সৌদি নেতৃত্বাধীন নতুন মেরিটাইম জোটে ‘বাংলাদেশ’
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
ইরান সমর্থিক হুতিদের হুমকির মুখে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দাব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের নিরাপত্তায় সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করা হয়েছে, যার প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে বলে খবর দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ৪৩টি দেশের সামরিক প্রতিনিধি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন শেষে ওই জোটের ঘোষণা দেওয়া হয়।
আরব নিউজ, আনাদুলু ও আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স নামে এই জোটের লক্ষ্য হবে বাব আল-মান্দাব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের রুট সুরক্ষিত রাখা এবং সদস্য দেশগুলোর সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষা করা।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জোটটি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক এবং এটি কোনো রাষ্ট্র, জোট বা আন্তর্জাতিক সংস্থাকে লক্ষ্য করে গঠন করা হয়নি। আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কনভেনশন এবং রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে এর কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
যৌথ বিবৃতিতে সৌদি আরবকে জোটের প্রতিষ্ঠাতা ও নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানেই জোটের স্থায়ী সদর দপ্তর, যৌথ অভিযান সমন্বয় কেন্দ্র, যৌথ সামুদ্রিক অভিযান কেন্দ্র এবং সচিবালয় স্থাপন করা হবে। এছাড়া সামুদ্রিক নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য ও তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ অভিযান পরিকল্পনা, মহড়া, প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনার বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে যৌথ বিবৃতিতে।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈঠকে সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্রমবর্ধমান হুমকি, বাণিজ্যিক জাহাজ, তেলবাহী ট্যাংকার ও সামুদ্রিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে জোটের সনদ, সাংগঠনিক কাঠামো, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের রূপরেখা নিয়েও সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা ঐকমত্যে পৌঁছান। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ও কারিগরি প্রস্তুতি শেষ হলে আনুষ্ঠানিকভাবে জোটের কার্যক্রম শুরু হবে।
আনাদুলু লিখেছে, জোট গঠনের পক্ষে যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছে ১৪টি দেশ। এগুলো হলো—সৌদি আরব, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, ইয়েমেন, কোমোরোস এবং সুদান। একই তথ্য দিয়েছে আল জাজিরা ও আরব নিউজ। তবে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার একই ধরনের লক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান এই জোটে যোগ দেয়নি। সৌদি আরব জানিয়েছে, জাতীয় পর্যায়ের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর অন্য দেশগুলোর জন্যও এই জোটে যোগ দেওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত থাকবে।
এই জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়ে সরকারের তরফে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা এখনো দেওয়া হয়নি।
কেন এই জোট : এমন এক সময়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হল, যখন পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলোতে ক্রমশ বাড়ছে।
ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সম্প্রতি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেয় এবং সৌদি সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালায়। এর ফলে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়। তাতে তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এদিকে ইরান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালিতে তেল ও গ্যাস পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বাব আল-মান্দাব হয়ে লোহিত সাগরের রুটের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
আল জাজিরা লিখেছে, বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে পরিচালিত হয়। প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেলও এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
সবচেয়ে সরু অংশে প্রণালিটির প্রস্থ মাত্র ২৯ কিলোমিটার হওয়ায় সেখানে কেবল দুটি নৌ চ্যানেল ধরে চলাচল করা যায়। ফলে ওই অঞ্চলে নৌ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
আল জাজিরা লিখেছে, জোট গঠনের বৈঠকে ৫১টি আমন্ত্রিত দেশের মধ্যে ৪৩টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলও বৈঠকে উপস্থিত ছিল। তবে নতুন সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং লোহিত সাগরে ইইউর বিদ্যমান নৌ নিরাপত্তা মিশনের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।
