মক্কা শরিফের জুমার খুতবা

হারাম মাসের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য

শায়খ ড. ফয়সাল বিন জামিল গাজ্জাবি

প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মহান আল্লাহর প্রজ্ঞা, তাঁর একত্বের নিদর্শন ও পরিপূর্ণ গুণগুলোর অন্যতম হলো, তিনি তাঁর কিছু সৃষ্টিকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন ও যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন।’ (সুরা কাসাস : ৬৮)। আল্লাহর এ মনোনয়নের একটি দিক হলো, সময় ও স্থানকে বিশেষভাবে নির্বাচন করা। সময়ের ক্ষেত্রে আমরা দেখি, মহান আল্লাহ হজের মাস ও হারাম মাসগুলোকে অন্যান্য মাসের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। তিনি রমজান মাসকে বছরের সব মাসের শ্রেষ্ঠ করেছেন; শুক্রবারকে সপ্তাহের অন্যান্য দিনের তুলনায়, কোরবানির দিনকে অন্যান্য দিনের ওপর ও শবে কদরকে অন্যান্য রাতের মাঝে শ্রেষ্ঠ করেছেন। আর স্থানগুলোর মধ্যে তিনি দেশগুলোর মধ্য থেকে সবচেয়ে উত্তম ও সম্মানিত স্থান হিসেবে মক্কা নগরীকে নির্বাচন করেছেন।

হারাম মাসের মর্যাদা ও তাৎপর্য : বর্তমানে সময় ও স্থানের মর্যাদা একত্রিত হয়েছে। অর্থাৎ হারাম মাসের সঙ্গে হারাম নগরীর মিলন ঘটেছে। আল্লাহ বলেন, ‘পবিত্র কাবাঘর, পবিত্র মাস, কোরবানির জন্য কাবায় প্রেরিত পশু ও গলায় মালা পরিহিত পশুকে আল্লাহ মানুষের কল্যাণের জন্য নির্ধারণ করেছেন। কারণ, তোমরা যেন জানতে পার- যা কিছু আসমান ও জমিনে আছে আল্লাহ তা জানেন। আল্লাহ তো সব বিষয়ে সর্বজ্ঞ।’ (সুরা মায়িদা : ৯৭)। মানুষের কল্যাণের জন্য নির্ধারণ হওয়ার অর্থ হলো, এটি তাদের দ্বীন-দুনিয়ার কার্যাবলির কেন্দ্রবিন্দু। এটি তাদের জীবনযাত্রা ও পরকালের কল্যাণের জন্য সমৃদ্ধির কারণ। ভীত ব্যক্তি এখানে আশ্রয় নেয়, দুর্বল ব্যক্তি নিরাপত্তা পায়, ব্যবসায়ীরা লাভবান হয় এবং হাজি ও ওমরা পালনকারীরা এখানে আসে। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন, ‘মানুষের কল্যাণ নির্ভর করে নবীর আদর্শ ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠার ওপর, যা তাদের মাঝে চালু থাকে। এর মাধ্যমেই তাদের কাজকর্ম ঠিক থাকে, তাদের কল্যাণ সাধিত হয় ও বিভিন্ন বিপদাপদ দূর হয়। আর যখন এগুলো পরিত্যক্ত হয়, উপেক্ষা করা হয় ও অন্য কিছুকে বিচারব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তখন তাদের ধ্বংস, কষ্ট, বিপদ ও অকল্যাণ নেমে আসে।’ হারাম মাসগুলোর মর্যাদা সম্পর্কে আরও বলা হয়, জাহেলি যুগে আরবরা এসব মাসকে সম্মান করত। তারা এসব মাসে রক্তপাত করত না, শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করত না ও কোনো পবিত্রতা লঙ্ঘন করত না। এমনকি কেউ যদি তার পিতার হত্যাকারীকেও পেত, তবু তাকে হত্যা করত না। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য মহিমান্বিত মৌসুম ও উত্তম দিনগুলো নির্ধারণ করেছেন, যাতে তা অনুগতদের জন্য লাভের সুযোগ হয় ও প্রতিযোগীদের জন্য প্রতিযোগিতার ময়দান হয়।

হজের মাসগুলোকে কাজে লাগানো দরকার : আল্লামা ইবনে রজব (রহ.) বলেন, ‘এ উত্তম মৌসুমগুলোর প্রতিটিতেই আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছু বিশেষ ইবাদত নির্ধারিত থাকে, যার মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জন করা যায়। এতে আল্লাহর রহমতের কিছু বিশেষ ছোঁয়া থাকে, যা তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন।

সুতরাং সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে এ মাস, দিন ও সময়গুলোকে কাজে লাগিয়ে তাতে ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। সম্ভবত সে আল্লাহর রহমতের কোনো ছোঁয়া লাভ করবে, যার মাধ্যমে সে এমন সৌভাগ্য অর্জন করবে যা তাকে জাহান্নাম থেকে নিরাপদ রাখবে।’ আমরা যেন অনুভব করি, আমরা জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনে অবস্থান করছি, যার শপথ আল্লাহ তাঁর কিতাবে এভাবে করেছেন, ‘শপথ ঊষার, শপথ দশ রজনীর।’ (সুরা ফজর : ১-২)। এ দশ দিন হলো হজের নির্ধারিত মাসগুলোর শেষাংশ, যেগুলো সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হজ হয় সুনির্দিষ্ট মাসসমূহে।’ (সুরা বাকারা : ১৯৭)। এ মাসগুলো হলো- শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজের প্রথম দশ দিন। অধিকাংশ আলেমের মতে, এ দশ দিনই সেই ‘নির্দিষ্ট দিনসমূহ’, যাতে আল্লাহ তাঁর দেওয়া পশুর ওপর তাঁর নাম স্মরণের নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের কাছে হজের ঘোষণা দাও, এরা তোমার কাছে আসবে পদব্রজে ও সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উটের পিঠে, এরা আসবে দূর-দূরান্ত পথ পেরিয়ে, যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু থেকে যা রিজিক হিসেবে দান করেছেন এর ওপর নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে। এরপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুস্থ, অভাবগ্রস্তকে আহার করাও।’ (সুরা হজ : ২৭-২৮)।

জিলহজের প্রথম দশকের গুরুত্ব : অধিকাংশ তাফসিরকারের মতে, এ ১০ দিনই সে দিনগুলো, যার মাধ্যমে আল্লাহ মুসা (আ.)-এর নির্ধারিত সময় পূর্ণ করেছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ কর, মুসার জন্য আমি ত্রিশ রাত নির্ধারণ করি ও আরও দশ দিয়ে তা পূর্ণ করি। এভাবে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত সময় চল্লিশ রাতে পূর্ণ হয়।’ (সুরা আরাফ : ১৪২)। এ দশ দিনের মধ্যেই রয়েছে আরাফা ও কোরবানির দিন। এ দিনগুলো মর্যাদায় অত্যন্ত উচ্চ, স্মরণে অত্যন্ত মহান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়ার সর্বোত্তম দিনগুলো হলো এ দশ দিন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ১০ দিনের চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় কোনো দিন নেই, যাতে নেক আমল করা হয়।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর পথে জিহাদও নয়?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর পথে জিহাদও নয়; তবে সেই ব্যক্তি ছাড়া, যে নিজের জানমাল নিয়ে বের হয় এবং কিছুই নিয়ে ফিরে আসে না।’ (সুনানে আবি দাউদ : ২৪৩৮)। অতএব, এ দশ দিনে নেক আমল আল্লাহর কাছে অধিক পবিত্র ও প্রতিদানযোগ্য।

মনীষীদের চোখে জিলহজের প্রথম দশক : জিলহজের প্রথম ১০ দিনের প্রতি অনাগ্রহ দেখায় শুধু সেই ব্যক্তি, যে বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত। কারণ, এ দিনগুলো তার কাছে আসে, কিন্তু এর হক সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কারণে সে এর মর্যাদা বোঝে না। কিন্তু সফল মোমিন এর মর্যাদা বোঝার সঙ্গে সঙ্গে এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে। এটি আল্লাহর দেওয়া মৌসুম, যা প্রতি হিজরি বছরে আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অপেক্ষা করে। যখন আল্লাহ তাকে এ সময়গুলোতে পৌঁছার তৌফিক দেন, তখন সে আগ্রহভরে এগিয়ে আসে। এতে বিশেষভাবে মনোযোগী হয়। এজন্যই আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ও আবু হুরায়রা (রা.) এ দশ দিনে বাজারে বের হতেন ও তাকবির দিতেন। আর মানুষও তাদের তাকবির অনুসরণ করে তাকবির দিত। এ দশ দিন শুরু হওয়ার পর সাঈদ ইবনে জুবাইর (রহ.) এত বেশি ইবাদতে মনোযোগ দিতেন যে, তাকে প্রায় সামলানোই যেত না। আর সাঈদ ইবনে আবি আরুবা (রহ.) এ দশ দিনে হাদিস বর্ণনা বন্ধ করে বলতেন, ‘এগুলো ব্যস্ত থাকার দিন, মানুষের অনেক প্রয়োজন আছে।’ এ দিনগুলো সংখ্যায় অল্প, কিন্তু আদিকাল থেকেই এগুলো দুনিয়ার সেরা দিন। আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের এ সময়গুলো দ্বারা সম্মানিত করেন। ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, ‘জিলহজের প্রথম দশকের বিশেষ মর্যাদার কারণ হচ্ছে, এতে প্রধান প্রধান ইবাদত একত্রিত হয়েছে। যেমন- নামাজ, রোজা, দান ও হজ; যা অন্য কোনো সময়ে একসঙ্গে পাওয়া যায় না।’

জিলহজের প্রথম দশকে করণীয় : ইবনে রজব (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহ এ দশ দিনের মৌসুমকে এমন করেছেন, যারা হজে যায় ও যায় না সবার জন্যই এটি উপকারী। যে ব্যক্তি কোনো বছরে হজ করতে পারে না, সে এ ১০ দিনে ঘরে বসেই এমন আমল করতে পারে, যা হজের চেয়েও উত্তম। এমনকি জিহাদের চেয়েও উত্তম।’ তাই আমরা যেন এ দিনগুলোতে নফল ইবাদত ও সৎকাজে মনোযোগী হই এবং যতটুকু পারি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করি। কেননা, আল্লাহ বলেন, ‘হে মোমিনগণ! তোমরা রুকুণ্ডসেজদা কর, তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর ও সৎকর্ম কর, যাতে সফলকাম হতে পার।’ (সুরা হজ : ৭৭)। প্রতিটি দিন যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়ু কমছে, মৃত্যু কাছে আসছে, শরীর দুর্বল হচ্ছে, স্বাস্থ্য কমছে, বাধা বাড়ছে, সুযোগ কমে যাচ্ছে। খালিদ ইবনে মাদআন (রহ.) বলেন, ‘তোমাদের কারো জন্য যদি কল্যাণের দরজা খুলে দেওয়া হয়, তাহলে সে যেন তাড়াতাড়ি সেটিতে প্রবেশ করে। কারণ, সে জানে না কখন তা বন্ধ হয়ে যাবে।’ সুতরাং আমরা যেন আমাদের জন্য উপকারী কাজে মনোযোগ দিই এবং তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসি। কারণ, তওবা আমাদের সবার ওপর ফরজ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মোমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে ফিরে এসো, যেন সফলকাম হতে পার।’ (সুরা নুর : ৩১)। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘হে মানুষ! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা কর। কারণ, আমি প্রতিদিন তাঁর কাছে ১০০ বার তওবা করি।’ (সুনানে তিরমিজি : ৩২৫৯)।

২৮ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ১৫ মে ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন- আবদুল কাইয়ুম শেখ