২০২৫ সালে মানবাধিকারে অগ্রগতি নেই : এমএসএফ
প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
বিদায়ী ২০২৫ সালে বাংলাদেশে মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ‘কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়নি বলে মনে করছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর সময়কালে দেশে বিরাজমান সামগ্রিক রাজনৈতিক, সামাজিক, গণতান্ত্রিক, আইনি পরিবেশ ও মানবাধিকার পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ বলছে তারা।
এ বছরের ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে গতকাল বুধবার ঢাকার রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এমএসএফ।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর স্থানীয় ‘হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার’দের মাধ্যমে যাচাই করে এ প্রতিবেদন তৈরি করার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
এমএসএফ এর প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে রাজনৈতিক সহিংসতার ৫৯৯টি ঘটনায় সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৫ হাজার ৬০৪ জন। তাদের মধ্যে ৮৬ জন নিহত এবং ৫ হাজার ৫১৮ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৯৭ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে ৬৫ জন বিএনপি, ৮ জন আওয়ামী লীগ, ৩ জন জামায়াতে ইসলামী এবং ১০ জন বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা ও বয়সের সাধারণ নাগরিক, যাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া যায়নি।
এসব সহিংসতার মধ্যে নির্বাচনের ঘোষণা হওয়ার পর মনোনয়নপত্র ও প্রচারকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ২৬টি ঘটনায় হতাহত হয়েছেন ২৫২ জন। তাদের মধ্যে তিনজন নিহত এবং ২৪৯ জন আহত হয়েছেন।
রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার ১৬৯টি ঘটনা ঘটেছে এবং এসব ঘটনায় সহিংসতার শিকার হয়েছেন ২৩৪ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী। তাদের মধ্যে ৪৭ জন নিহত এবং ১৮৭ আহত হয়েছেন।
২০২৪ সালে সরকার পতন ও জুলাই-অগাস্ট গণভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে এ বছর ৬৭টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৭ হাজার ৭৮০ জনকে সুনির্দিষ্টভাবে আসামি করা হয়েছে ও ১১ হাজার ১৭৯ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
এসব মামলার মধ্যে ২৯টিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে। সারাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের ৩ হাজার ৬৯৫ জন নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন।
দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে ফেব্রুয়ারিতে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে শুরু হওয়া ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ এর আওতায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ২২ হাজার ২৮৪ জন। তাদের মধ্যে ১১ হাজার ৩১৩ জন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থক।
এছাড়া সারাদেশে পুলিশের বিশেষ অভিযানে মামলা ও ওয়ারেন্টভুক্ত এবং অন্যান্য মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ২ লাখ ১২ হাজার ৮০০ জন।
আগের তুলনায় আদালতে মামলা নিষ্পত্তির গতি বাড়লেও, উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালতে বর্তমানে ৪৫ লাখ ১৬ হাজার ৬০৩টি মামলা বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারী যারা গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসারত ছিলেন, তাদের মধ্যে এ বছরে ৪ জন মারা গেছেন। ২০২৫ সালে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ১৯টি ঘটনা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২২ জন নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ১৩ জন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। থানা হেফাজতে দুইজন নারীসহ ছয়জন আসামি আত্মহত্যা করেছেন।
২০২৫ সালে আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর ভয়ে পালাতে গিয়ে আটজনের মৃত্যুর তথ্য এসেছে প্রতিবেদনে।
এমএসএফ বলছে, “যেখানে নাগরিকদের সুরক্ষার নৈতিক দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর, অথচ দেখা যাচ্ছে পুলিশ দেখামাত্র ভয়ে পালাতে গিয়ে মৃত্যুর মত ঘটনা ঘটছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত।”
২০২৫ সালে কারা হেফাজতে ১১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১১২ জনের মৃত্যু হয়েছে অসুস্থতাজনিত কারণে। ১ জন আত্মহত্যা করেছেন। ১ জন গণপিটুনির পর কারা হেফাজতে মারা গেছেন। ১ জনের ‘রহস্যজনক’ মৃত্যু এবং নির্যাতনে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুজন ভারতীয় নাগরিক কারাগারে অসুস্থতাজনিত কারণে মারা গেছেন। কারা হেফাজতে মৃতদের মধ্যে ৪১ জন কয়েদি, ৭৩ জন হাজতি এবং ১ জন নারী হাজতি আত্মহত্যা করেছেন।
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা: ২০২৫ সালে ২ হাজার ১৪ জন নারী এবং ১ হাজার ৯২৮ জন শিশু ও কিশোরী সহিংসতার শিকার হয়েছে।
এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ৩৩১টি, দলগত ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১১৬ জন নারী, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছেন ২০জন নারী, ধষর্ণচেষ্টার শিকার ১৪০ জন ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ২০৩ জন নারী।
অ্যাসিড নিক্ষেপে আক্রান্ত হয়েছে ৫ জন নারী। এছাড়াও প্রতিবন্ধী নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৬ জন। আত্মহত্যা করেছেন ২৮৩ জন নারী। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩২৬ জন নারী।
অপহরণ করা হয়েছে ২০ জন নারীকে, নিখোঁজ রয়েছেন ২৬ জন নারী। ৫৯জন নারীর অস্বাভাবিক মৃত্যুসহ মোট ৫৩২ জন নারী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। সহিংসতার শিকার হয়েছেন ১৪ জন প্রতিবন্ধী নারী।
শিশু ও কিশোরী সহিংসতার ঘটনার মধ্যে ৪৫২ জন শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ৭৮ জন দলগত ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে ২৫ জন শিশু ও কিশোরীকে।
যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ১২১ জন শিশু কিশোরী এবং ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছেন ১৭৭ জন শিশু কিশোরী। এছাড়াও প্রতিবন্ধী শিশু কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৮ জন।
দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৩৫ জন জীবিত ও ৫১ জন মৃত, মোট ৮৬ জন নবজাতক পাওয়া গেছে।
পিটিয়ে হত্যা ও অজ্ঞাতনামা লাশ:
এ বছরে অন্তত ৪২৮টি গনপিটুণির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ১৬৬ জন নিহত হয়েছেন এবং ৪৬০ জন আহত হয়েছেন। ২২০ জনকে আহত অবস্থায় পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে।
চলতি বছরে ৬৪১টি অজ্ঞতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে যার মধ্যে ২২ জন শিশু, ৬ জন কিশোর ও ৭ জন কিশোরী, ১৫৭ জন নারী ও ৪১৫ জন পুরুষ।
মাজারে হামলা ভাংঙুর-অগ্নিসংযোগ:
২০২৫ সালে মাজার ও মুক্তচিন্তা বিবেক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা লংঘনের ২১টি ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে রয়েছে সিলেটের ৪টি মাজার, কুমিল্লায় ৪টি মাজার, ময়মনসিংহের গৌরীপুরে মাজারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মলমূত্র নিক্ষেপ করা, ঠাকুরগাঁয়ে মাজারে হামলা চালিয়ে ৩টি কবর ভাঙচুর করা। দিনাজপুর ঘোড়াঘাটে ওরশ আয়োজনের প্রস্তুতির সময় একটি মাজারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
রাজবাড়ীর দরবার শরীফ, রাজশাহীর খানকা শরীফ, নেত্রকোণায় পীরের আস্তানা, ময়মনসিংহে খানকা শরীফে অগ্নিকাণ্ড, ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া কুষ্টিয়ায় লালন ফকিরের আখড়ায় হামলার হুমকি, ময়মনসিংহে চার মাস আগে বৃদ্ধ হালিম উদ্দিন ফকিরের জোড়পূর্বক চুল কর্তন, সিলেটে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) এর পথযাত্রায় হামলা হয়।
৫ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার দরবার শরিফে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় একজন নিহত হন। ২৩ অগাস্ট মারা যাওয়া নুরাল পাগলার লাশ মাটি থেকে কয়েক ফুট উপরে দাফন করার অভিযোগে ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটি ’মার্চ ফর গোয়ালন্দ’ কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দেয় এবং কবর থেকে ৫ সেপ্টেম্বর লাশ তুলে পোড়ানো হয়।
মতপ্রকাশের অধিকারের লঙ্ঘন:
এমএসএফ এর প্রতিবেদন বলছে, এ বছর ২৮৯টি ঘটনায় ৬৪১ জন সাংবাদিক দেশের বিভিন্ন জেলায় পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় হত্যা, হামলা, হুমকি, আইনি হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আক্রান্ত সাংবাদিকদের মধ্যে নিহত হয়েছেন একজন। ২৯৫ জন সাংবাদিক তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় আহত ও হামলার শিকার হয়েছেন।
