ঢাকা সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

আলহাজ আনোয়ার হোসেন

পুরান ঢাকার এক কিশোর থেকে বাংলাদেশের শিল্পায়নের অগ্রদূত

পুরান ঢাকার এক কিশোর থেকে বাংলাদেশের শিল্পায়নের অগ্রদূত

পুরান ঢাকার আমলীগোলায় তখনকার সকাল নিশ্চয়ই আজকের মতো ছিল না। এত গাড়ির শব্দ ছিল না, আকাশছোঁয়া ভবন ছিল না, শহরের ব্যস্ততাও ছিল অন্য রকম। সরু রাস্তা, পুরোনো দালান, কাছাকাছি থাকা মানুষ আর ব্যবসা-বাণিজ্যের চিরচেনা কোলাহল- এই পরিবেশেই ১৯৩৮ সালের ৩০ অক্টোবর জন্মেছিলেন আনোয়ার হোসেন। কে জানত, জগন্নাথ সাহা রোডের সেই পরিবারের ছোট ছেলেটি একদিন বাংলাদেশের শিল্প, ব্যবসা ও ব্যাংকিং জগতের পরিচিত একটি নাম হয়ে উঠবেন।

তার জীবনের শুরুতে অবশ্য এমন ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। বরং মাত্র ৭ বছর বয়সেই তার জীবনে নেমে আসে বড় ধাক্কা। ১৯৪৫ সালে বাবা রহিম বখশ মারা যান। তখন পরিবারের বড় ছেলে নাজির হোসেনের বয়স মাত্র ১৬, মোহাম্মদ হোসেনের ১৩, আর আনোয়ার হোসেন সাত বছরের শিশু। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান হয়েও হঠাৎ করেই তাদের সামনে এসে দাঁড়ায় অনিশ্চয়তা।

সেই সময় পরিবারটিকে যিনি আগলে রেখেছিলেন, তার নাম জামিলা খাতুন- আনোয়ার হোসেনের মা। পরবর্তী জীবনে আনোয়ার হোসেন বহু প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, বিপুল ব্যবসা পরিচালনা করেছেন, সংসদ সদস্য হয়েছেন। কিন্তু তার জীবনকে কাছ থেকে দেখলে বারবার মনে হয়- তার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তি তৈরি করেছিলেন এই নারী।

মায়ের কাছে শেখা প্রথম পাঠ : জামিলা খাতুন ছিলেন তার সময়ের তুলনায় ব্যতিক্রমী এক নারী। নিজের বাড়িতে এলাকার ছেলে-মেয়েদের বিনা পারিশ্রমিকে পড়াতেন। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা, ফারসি ও উর্দুও শেখাতেন। অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন, দরিদ্র প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়াতেন। সংসার সামলানোর পাশাপাশি স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও তাকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। পরিবারে অর্থ ছিল। কিন্তু তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেদের হাতে সেই সম্পদ তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত জীবন কাটাতে দিলেন না। তার ভয় ছিল, সহজে পাওয়া অর্থ হয়তো ছেলেদের পরিশ্রম থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। তাই তিনি তাদের ধীরে ধীরে ব্যবসা ও কাজের মধ্যে নিয়ে এলেন। বড় দুই ভাই পৈতৃক ব্যবসার দায়িত্ব নিতে শুরু করলেন। ছোট আনোয়ার স্কুলে পড়ার পাশাপাশি খুব কাছ থেকে দেখতে লাগলেন ব্যবসার হিসাব, দোকানের ব্যস্ততা, কর্মচারীদের কাজ আর সংসার চালানোর কঠিন বাস্তবতা।

আরেকটি শিক্ষা ছিল আরও গভীর- মানুষকে সাহায্য করতে হলে তার আত্মসম্মানটিও রক্ষা করতে হবে। দরিদ্র মানুষকে এমনভাবে সাহায্য করতে হবে, যাতে তাকে অন্যের সামনে ছোট হতে না হয়। জীবনের অনেক পরে বিশাল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হয়েও মায়ের প্রতি আনোয়ার হোসেনের নির্ভরতার একটি ছোট দৃশ্য বিশেষভাবে মনে রাখার মতো। চকবাজারের দোকানে যাওয়ার আগে তিনি প্রায় প্রতিদিন মায়ের পা ছুঁয়ে সালাম করে দোয়া নিতেন। দোকান, গুদাম ও শোরুমের চাবিও রাখা হতো মায়ের কাছে। রাতে বাড়ি ফিরে দিনের বেচাকেনার খবর জানাতেন তাকে। নিজের প্রতিষ্ঠা নিয়ে তার মূল্যায়ন ছিল সরল- সাফল্যের আসল শক্তি ছিল মায়ের দোয়া।

ব্যবসার উত্তরাধিকার ছিল, নিজের পথ তৈরি করেছেন নিজেই : আনোয়ার হোসেন এমন একটি পরিবারে জন্মেছিলেন, যে পরিবারের ব্যবসার ইতিহাস পুরান ঢাকার বাণিজ্যের ইতিহাসের সঙ্গেই মিশে আছে। পরিবারের পূর্বপুরুষরা বহু আগে থেকেই চকবাজারকেন্দ্রিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৮৩৪ সালে তার পূর্বপুরুষ লাট মিয়া চকবাজারে একটি দোকানভিটা ইজারা নেন। সে সময় শিং থেকে চিরুনি ও বোতাম তৈরির ব্যবসা ছিল পরিবারের অন্যতম প্রধান কাজ। তার বাবা রহিম বখশ সেই ব্যবসাকে বড় করেন; চল্লিশের দশকে কাপড়ের ব্যবসাতেও প্রবেশ করেন।

তাই আনোয়ার হোসেনের হাতে যখন ব্যবসার সুযোগ আসে, তার সামনে দুটি পথ ছিল। একটি- পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া ব্যবসা ধরে রাখা। অন্যটি- সেই ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের মতো করে নতুন কিছু তৈরি করা। তিনি দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছিলেন।

তরুণ আনোয়ারের ব্যবসায়িক জীবনের একটি ঘটনা তার চরিত্র সম্পর্কে অনেক কিছু বলে। ব্যবসা একটু বড় করার জন্য একসময় তার প্রয়োজন হলো অতিরিক্ত পুঁজির। পরিবারের এক নিকটাত্মীয়ের কাছে পরিকল্পনার কথা খুলে বললেন। পেলেন ২০০ টাকা ঋণ। পুরো টাকাটিই অগ্রিম দিয়ে কাপড় কিনলেন। বেশি পণ্য হাতে থাকায় ক্রেতা বাড়তে লাগল। তার ‘আনোয়ার ক্লথ স্টোর’ দ্রুত বড় হতে শুরু করল। পরে নিজের দোকানটি কিনে নিলেন; একে একে পাশের আরও ছয়টি দোকানও কিনে ব্যবসার পরিধি বাড়ালেন। ২০০ টাকা খুব বড় অঙ্ক নয়। কিন্তু উদ্যোক্তার গল্পে পুঁজির চেয়ে কখনও কখনও গুরুত্বপূর্ণ হয়- সেই পুঁজি দিয়ে মানুষ কী করল। আনোয়ার হোসেনের ক্ষেত্রে ২০০ টাকার ঋণটি যেন সেই মানসিকতার প্রতীক: যা আছে, তা নিয়েই শুরু করতে হবে; সুযোগ তৈরি হলে সেটিকে বড় করতে হবে। কৈশোরের কষ্টকর সময় পেরিয়ে বয়স বিশের ঘরে পৌঁছাতেই তিনি আর্থিকভাবে শক্ত অবস্থান তৈরি করে ফেলেছিলেন। কিন্তু শুধুই সফল কাপড় ব্যবসায়ী হয়ে থাকা তার লক্ষ্য ছিল না। তার সামনে তখন আরও বড় স্বপ্ন- ব্যবসায়ী থেকে শিল্পোদ্যোক্তা হওয়া।

দোকানের গণ্ডি পেরিয়ে কারখানার পথে : পুরান ঢাকার ব্যবসায়িক পরিবারগুলোর অনেকেই তখন মূলত আমদানি, পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যে অভ্যস্ত। আনোয়ার হোসেন ধীরে ধীরে বুঝেছিলেন, বড় হতে হলে শুধু পণ্য বেচাকেনা নয়, উৎপাদনেও যেতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় শিল্পের পথে তার যাত্রা।

একটি প্রতিষ্ঠানের পর আরেকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সেই উদ্যোগগুলোই বৃহত্তর আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজে রূপ নেয়। ব্যবসার পরিধি শুধু বস্ত্র বা বাণিজ্যে আটকে থাকেনি; উৎপাদনশিল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে। স্বাধীনতার পর তিনি বড় ছেলে মনোয়ারের নামে মনোয়ার ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাইভেট লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে স্টেইনলেস স্টিলের কাটলারি ও এনামেলের তৈজসপত্র উৎপাদন শুরু হয়। তার উদ্যোক্তা-জীবন অবশ্য কেবল সাফল্যের সরল ঊর্ধ্বমুখী রেখা ছিল না। ব্যবসার ক্ষতি হয়েছে। বিনিয়োগ হারিয়েছেন। প্রতিষ্ঠান নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। কখনো আবার নতুন করে শুরু করতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি আসে ১৯৭১ সালে।

যুদ্ধ যখন ব্যবসার হিসাবও পাল্টে দিল : স্বাধীনতার আগে আনোয়ার হোসেনের ব্যবসা শুধু পূর্ব পাকিস্তানে সীমাবদ্ধ ছিল না। করাচি, লাহোর ও লায়ালপুরসহ পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় তার দোকান ও অফিস ছিল; করাচিতে বাড়ি ও গাড়িও ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পশ্চিম পাকিস্তানে থাকা সেই ব্যবসা ও সম্পদ তিনি হারান। দেশের ভেতরেও ক্ষতি কম হয়নি। একসময় তার মোট নয়টি গদি ছিল- চকবাজার, ইসলামপুর, সদরঘাট, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, শেখেরচর এবং করাচিসহ বিভিন্ন স্থানে। যুদ্ধ শেষে দেখা গেল বহু ব্যবসায়ী তার কাছে ঋণী, অথচ অনেকের দোকান লুট হয়েছে, পুড়ে গেছে, ব্যবসা শেষ হয়ে গেছে। শুধু চকবাজারেই প্রায় ৪২০ জন ব্যবসায়ীর কাছে তার প্রায় ২০ লাখ টাকা পাওনা ছিল। এমন সময় একজন ব্যবসায়ী চাইলে শুধু পাওনা টাকার হিসাবটিই দেখতে পারেন।

একটি প্রতিষ্ঠানের বদলে একটি শিল্পগোষ্ঠী : পরবর্তী কয়েক দশকে আনোয়ার হোসেনের নাম বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসার বিস্তৃত পরিসরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি গড়ে তোলেন আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। সেই সঙ্গে যুক্ত হন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা খাতেও। তার কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে ছিল নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি এবং সেগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা। নিজের উদ্যোগগুলো বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে কর্মসংস্থানও।

ব্যাংক গড়ার উদ্যোগেও ছিলেন সামনে : শিল্পের পাশাপাশি বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের সূচনালগ্নেও যুক্ত ছিলেন আনোয়ার হোসেন। আশির দশকের শুরুতে দেশে বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হলে উদ্যোক্তাদের যে দলটি এগিয়ে আসে, তিনি ছিলেন তাদের একজন। দ্য সিটি ব্যাংক লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন তিনি; পরে একাধিক মেয়াদে চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালের ২৮ মার্চ ব্যাংকটি কার্যক্রম শুরু করে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি এবং সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তার উদ্যোক্তা ও নেতৃত্বের সম্পৃক্ততা ছিল। নিজের ব্যবসার বাইরেও ছিলেন সক্রিয় : ব্যবসায়ী হিসেবে সফল হওয়ার পরও আনোয়ার হোসেন নিজেকে শুধু নিজের কোম্পানির মধ্যে আটকে রাখেননি। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নির্বাহী পরিষদে বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক ছিলেন। ইসলামপুর বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালকদের একজন হিসেবেও কাজ করেছেন। এ সম্পৃক্ততার তাৎপর্য ছিল অন্য জায়গায়। তিনি এমন একটি সময়ের ব্যবসায়ী, যখন বাংলাদেশের বেসরকারি খাত নিজেই নিজের ভাষা ও পরিচয় তৈরি করছিল।

কারখানা থেকে সংসদে : ব্যবসা ছিল তার প্রধান পরিচয়। কিন্তু একসময় রাজনীতিতেও আসেন। ১৯৮৮ সালে ঢাকা-৮ আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন আনোয়ার হোসেন। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন। এর আগে ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট-বর্তমান রাজউকের পূর্বসূরি প্রতিষ্ঠানের ট্রাস্টির দায়িত্ব পালন করেন।

সম্পদ তৈরি করেছেন, আবার সমাজেও ফিরিয়ে দিয়েছেন : আনোয়ার হোসেনের জীবনের আরেকটি বড় অধ্যায় সমাজকল্যাণ। তার উদ্যোগ ও সম্পৃক্ততায় শিক্ষা, চিকিৎসা, শিশু কল্যাণ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক উন্নয়নের নানা উদ্যোগ গড়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠা করেন আলহাজ আনোয়ার হোসেন ফাউন্ডেশন। সিটি ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত বা পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া উদ্যোগের মধ্যে ছিল দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র, চক্ষু চিকিৎসাকেন্দ্র, প্রাথমিক বিদ্যালয়, কম্পিউটার সেন্টার এবং শিশুদের শিল্পচর্চার কেন্দ্র। এ কাজগুলোকে তার ব্যবসাজীবনের বাইরে আলাদা কোনো ‘দানশীলতার অধ্যায়’ হিসেবে দেখলে সম্ভবত পুরো বিষয়টি ধরা যায় না।

চেয়ারম্যানের অন্য পরিচয় : ব্যবসার কাগজে তার পরিচয়- প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। সংসদের নথিতে- সাবেক সংসদ সদস্য। ব্যবসায়ী সংগঠনে- শিল্পোদ্যোক্তা ও নেতা। কিন্তু পারিবারিক ছবিগুলোয় মানুষটি অন্য রকম। কখনো নাতিকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে নিজেই তার পাশে ঘুমিয়ে পড়েছেন। কখনো পারিবারিক বনভোজনে স্ত্রী আমেনার সঙ্গে লুডু খেলছেন। আবার কখনও সন্তান ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে একেবারে সাধারণ পরিবারের একজন সদস্য। তার দীর্ঘ কর্মজীবনের ছবির অ্যালবামে যেমন সংসদ, কারখানা, আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সফর আছে, তেমনি আছে এই ছোট ছোট মুহূর্তও। সন্তানদের বাড়ি ফিরতে দেরি হলে উদ্বিগ্ন হতেন। ফোন করে খবর নিতেন। পরিবারের সবাই ঘরে ফিরেছে জানলে স্বস্তি পেতেন।

সাফল্যের সঙ্গে ব্যর্থতাকেও লুকাননি : সফল মানুষের জীবনীতে একটি প্রবণতা থাকে—সাফল্য বড় করে দেখা হয়, ভুল ও ব্যর্থতাগুলো হারিয়ে যায়। আনোয়ার হোসেনের দীর্ঘ ব্যবসায়িক যাত্রায় তা সম্ভব ছিল না। কখনও ব্যবসায় লোকসান হয়েছে, কখনও রাজনৈতিক পরিবর্তনে সম্পদ হারাতে হয়েছে, যুদ্ধ তাকে প্রায় নতুন করে শুরু করতে বাধ্য করেছে। আবার কখনো নতুন কোনো উদ্যোগ প্রত্যাশামতো সফল হয়নি। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় সম্ভবত এই যে, কোনো একটি ব্যর্থতাকে তিনি শেষ সিদ্ধান্ত হতে দেননি।

পুরস্কারের তালিকার চেয়ে বড় ছিল পথটি : দীর্ঘ জীবনে অনেক স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক, মওলানা ভাসানী জাতীয় পুরস্কার, সাংবাদিক মওলানা আকরাম খাঁ স্মৃতি সংসদ স্বর্ণপদক, শেরে বাংলা স্মৃতি পুরস্কার এবং সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন স্বর্ণপদকসহ বিভিন্ন সম্মাননা তার কর্মজীবনে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু ৮২ বছরের একটি জীবনকে কয়েকটি পদক দিয়ে মাপা কঠিন।

এখন সেই পথ অন্য প্রজন্মের : ১৭ আগস্ট ২০২১। আলহাজ আনোয়ার হোসেনের দীর্ঘ জীবনের সমাপ্তি ঘটে। তার মৃত্যুর সঙ্গে একটি সময়ের অবসান হয়েছে- কিন্তু তার শুরু করা পথের নয়। কারণ একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত তখনই, যখন তার তৈরি প্রতিষ্ঠান তাকে ছাড়িয়ে বেঁচে থাকে। আর একজন পরিবারের কর্তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার তখনই, যখন তার পরের প্রজন্ম শুধু তার সম্পদ নয়, তার কাজের দর্শনটিও বহন করতে শেখে। আনোয়ার হোসেন নিজে পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পেয়েছিলেন ব্যবসার ভিত। মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলেন পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার শিক্ষা। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তিনি ব্যবসাকে নিয়ে গিয়েছিলেন শিল্পে, শিল্পকে নিয়ে গিয়েছিলেন বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত