মক্কা শরিফের জুমার খুতবা

আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার গুরুত্ব

শায়খ ড. সালেহ বিন আবদুল্লাহ বিন হুমাইদ

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আল্লাহকে ভয় করুন ও মিথ্যা আশা-আকাঙ্ক্ষায় প্রতারিত হওয়া থেকে সতর্ক থাকুন। কারণ, প্রত্যেক জীবই বিদায় নেওয়া ও স্থানান্তরের দ্বারপ্রান্তে। কোথায় সেই ব্যক্তি, যে সম্পদ জমা করেছিল, তা বাড়িয়েছিল, অন্যদের ওপর বড়াই করেছিল ও গর্ব করেছিল? কবর তাকে গ্রাস করেছে, মাটি তাকে ঢেকে দিয়েছে, পোকামাকড় তাকে ক্ষয় করে ফেলেছে। আর তার জন্য অবশিষ্ট আছে কেবল সে যা নিজ হাতে আগে পাঠিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন (যাতে কোনো সন্দেহ নেই) তাদের কী অবস্থা হবে, যেদিন আমি তাদের একত্র করব? আর প্রত্যেককে তার অর্জিত কর্মের প্রতিদান পূর্ণভাবে দেওয়া হবে। তাদের প্রতি কোনো অন্যায় করা হবে না।’ (সুরা আলে ইমরান : ২৫)।

বান্দার সঙ্গী কেবল আমল ও অর্জন : আমরা একটি নতুন হিজরি বছরকে স্বাগত জানাচ্ছি। মহান আল্লাহ একে বরকতময় বছর বানান। এতে অবস্থার সংশোধন করুন। আয়ু, আমল, রিজিক ও সন্তানদের মাঝে বরকত দিন। মহান আল্লাহ আমাদের অতীতের গোনাহগুলো ক্ষমা করুন। তার অনুগ্রহে আমাদের সব দোষত্রুটি ঢেকে দিন। আমাদেরকে তওবা ও তার দিকে ফিরে যাওয়ার তৌফিক দিন। আমাদের জন্য রহমত ও কবুলের দরজাগুলো খুলে দিন। সৌভাগ্যবানরা জীবনকে নেক আমলের জন্য হেফাজত করে। আর দুর্ভাগারা মন্দ কথা ও ভুল কাজের সাক্ষ্য দেয়। তাই জীবনের দিনগুলোকে হেফাজত করা চাই। মৃত্যু সব সুখ-আশা কেড়ে নেয়। তখন কোনো কিছুই কাজে আসবে না। বান্দার সঙ্গে থাকবে কেবল তার আমল ও অর্জন। দুনিয়ার পথ পায়ে হেঁটে পেরুনো যায়। আর পরকালের পথ পেরুনো হয় হৃদয়ের মাধ্যমে। আল্লাহর কাছে প্রিয় হৃদয় হলো, যা তার রবের সামনে বিন¤্র। সে মাথা নিচু করে রাখে। লজ্জা ও সংকোচে মাথা তোলে না। তার হৃদয় সজাগ থাকে। সর্বদা আল্লাহর সঙ্গে কথা বলে। রবের আশ্রয় চায়। একজন অসহায় ও বিন¤্ররে মতো তাঁর কাছেই সাহায্য চায়। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি রাতের বিভিন্ন সময় সেজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে, পরকালকে ভয় করে ও তাঁর প্রতিপালকের অনুগ্রহ আশা করে।’ (সুরা যুমার : ৯)।

বান্দার সাহায্যকারী একমাত্র যিনি : আল্লাহর প্রতি নিজেকে মুখাপেক্ষী মনে করা ইবাদতের মহান স্তর। এর সবচেয়ে বড় ও সত্য রূপ হলো, যখন বান্দা নিজের দুর্বলতা, অভাব, অসহায়ত্ব, প্রয়োজন, অক্ষমতা ও ত্রুটি উপলব্ধি করে, তারপর এগুলো সব ধনী, মহাশক্তিশালী, দানশীল রাজা আল্লাহর কাছে তুলে ধরে। বান্দার আল্লাহর প্রতি যত বেশি নির্ভরতা থাকবে, তার তৌফিক, রিজিক, প্রাচুর্য ও সুখ তত বেশি হবে। এ নির্ভরতার আসল অর্থ হলো, বান্দার জ্ঞান ও দৃঢ় বিশ্বাস- এক মুহূর্তের জন্যও সে তার রব থেকে অমুখাপেক্ষী নয়, বরং এর প্রকৃত অর্থ হলো- সে তার রবের মাধ্যমে অন্য সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী হয়ে যায়। আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা মানে দৃঢ় ইমান ও সত্য বিশ্বাস। তাই বান্দার কোনো উপায়, শক্তি বা ক্ষমতা নেই আল্লাহর অনুমতি, ইচ্ছা, ক্ষমতা, সহজ করে দেওয়া ও সাহায্য ছাড়া। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীল, সে তার দীন-দুনিয়ার প্রতিটি বিষয়ে নিজের অভাব উপলব্ধি করে। রবের কাছে বিনীতভাবে প্রার্থনা করে; যেন তিনি এক মুহূর্তের জন্যও তাকে তার নিজের ওপর ছেড়ে না দেন।

আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার সংক্ষিপ্ত পথ : আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার দরজাই আল্লাহর কাছে পৌঁছার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ। সাহল ইবনে আবদুল্লাহ তাসতরি (রহ.) বলেন, ‘বান্দা ও তার রবের মাঝে সবচেয়ে কাছাকাছি পথ হলো, তার নির্ভরতা।’ বান্দা যত বেশি তার রবের কাছে বিন¤্র হয়, ততই সে তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত হয়। যত বেশি সে তার রবের প্রতি নির্ভরশীল হয়, ততই সে তাঁর কাছে সম্মানিত ও প্রিয় হয়। আল্লাহ তখনই সবচেয়ে বেশি দান করেন, যখন বান্দা তাঁর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অনুভব করে। বান্দা যত বেশি আল্লাহকে জানে, তত বেশি তাঁর প্রতি নির্ভরশীল ও বিন¤্র হয়। ফুজায়েল ইবনে আয়াজ (রহ.) বলেন, ‘মানুষের মধ্যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি জানে যে, সে-ই তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বান্দার আল্লাহভীতি তার জ্ঞানের পরিমাণ অনুযায়ী হয়।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ভয় করে, সে রাতের শুরুতেই যাত্রা করে। আর যে রাতের শুরুতেই যাত্রা করে, সে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। জেনে রেখ, আল্লাহর পণ্য খুবই দামি। তা হলো জান্নাত।’ (তিরমিজি : ২৪৫০)। কোনো কোনো বুজুর্গ বলেছেন, ‘বান্দা তার দীনের জন্য আল্লাহভীতির মতো আর কোনো কিছুর সাহায্য নেয়নি।’

আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার স্তরে পৌঁছানোর মাধ্যম : দোয়া, সাহায্য প্রার্থনা, তাওয়াক্কুল, সর্বদা তাঁর নজরদারির অনুভূতি রাখা, বিনম্রতা, আগ্রহ, তাঁর দিকে ফিরে আসা, ভয়, ভালোবাসা, নিয়মিত জিকির, ইস্তেগফার, প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহকে ভয় করা ও তাঁর আদেশসমূহ সম্মান করার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা ও মুখাপেক্ষিতার স্তরে পৌঁছায়। সুতরাং পূর্ণ বিন¤্রতা ও নির্ভরতায় প্রকৃত ইবাদত। আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার মাধ্যমে প্রকৃত প্রাচুর্য অর্জিত হয়। সাহায্য অব্যাহত আসে। রহমত নাজিল হয়। তাই যে ধনী হতে চায়, সে যেন মহান ধনী আল্লাহর দরজায় লেগে থাকে। অভাব ও বিনয়ের হাত দিয়ে কড়া নাড়ে। মহান দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে বিপুল দান ও বড় বড় অনুগ্রহের সুসংবাদ গ্রহণ করে। ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের দুর্বলতা উপলব্ধি করে, সে আল্লাহর সঙ্গে সঠিক পথে চলতে পারে।’

নির্ভরতার মাধ্যমে সুখ ও সাফল্য মেলে : আল্লাহর ওপর নির্ভরতার মাধ্যমে পূর্ণ সুখ ও বড় সফলতা অর্জিত হয়। বান্দা যত বেশি তার রবের কাছে বিনম্র হয় ও তাঁর প্রতি যত বেশি মুখাপেক্ষী হয়, ততই সে তাঁর কাছে সম্মানিত হয়। যখন আল্লাহর প্রতি প্রকৃত নির্ভরতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন ইবাদত পরিশুদ্ধ হয়ে যায়। তখন তার সব দুশ্চিন্তা আল্লাহর চিন্তায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। যার হৃদয় তার রবের সঙ্গে যুক্ত থাকে, সে ইবাদতের স্বাদ পায়। আর যে সুখ চায়, সে যেন নম্রতা, বিনয় ও অসহায়ত্বের সঙ্গে ইবাদতের দরজায় অবস্থান করে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! তোমরা তো আল্লাহর মুখাপেক্ষী। কিন্তু আল্লাহ অভাবমুক্ত। তিনি চাইলে তোমাদের অপসৃত করতে পারেন ও এক নতুন সৃষ্টি আনয়ন করতে পারেন। এটা আল্লাহর জন্য কঠিন নয়।’ (সুরা ফাতির : ১৫-১৭)।

১ মহররম ১৪৪৮ হিজরি মোতাবেক ১৯ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন- আবদুল কাইয়ুম শেখ