বোরো নিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মৌসুম শেষে আমন ধানের ব্যাপক দরপতন হয়েছে। ধান বিক্রি হচ্ছে অন্য বছরগুলোর চেয়ে কম দামে। এরই মধ্যেই সপ্তাহখানেক পর থেকে হাওরে পুরোদমে শুরু হচ্ছে বোরো ধান কাটা। এরপর মাসখানেকের মধ্যে অন্য অঞ্চলগুলোতেও পুরোদমে বোরো মৌসুম শুরু হবে। তবে আমনের দরপতনে এখন বোরো নিয়েও বড় দুশ্চিন্তায় কৃষকরা। নায্যমূল্য না পাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন তারা। কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিদেশ থেকে চাল আমদানি অব্যাহত থাকায় দেশে ধানের দামে পতন হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান থেকে এখনো চাল আমদানি হচ্ছে। এসব চাল প্রতি কেজির আমদানি খরচ ৪৪ থেকে ৪৬ টাকা, যে কারণে ব্যবসায়ীরাও আমদানিতে ঝুঁকেছেন। বাজারে বিদেশি চালের সরবরাহও ভালো থাকায় কৃষকের উৎপাদিত ধানের দাম কমে গেছে।
আমদানির অবস্থা : দেশে যে বেসরকারি খাতে চাল আমদানির প্রবণতা বেড়েছে, সে তথ্য উঠে এসেছে খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্যেও। সংস্থাটির হিসাব বলছে, চলতি অর্থবছরের সাড়ে ৯ মাসে দেশে বেসরকারি পর্যায়ে আগের পুরো অর্থবছরের চেয়ে বেশি পরিমাণে চাল আমদানি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এ পর্যন্ত (১২ এপ্রিল পর্যন্ত) দেশে ৭ লাখ ২৪ হাজার টন চাল আমদানি করেছেন ব্যবসায়ীরা। যেখানে গত ২০২৪-২৫ পুরো অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ৬ লাখ ১ হাজার টন। এছাড়াও সরকারি পর্যায়ে চলতি অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ৩ লাখ ৯৯ হাজার টন চাল। সব মিলিয়ে এ অর্থবছরে এরই মধ্যে ১১ লাখ ২৪ হাজার টন চাল আমদানি হয়ে গেছে।
আমনের দামে পতন : এদিকে, অধিক আমদানির প্রভাবে উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধানের দাম কমে গেছে। মৌসুমের শুরুর দিকে মোটামুটি ভালো দাম পেলেও এখন ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না কৃষকরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলের সবোর্চ্চ ধান উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁয় প্রতি মণ স্বর্ণা-৫ জাতের ধান এক হাজার ১০০ টাকা থেকে এক হাজার ১৫০ টাকা, জিরাশাইল এক হাজার ৪০০ টাকা থেকে এক হাজার ৪৫০ টাকা, সম্পা কাটারি এক হাজার ৮০০ টাকা থেকে এক হাজার ৯৫০ টাকা দরে কেনাবেচা হচ্ছে।
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার কোলা গ্রামের কৃষক হেলাল উদ্দিন বলেন, এ দাম গত বছরের চেয়ে মণপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা কম। গত বছর প্রতি মণ স্বর্ণা দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছি। এই বাজারে-ই গতবার জিরাশাইল, সম্পা কাটারি ১ হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকার উপরে কেনাবেচা হয়েছিল। তিনি বলেন, এখন ধান কেনার লোক নেই। বর্তমান দামে লাভ দূরের কথা, আমাদের উৎপাদন খরচ উঠছে না। যে কারণে এখন ক্ষেতে থাকা বোরো নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছি। আমন ধান বিক্রি করে চাষাবাদের খরচ উঠাতে পারছি না।
নওগাঁ জেলার বিভিন্ন মোকামে পাইকারদের (পাইকারি ক্রেতা) সংখ্যা উল্লেযোগ্যভাবে কমেছে। মান্দা উপজেলা সদরের বাজারে বুলু মিয়া নামের একজন কৃষক বলেন, হাটে পাইকার-ই নাই, ধান বেচবো কার কাছে? আগে বিভিন্ন এলাকার ক্রেতা আসতো, দরদাম করে ভালো মিলতো। এখন কেনার লোক নাই। লোকসান দিয়ে বিক্রি করছি। নওগাঁ সদরের সতিহাটে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষক মোজাম্মেল হক বলেন, ?সার-বীজ, কীটনাশক সবকিছুর দাম বেড়েছে। জ্বালানি খরচের কারণে কাটা ও মাড়ায় খরচ বেশি পড়ছে। অথচ ধানের ন্যায্যদামও কেউ দিচ্ছে না। ধান বিক্রি করতে আসা আরেক কৃষক আব্দুল খালেক বলেন, আমনে যে হারে দাম কমতে শুরু করেছে, আর কিছুদিন পর এক হাজার টাকাও দাম থাকবে কি না সন্দেহ। কিছুদিন পর আবার বোরো ধান উঠবে। তখন এসব (আমন) ধান কেনার লোক-ই পাওয়া যাবে না।
অনিয়ন্ত্রিত আমদানি : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারত থেকে এখনো পূর্বে আমদানি করা চালের চালান দেশে আসছে। দেশের বেনাপোল, হিলি ও সোনামসজিদ বন্দর দিয়ে চালের বড় বড় চালান ঢুকছে প্রায় প্রতিদিন। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা এসব চাল এখন কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব চাল শুধু আমন মৌসুমের নয়, আসন্ন বোরো মৌসুমের ধানের দামেও দারুণ নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে।
নওগাঁর সততা রাইস এজেন্সির আড়তদার সুকুমার ব্রহ্ম বলেন, ?নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনিয়ন্ত্রিত চালের আমদানি বন্ধ থাকলেও আগে যারা এলসি করে রেখেছেন, সেই চাল এখনো দেশে আসছে। যে ভুলের কারণে ধান-চাল ব্যবসায়ীরা এখন ক্ষতিগ্রস্ত। এভাবে চাল আমদানি হতে থাকলে বোরো মৌসুমেও কৃষক নায্যদাম পাবে না। নওগাঁ জেলার একজন বড় পাইকারি ব্যবসায়ী ও আমদানিকারক নিরোধ বরন সাহা। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ভারত থেকে যেসব স্বর্ণা চাল আসছে, সেটা ব্যবসায়ীরা ৪২-৪৪ টাকার মধ্যে এনেছে। এখন আমন মৌসুমেও দেশে স্বর্ণা ধান এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই কম দামে ভারতের চাল থাকার কারণে কৃষকের ধানের দাম নেই।
মোকামে পাইকার নেই : ধান-চালের দাম পড়ে যাওয়ার কারণে নওগাঁ ও দিনাজপুর অঞ্চলে পাইকারের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। চালকলগুলোও সেভাবে ধান কিনছে না এখন। নিরোধ বরন সাহা বলেন, বিক্রি না থাকায় মিলগুলোতে প্রচুর চাল রয়ে গেছে। তারাও ধান কিনছেন না। কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মিল থেকে এখন সেভাবে অর্ডারও আসছে না। তিনি বলেন, অন্যান্য বছর এসময়গুলোতে নওগাঁ থেকে প্রায় প্রতিদিন ১০০ থেকে ১২০ গাড়ি (ট্রাক) ধান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেত। এখন সেটা ২০-৩০ এ নেমে এসেছে। বেচাকেনা বন্ধ থাকায় কৃষকরা যেমন লোকসানে, অনেক ব্যবসায়ীও বিনিয়োগ করে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, পর্যাপ্ত ফসল থাকার পরও প্রচুর চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া ভুল ছিল। যার খেসারত দিচ্ছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। তিনি বলেন, আমদানি বেশি হওয়া ও মোকামে বেচাকেনা না হওয়ায় মিলারদের কাছে একটা বড় মজুত গড়ে উঠেছে। এর প্রভাব আসন্ন বোরোতেও পড়বে। খাদ্য অধিদপ্তরের সংগ্রহ বিভাগের পরিচালক মনিরুজ্জামানও প্রচুর চাল আমদানিকে এখন নেতিবাচকভাবে দেখছেন। তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময় চাল আমদানি বেশি হয়েছে- এটা ঠিক।
