ভোটে ‘হারা’ মমতার কথায় মন্তব্য করতে চান না শামা ওবায়েদ

জাতিসংঘে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিজয় ১৭ কোটি মানুষের বিজয়

প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির সন্দেহভাজন খুনিদের গ্রেপ্তার নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সদ্য সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে বক্তব্য দিয়েছেন, সে বিষয়ে কথা বলতে চান না পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। গতকাল বুধবার এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, হাদি হত্যার আসামি যারা ভারতে গ্রেপ্তার আছে, তাদের বিচারে আওতায় আনতে চায় সরকার। আর সেটা করা হবে ভারত সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে।

বিজেপির কাছে ক্ষমতা হারানোর প্রায় এক মাস পর তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা মঙ্গলবার হাদি হত্যার আসামিদের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। গত মঙ্গলবার কলকাতার ধর্মতলার ‘ওয়াই চ্যানেল’ এলাকায় এক প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশের দুই আসামি পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়ার পর এ বিষয়ে তাকে ‘চুপ থাকতে বলেছিলেন’ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

মমতা বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে একটা বড় খুনিকে রাজ্য পুলিশের এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছিল; যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক আন্দোলন হয়েছিল। অন্য দেশের কথা আমি বলছি না, আমার অধিকারও নেই বলার। কিন্তু আমি যেটা বলতে চাইছি তা হল ওই হত্যাকারীরা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসে। বাংলায় আসার পর আমাদের এসটিএফ তাদের ধরে। এইটা তাদের কৃতিত্ব।

‘কিন্তু তারপর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে আমাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, আপনি রাজ্য পুলিশকে জানিয়ে দিন এটা যেন বাইরে না যায়। কারণ এটা দেশের ব্যাপার। কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়ে ছিল? আজকের সরকার পরিবর্তন হলেও আমি সবটাই জানি।

‘আমার হৃদয়টাই একটা কথার ভাণ্ডার, তথ্য ভাণ্ডার। এতদিন আমি বলিনি। কিন্তু আজকে অত্যাচারে শেষ সীমায় গেছে বলে আমাকে মুখ খুলতে হয়েছে। আমি সেই নামটা বলতে চাইছি না, বললে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে। আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি। দেশের স্বার্থে ওই নাম আমি বলব না।’

মমতার ওই বক্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আকাশপাতাল বলেতো লাভ নেই। আরেকটা দেশে নির্বাচন হয়েছে, সে দেশে একজন পরাজিত হয়েছে, সে পরাজিত একজন নেতা একটা কথা বলেছে, দ্যাট ইজ নট আওয়ার ম্যাটার টু ডিসকাস।’ তিনি বলেন, ভারত সরকার যদি এখন বাংলাদেশকে হাদি হত্যার ব্যাপারে কিছু বলেৃ অলরেডি তো এটা নিয়ে কাজ চলছে, কাজ এগিয়েছে। এবং খুবই সিরিয়াসলি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটা নিয়ে কাজ করছে। হাদি হত্যার বিচার আমরা চাই এবং এই যারা ধরা পড়েছে ভারতে, তাদের ফেরত এনে এখানে বিচার বাস্তবায়ন দ্রুত করতে হবে। ‘সে বিষয়ে কিন্তু আমরা সচেষ্ট আছি। এখন আরেকজন, একটা ইলেকশনে হয়েছে আরেকটা দেশে, পাশের দেশে, সেখানে যিনি হেরে গেছেন, তিনি বলছেন উনাদের সরকারকে উদ্দেশ্য করে, সেটা নিয়ে এখানে বাংলাদেশে আমার কমেন্ট করা উচিত হবে বলে আমি মনে করি না।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘হাদি হত্যার ব্যাপারে আমার (কাজ) ডিরেক্টলি গভার্নমেন্টের সঙ্গে কারণ আমার যদি এই কালপ্রিটদের ফেরত আনতে হয়, তাদের কিন্তু আমার ভারত সরকারের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে ফেরত আনতে হবে এবং সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি খুবই সিরিয়াসলি। ‘এবং এটা কিন্তু এগিয়েছে, বেশ ভালো এগিয়েছে। সুতরাং আমরা ওইদিকে আগাতে চাই। এখন বাংলাদেশের সাথে যদি তারা কোনো কথা বলে, তখন সেটা আমরা দেখব।’ বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা পরদিন গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানী ঢাকার বিজয়নগর পানির ট্যাংকের সামনে গুলিবিদ্ধি হন ওসমান হাদি। পরে ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় হাদি মারা যাওয়ার পর বাংলাদেশজুড়ে বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। তখন বাংলাদেশে থাকা ভারতীয় হাইকমিশন ও সহকারী হাই কমিশনের সামনে এবং ভারতে বাংলাদেশের হাই কমিশন ও উপ-হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ এবং সংঘাতের ঘটনা ঘটে।

হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ১৬ দিন পর ২৮ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) দাবি করে, হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিমের সঙ্গে তার সহযোগী মোটরসাইকেল চালক আলমগীর হোসেন ভারতের মেঘালয়ে থাকছেন এবং তাদের দুজন সহায়তাকারীকে (ভারতীয়) গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তবে ভারত সেসময় তাদের গ্রেপ্তারের কথা শিকার করেনি। পরে মামলার দুই প্রধান সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম ও আলমগীরকে গত ৮ মার্চ গ্রেপ্তারের কথা স্বীকার করে ভারতের পুলিশ। এরপর থেকে এখনও তারা দেশটির কারাগারে রয়েছেন।

এটা ১৭ কোটি মানুষের বিজয় -শামা ওবায়েদ : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদের নির্বাচনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের বিজয়কে ‘বাংলাদেশের সব মানুষের বিজয়’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন তার সহকর্মী শামা ওবায়েদ ইসলাম। গতকাল বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে এই প্রতিক্রিয়া জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়েও জাতিসংঘে বিভিন্ন অর্জন হয়েছিল। তিনি ‘বাংলাদেশ প্রথম’ পররাষ্ট্রনীতি সামনে রেখে সবার সঙ্গে সম্পর্কে বিশ্বাসী ছিলেন। এবার সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতিতে ‘আরও একধাপ এগিয়ে গেছেন’।

‘আমাদের বাংলাদেশকে বিশ্বের মানচিত্রে, বিশ্বমণ্ডলে একটি অত্যন্ত গৌরবজ্জ্বল জায়গায় স্থান এনে দেওয়াৃ সে জায়গাটায়; কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের এই বিজয় (বলে) আমি মনে করি।’ গত মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে ভেটাভুটিতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একাশিতম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে হারিয়ে তিনি এই দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সুদৃঢ় নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশের প্রার্থীর যোগ্যতা, সক্ষমতা, সামর্থ্য এবং জাতিসংঘভুক্ত দেশগুলোকে তার গ্রহণযোগ্যতার কারণে এই বিজয় অর্জন হয়েছে।’ মাত্র তিন মাসের প্রচারে এই বিজয় অর্জনের পেছনে যারা ভূমিকা রেখেছেন এবং বিদেশে বাংলাদেশের ৮১টি মিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধন্যবাদ দেন শামা ওবায়েদ।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিল পূর্ণকালীন দায়িত্ব পালন করতে গেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কে সামলাবে- সেই প্রশ্ন রাখা হয় প্রতিমন্ত্রীর সামনে।

শামা ওবায়েদ বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাগ্যে ভালো কিছুই আছে। আপনারা যখন এখানে এসেছেন আজকে, আপনারাও নিশ্চয় বাংলাদেশি হিসেবে, বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে আনন্দিত। ‘আমরা সকলেই আনন্দিত যে বিশ্বের প্রত্যেকটা দেশ আজকে বাংলাদেশের কথা বলছে, বাংলাদেশের নাম নিচ্ছে। তো অবশ্যই আমরা আনন্দিত।’

খলিলুর রহমানের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি আগেই বলেছি যে, অবশ্যই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে যদি ডেডিকেটেডলি উনার এই কাজটি করতে হয়, তাহলে উনাকে সময়টা দিতেই হবে ওখানে। ‘তার মানে এই নয় যে, উনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। সো এটা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত এবং আমি মনে করি উনাদের দুজনের সিদ্ধান্তে এটা হবে।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বছরের ছুটি নেবেন কি-না, এমন প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সেটা উনি সিদ্ধান্ত নেবেন। সেটা নিশ্চয় আপনারা জানবেন কী সিদ্ধান্ত হয়।’

কাউকে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হবে কি-না, এমন এক প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের বিষয়।

‘উনার সুদৃঢ় নেতৃত্বে যখন আমরা এই বিজয়টা অর্জন করতে পেরেছি, তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কীভাবে চলবে, সেটাও উনি সিদ্ধান্ত নেবেন, সমস্যা নেই।’