বই আলোচনা

প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার অনন্য প্রয়াস

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ

 

বই: তাহাফুতুল মালাহিদা

খণ্ড: ১২

লেখক: ড. ইয়াসির নাদিম আল ওয়াজেদী

অনুবাদ: মাহদি হাসান ও অন্যান্য

প্রচ্ছদ: ফয়সাল মাহমুদ

প্রকাশক: নাশাত পাবলিকেশন

পৃষ্ঠা: ২,৮০০

দাম: ৩,০৯০ টাকা

 

বর্তমান সময় শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের নয়; এটি একই সঙ্গে চিন্তা, দর্শন এবং বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও এক গভীর রূপান্তরের যুগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার, বিশ্বায়নের প্রভাব এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহের ফলে আজ নানা ধরনের প্রশ্ন, সংশয় ও মতাদর্শ খুব সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। বিশেষত ইসলাম, ধর্ম, নৈতিকতা, ইতিহাস এবং বিশ্বাসের মৌলিক বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত নানা আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে। এ বাস্তবতায় এমন কিছু বইয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়, যা শুধু প্রশ্নের উত্তরই দেবে না; বরং প্রশ্নকে বুঝতে এবং সঠিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করতেও সাহায্য করবে।

ড. মুফতি ইয়াসির নাদিম আল ওয়াজেদির 'তাহাফুতুল মালাহিদা' সিরিজকে এ দৃষ্টিকোণ থেকেই বিবেচনা করা যেতে পারে। একটি বই বা গ্রন্থমালার বৈশিষ্ট্য অনেকাংশে নির্ভর করে লেখকের জ্ঞানচর্চা, অধ্যয়ন এবং গবেষণার বিস্তৃতির ওপর। মুফতি ইয়াসির নাদিম আল ওয়াজেদি ছাত্রজীবনেই গ্লোবালাইজেশনের মতো জটিল বিষয়ে বই রচনা করেছেন। পরবর্তীতে 'তাজদিদে দীন'-এর মতো কাজের মাধ্যমে তার বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের আরও বিকাশ ঘটে। পাশ্চাত্য সভ্যতা, আধুনিকতা, সেক্যুলারিজম, নাস্তিকতা, দর্শন ও জ্ঞানতত্ত্ব—এসব বিষয়ে দীর্ঘ অধ্যয়ন ও গবেষণার ধারাবাহিকতাই পরবর্তীতে 'তাহাফুতুল মালাহিদা' সিরিজে প্রতিফলিত হয়েছে।

এখানে উল্লেখযোগ্য হলো, 'তাহাফুতুল মালাহিদা' প্রথমে একটি অনলাইন কোর্স হিসেবে যাত্রা শুরু করে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালে শুরু হওয়া এ কোর্স দীর্ঘ প্রায় তিন বছর ধরে চলে এবং ২০২৪ সালে সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে সেই বিস্তৃত আলোচনা, প্রশ্নোত্তর, গবেষণা ও চিন্তাভাবনাকে বইয়ের রূপ দেওয়া হয়। ফলে এটি কোনো তাৎক্ষণিক রচনা নয়; বরং দীর্ঘ অধ্যয়ন, পাঠ, সংলাপ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলনের ফসল।

এই সিরিজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এতে ঐতিহ্যবাহী ইসলামি জ্ঞান এবং আধুনিক জ্ঞানচর্চার মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। একদিকে কোরআন, হাদিস, আকিদা, উসুল, ইলমুল কালাম এবং ইসলামি চিন্তার দীর্ঘ ঐতিহ্য; অন্যদিকে আধুনিক দর্শন, জ্ঞানতত্ত্ব, নৈতিক দর্শন, পাশ্চাত্য সভ্যতার বিকাশ এবং নাস্তিক্যবাদী চিন্তার বিভিন্ন ভিত্তি—এ দুই জগৎকে পাশাপাশি এনে আলোচনা করা সহজ কাজ নয়। সাধারণত একজন গবেষক বা আলেম কোনো একটি ক্ষেত্রে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করলেও অন্য ক্ষেত্র তুলনামূলক কম আলোচিত থেকে যায়। কিন্তু 'তাহাফুতুল মালাহিদা'য় এ দুই ধারাকে একত্রে উপস্থাপনের প্রয়াস লক্ষ করা যায়।

এখানে আপত্তির জবাব শুধু ধর্মীয় দলিলের আলোকে দেওয়া হয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের নিজস্ব জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো, দর্শন এবং তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেও আলোচনা করা হয়েছে। কোনো মতবাদকে তার নিজস্ব ভিত্তি ও যুক্তির আলোকে মূল্যায়ন করা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। এ কারণে সিরিজটি পাঠককে কেবল উত্তর দেয় না; বরং প্রশ্ন বিশ্লেষণের পদ্ধতিও শেখায়।

আজকের পৃথিবীতে নাস্তিকতা, সংশয়বাদ কিংবা ধর্মবিরোধী নানা প্রশ্ন আর নির্দিষ্ট কিছু বই বা একাডেমিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রতিদিন এসব প্রশ্ন মানুষের সামনে আসছে। আল্লাহর অস্তিত্ব, নবুওয়ত, কোরআন, হাদিস, ইসলামি আইন, নৈতিকতা কিংবা ইতিহাসের বিভিন্ন বিষয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। সমস্যা হলো, অনেক সময় প্রশ্নগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন এগুলোর কোনো উত্তর নেই অথবা এগুলো ইসলামের জন্য বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করে। ফলে যারা এ বিষয়ে পূর্বে অধ্যয়ন করেননি, তারা বিভ্রান্ত বা অস্বস্তিতে পড়তে পারেন। অথচ প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকা এবং প্রশ্নের কোনো উত্তর না থাকা— এ দুটি বিষয় এক নয়। 'তাহাফুতুল মালাহিদা' এই জায়গায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ, এটি শুধু নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্নের উত্তর দেয় না; বরং প্রশ্নের পেছনের ধারণা, পূর্বধারণা এবং যুক্তিগত ভিত্তি বিশ্লেষণ করতে শেখায়। ফলে পাঠক শুধু তথ্য অর্জন করেন না; বরং চিন্তা করার একটি পদ্ধতিও আয়ত্ত করেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সিরিজটির গুরুত্ব কেবল নাস্তিকতা বা সংশয়বাদের খণ্ডনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একজন সচেতন মুসলিমকে তার সময়ের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়ার প্রয়াস। কারণ, আগামী দিনের প্রশ্ন কী হবে, তা আজ নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। নতুন প্রশ্ন, নতুন ভাষ্য এবং নতুন আপত্তি সামনে আসতেই পারে। তখন শুধু কিছু উত্তর মুখস্থ থাকাই যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন হয় একটি সুসংহত চিন্তাপদ্ধতির। 'তাহাফুতুল মালাহিদা' সেই চিন্তাপদ্ধতির অনুশীলনে সহায়ক হতে পারে। তাই এ সিরিজকে কেবল একটি গ্রন্থমালা হিসেবে নয়, বরং সমকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে একজন মুসলিম পাঠকের চিন্তার জগৎকে আরও প্রস্তুত, সুসংহত ও পরিণত করার গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস হিসেবেও দেখা যেতে পারে।