শিক্ষকদের প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস

অবসরকালীন সুবিধার অর্থ পেতে আর ঘুরতে হবে না

প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

শিক্ষকরা সমাজের ‘আলোকবর্তিকা’ হিসেবে অভিহিত করে অবসরকালীন সুবিধার অর্থের জন্য তাদের আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

গতকাল শনিবার বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ প্রদান উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা এখনও সমাজের শিক্ষক। বাংলাদেশের আবহমান কালের ধর্মীয় সামাজিক এবং পারিবারিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় এখনও জনমানসে আপনাদের ভূমিকা সর্বজনগ্রাহ্য। ‘আপনারা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের চলমান এই সমাজে আলোকবর্তিকা হিসেবে ভূমিকা রাখবেন এই প্রত্যাশা রাখছি।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘আজ এই অনুষ্ঠানে একটি কথা তুলে ধরতে চাই, যতদিন আপনাদের নির্বাচিত বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে, অবসরকালীন সুবিধার টাকা পেতে আপনাদেরকে আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না। আমাদের চেষ্টা থাকবে যাতে আপনাদের আর কোনো ভোগান্তি পোহাতে না হয়। ‘আর কোনো মধ্যস্বত্তভোগীর যন্ত্রনা সইতে হবে না। আগামী দিনগুলোতে যথাসময়ে অনলাইনে আপনাদের প্রাপ্য টাকা কোনো ভোগান্তি ছাড়াই আপনাদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে ইনশাআল্লাহ।’ রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শিক্ষক-কর্মচারী অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ প্রদান উদ্বোধনের এ অনুষ্ঠান হয়।

শিক্ষক-শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণের এই অর্থ পরিশোধে এককালীন ২০৩৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বরাদ্দ করেছে সরকার।

চার বছর ধরে জমে থাকা শিক্ষকদের বকেয়ার জট কাটাতে দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে শিক্ষকদের স্ব স্ব ব্যাংক হিসাবে এ অর্থ পাঠানো হচ্ছে।

দেশের বেসরকারি স্কুল কলেজ এবং মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা ২০২২ সালের পর সরকারি দুটি তহবিলে তাদের জমানো টাকার একটি অংশ ফেরত পাচ্ছেন।

এ দুটি তহবিলের একটি হচ্ছে, ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট’ এবং অন্যটি ‘অবসর সুবিধা বোর্ড’।

তহবিল দুটিতে জমানো টাকার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে ৭০ হাজারের বেশি শিক্ষক-শিক্ষিকার মধ্যে এ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল তা কিছুটা হলেও কমবে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শিক্ষিকাদের কল্যাণে তার উদ্যোগেই ১৯৯১ সালে ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট’ এবং ২০০২ সালে ‘অবসর সুবিধা বোর্ড’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

‘তিনি এ তহবিলে সরকারি তহবিল থেকে প্রথমে ১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেন এবং পর্যায়ক্রমে ৮৯ কোটি টাকার তহবিল গঠন করে এ তহবিলের সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেন।’

তারেক রহমান বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া বরাবরই শিক্ষা-শিক্ষক-শিক্ষিকাণ্ডশিক্ষার্থী সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করতেন। বিশেষ করে নারীদের একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার ক্ষেত্রে তার উদ্যোগ এবং ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

‘শিক্ষা বিস্তারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়ার চালু করা, ‘শিক্ষা উপবৃত্তি এবং নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ’ শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘মডেল’ হিসেবে অনুসরণ করছে।’

তিনি বলেন, ‘অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠিত দুটি তহবিলে শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ প্রতিমাসে যে টাকা জমা দেন সেই টাকার সঙ্গে সরকারও প্রতিটি একাউন্টের বিপরীতে নির্দিষ্টহারে একটি ‘অ্যামাউন্ট’ জমা করেন। এর উদ্দেশ্য হল, দীর্ঘ চাকরি জীবন শেষে অবসর যাওয়ার সময় প্রত্যেক শিক্ষক-শিক্ষিকা যাতে একটি ভালো ‘অ্যামাউন্ট’ হাতে পান।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘উদ্দেশ্য মহৎ হলেও দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, চাকরি জীবন শেষে অবসরে গিয়ে এই টাকা উত্তোলন করতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরকে নানাধরণের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এমনকি নিজেদের প্রাপ্য টাকা তুলতে গিয়ে মনে হয় ঘুষ দেওয়ার অলিখিত নিয়মও চালু হয়ে গিয়েছিল।

‘আমরা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কোনোরকম ভোগান্তি ছাড়াই অনলাইনে তাদের প্রাপ্য টাকা যার যার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শিক্ষক সমাজ, যারা নীতি নৈতিকতা আর আদর্শের বাণী শিখিয়ে লাখো কোটি শিক্ষার্থীদেরকে বড়ো করে তোলেন, তাদেরকেই যদি ঘুষ দিয়ে টাকা তুলতে হয় কিংবা অফিসে অফিসে ঘুরে ভোগান্তি পোহাতে হয়, আমি মনে করি, সেটি শুধু শিক্ষকদের হয়রানি নয় বরং জাতি হিসেবে আমাদের ‘দীনতাণ্ডহীনতা’ই প্রকাশ পায়।

‘অবসরকালীন সুবিধার টাকা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অ্যাকাউন্টে যত সহজে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার কাজটি কিন্তু অত সহজ ছিল না। কারণ, পতিত পরাজিত বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী সরকার যেভাবে ব্যাংক বীমাসহ প্রতিটি সেক্টর থেকে লুটপাট করেছিল, সেই লুটপাটের কবল থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের স্বার্থরক্ষায় গঠিত, উল্লেখিত দুটি তহবিলও রেহাই পায়নি।’

তারেক রহমান বলেন, ‘জাল ইনডেক্স তৈরি, লুটপাটের সুযোগ তৈরি করতে শিক্ষকদের কল্যাণ তহবিল থেকে অর্থ দুর্বল ব্যাংকে সরিয়ে নেওয়া এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোকে ধ্বংস করার মাধ্যমে এই তহবিল দুটিকে প্রায় দেউলিয়া করে ফেলা হয়েছিল। ফলে যে শিক্ষকগণ সারাজীবন শিক্ষার আলো ছড়াতে নিজেদের জীবনের সোনালী সময় পার করে দিয়েছেন, জীবনের এই প্রান্তে এসে তাদের চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী চক্রের লুটপাটের কারণে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শিক্ষিকাগণ ২০২২ সাল থেকে এই তহবিল হতে কোনো টাকা পাচ্ছিলেন না। বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসার পর অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অবসরকালীন সুবিধার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ‘কিন্তু দেখা যায় এই দুই ফান্ডে পর্যাপ্ত টাকা নেই। ফলে অবসরপ্রাপ্ত ৭০ হাজারের বেশি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দুরবস্থা চিন্তা করে সরকারকে বিশেষ ব্যবস্থায় আজ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।’

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্?দী আমিন ও শিক্ষা সচিব আব্দুল খালেক বক্তব্য রাখেন।