১১৫ দিন পর দেশে ফেরা বাংলার জয়যাত্রার নাবিক
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব পপ্রতিবেদক
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে কাতারের মেসাইয়িদ বন্দর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরে পৌঁছানোর পর মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনায় ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিকসহ বাংলার জয়যাত্রা পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালির কাছে টানা ১১৫ দিন আটকে থাকার পর বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’র ১৭ জন নাবিক অবশেষে গত মঙ্গলবার দেশে ফিরেছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান বন্দরে নতুন ক্রুর কাছে জাহাজের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার পর তারা এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে বিকেল ৫টা ৪২ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।
বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ স্বজনদের জন্য এই পুনর্মিলন ছিল কয়েক মাসের উৎকণ্ঠার অবসান। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও সমুদ্রে ভাসমান মাইনের আশঙ্কায় দীর্ঘদিন আটকে ছিলেন তারা।
‘বাংলার জয়যাত্রা’দর মাস্টার ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, প্রতিদিনই মৃত্যুভয় নিয়ে কাটাতে হয়েছে তাদের।
তিনি বলেন, ‘শত শত ক্ষেপণাস্ত্র আমাদের জাহাজের ওপর দিয়ে উড়ে গেছে। জেবেল আলি বন্দরে আমাদের কাছাকাছি একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। সেটি যদি আরও ২০০ মিটার কাছে পড়ত, তাহলে আমাদের জাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত।’ চরম ঝুঁকির মধ্যেও তারা জাহাজ ছেড়ে যাননি বলে জানান ক্যাপ্টেন শফিকুল।
তিনি বলেন, ‘আমরা থেকে গেছি এবং দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রক্ষা করেছি।’
নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে কর্তৃপক্ষ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি না দেওয়ায় উপসাগর ছেড়ে যাওয়ার একাধিক চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
অবশেষে যুদ্ধবিরতির পর, সমুদ্রে ভাসমান মাইনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) কর্তৃপক্ষ জাহাজটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলার জয়যাত্রার সেকেন্ড অফিসার প্রণয় কৃষ্ণ সেন বলেন, পুরো যাত্রার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ ছিল হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করা।
তিনি বলেন, ‘একদিকে ড্রোন উড়ছিল, অন্যদিকে ছুটে যাচ্ছিল ক্ষেপণাস্ত্র। ১১৫ দিন ধরে এ বাস্তবতার মধ্যেই কাটাতে হয়েছে আমাদের।’
যাত্রাপথে জাহাজের ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা বিকল হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।প্রণয় বলেন, ‘আমরা সঠিকভাবে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারছিলাম না। একই সঙ্গে ইরানের ভাসমান সামুদ্রিক মাইনের আশঙ্কাও ছিল। কোনো মাইনে আঘাত করলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই জাহাজটি ডুবে যেতে পারত।’
শেষ পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ ম্যানুয়াল নেভিগেশনের মাধ্যমে নিরাপদে অতিক্রম করেন তারা। তিনি বলেন, ‘এটি ছিল আমার কর্মজীবনের সবচেয়ে কঠিন যাত্রাগুলোর একটি।’
বিএসসি-এর জাহাজ-জনবল বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান বলেন, পুরো সংকটকালজুড়ে সংস্থাটি নিয়মিত নাবিকদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছিল।
তিনি বলেন, ‘পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে তাদের জন্য উচ্চগতির ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পাশাপাশি খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা হয় এবং মানসিক চাপের সময় প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিংও দেওয়া হয়।’
তিনি বলেন, সংঘাত কিছুটা কমে আসার পরই বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জাহাজটি দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেটিই দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ এড়াতে সহায়ক হয়েছে।
ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আর একদিন দেরি হলেও নিরাপদে বেরিয়ে আসার সুযোগটি হয়তো হারিয়ে যেত।’ তিনি বলেন, নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে এখনো উপসাগরীয় অঞ্চলে ১ হাজার ৫০০টিরও বেশি জাহাজ আটকে রয়েছে।
