মুসলিম : ৩১৯৩)।
হজের বিধি-নিষেধ জানা ও মানা আবশ্যক : হজ মহান ইবাদত, যার কিছু শর্ত, রোকন ও ওয়াজিব আছে; যা প্রত্যেক আগত ব্যক্তির জানা ও মানা আবশ্যক। যেন তার হজ আল্লাহর কাছে কবুল হয়। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘যে আল্লাহর জন্য হজ করে এবং অশ্লীলতা ও পাপ থেকে বিরত থাকে, সে এমনভাবে ফিরে আসে, যেন তার মা তাকে আজই জন্ম দিয়েছে।’ (বোখারি : ১৮২০)। সবচেয়ে বড় শিক্ষা ও দায়িত্ব হলো, হজ যেন একমাত্র আল্লাহর জন্য খাঁটি তাওহিদ প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়। আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ কর, যখন আমি ইবরাহিমের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম সেই ঘরের স্থান, তখন বলেছিলাম, আমার সঙ্গে কোনো শরিক স্থির করো না এবং আমার ঘরকে পবিত্র রেখ তাদের জন্য, যারা তাওয়াফ করে এবং যারা নামাজে দাঁড়ায়, রুকু ও সেজদা করে।’ (সুরা হজ : ২৬)। কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সবকিছু থেকে দূরে থাকা এবং এমন সব আকিদা থেকে বিরত থাকা চাই, যা এ উম্মাহর পূর্বসূরিদের ওপর ছিল না। মুসলিম উম্মাহর উচিত, তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভ্রান্তিকর মিডিয়া ও ফেতনার দাওয়াতকারীদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সচেতন থাকা। তাই প্রয়োজন সতর্কতা, যাচাই-বাছাই, প্রজ্ঞা, ঐক্যবদ্ধ থাকা এবং এক কাতারে দৃঢ় থাকা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রশি দৃঢ়ভাবে ধর আর পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সুরা আলে ইমরান : ১০৩)।
আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন : তিনি আপনাদের এ পবিত্র স্থানে পৌঁছার সুযোগ দিয়েছেন এবং আপনারা স্থান ও সময়ের সম্মান লাভ করছেন। কারণ, এটি হজের মাস ও হারাম মাসসমূহের অন্তর্ভুক্ত; যেগুলো সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয় আকাশমণ্ডলো ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর কাছে মাস গণনায় মাস বারটি। এর মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।’ (সুরা তাওবা : ৩৬)। আলেমরা বলেন, এর মানে হলো- গোনাহ ও অবাধ্যতার মাধ্যমে নিজেদের ওপর জুলুম করো না। তাই এ হারাম মাসগুলোর মর্যাদা ও গুরুত্ব বুঝে এ স্থানের সম্মান ও ফজিলত উপলব্ধি করা চাই। সচেতনতা ও উত্তম চরিত্রকে নিজেদের পরিচয় বানান। দুর্বল ও অভাবীদের সাহায্য করুন। পথহারা মানুষকে কোমলতা ও হাসিমুখে পথ দেখান। শান্ত, স্থির, নম্র ও দয়ালু হোন। যথাসম্ভব সঠিক পথে চলার চেষ্টা করুন। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ভাইদের সহায়তা করুন। শৃঙ্খলা বজায় রাখুন। যাবতীয় নির্দেশনা মেনে চলুন।
৭ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ২৪ এপ্রিল ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার মসজিদে হারামের জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন - আবদুল কাইয়ুম শেখ
