যাত্রাবাড়ীর দুই মামলায় হাসিনাসহ ৬৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র
প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় হতাহতের ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলার তদন্ত শেষে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৬৩ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। সেই সঙ্গে অভিযোগের সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় ১০৫ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হত্যা ও অপরটি হত্যাচেষ্টার মামলা। যাত্রাবাড়ী থানার দুই এসআই পৃথকভাবে আদালতে এসব অভিযোগপত্র জমা দেন বলে প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মহিন উদ্দিন জানান। তিনি বলেন, শিগগিরই আদালতে এসব অভিযোগপত্র গ্রহণের বিষয়ে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
নাদিম হত্যাচেষ্টা মামলা : যাত্রাবাড়ী থানার এ হত্যাচেষ্টা মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৩০ জনকে আসামি করে গত ২৭ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইব্রাহিম খলিল। অপরাধে সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় ৬৬ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছেন তিনি। শেখ হাসিনার পাশাপাশি এ মামলার আসামির তালিকায় রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ঢাকার সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার এবং ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাদ্দাম হোসেন।
যাদের অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাহবুব হোসেন ও আনোয়ারুল ইসলাম, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও সচিব আনিসুর রহমান, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের সাবেক সদস্য ও সাবেক সচিব ফয়েজ আহমেদ, সাবেক মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া ও আহমেদ কায়কাউস, সাবেক সিনিয়র সচিব মেজবাউদ্দিন চৌধুরী, সাবেক আইজিপি শহিদুল হক, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার এস এম মেহেদী হাসান এবং দৈনিক স্টার লাইনের নির্বাহী সম্পাদক মাঈন উদ্দিন। মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণের বিষয়ে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর শুনানির দিন ধার্য রয়েছে বলে প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মহিন উদ্দিন জানিয়েছেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই যাত্রাবাড়ী থানার রায়েরবাগ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন তোলারাম কলেজের ছাত্র মেহেদী হাসান প্রান্ত ও নাদিম। ওই সময় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলির ঘটনা ঘটে। একটি গুলি প্রান্তের থুতনি দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়। নাদিমের বাম হাঁটুতে গুলি লাগে এবং গুলি বের হয়ে যায়। প্রান্তকে উদ্ধার করে যাত্রাবাড়ীর সালমান হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক লিমিটেডে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নাদিম চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন। প্রান্তের চাচা পরিচয়ে নাদিম ২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর শেখ হাসিনাসহ ৯৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, প্রান্ত নিহত হওয়ার ঘটনায় তার বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন কদমতলী থানায় শেখ হাসিনাসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে আলাদা হত্যা মামলা করেছেন। পরে যাত্রাবাড়ী থানার মামলায় নাদিমকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগের তদন্ত করা হয় এবং শেখ হাসিনাসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। গত ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ ফারজানা হক অভিযোগপত্র, মামলার নথি ও আনুষঙ্গিক কাগজপত্র পর্যালোচনা করেন। এ মামলায় কামরুল ইসলাম, চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ তিনজন কারাগারে রয়েছেন। অন্য আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। মামলার বাদী নাদিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মামলার বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইব্রাহিম খলিলের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়ে ফোন কেটে দেন।
তদন্ত কর্মকর্তা ইব্রাহিম খলিল বলেন, 'সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি। তবে ৬৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।' এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "প্রান্ত নামে একজনকে হত্যার অভিযোগে মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল। তবে প্রান্তের মৃত্যুর ঘটনায় কদমতলী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ কারণে হত্যার অভিযোগের তদন্ত করা হয়নি। বাদীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে তদন্ত করা হয়।"
প্রান্তের চাচা পরিচয়ে নাদিমের মামলা করার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, "আমার ছেলে মারা গেছে কদমতলী থানা এলাকায়। আর নাদিম নামে একজন মামলা করেছে যাত্রাবাড়ী থানায়। তাকে তো আমি চিনিও না। আমরা থাকতে সে কেন মামলা করবে। ওই মামলার কারণে আমাদের মামলা নিয়ে পুলিশের সঙ্গে কিছুটা ঝামেলাও হয়েছে।"
বাবুল মৃধা হত্যা মামলা : জুলাই আন্দোলনের সময় রাজমিস্ত্রি মো. বাবুল মৃধা হত্যা মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে গত ১৩ আগস্ট অভিযোগপত্র দেন যাত্রাবাড়ী থানার এসআই মাহমুদুল হাসান ইরফান। অপরাধে সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় এ মামলায় ৩৯ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা ছাড়াও এ মামলর আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, যাত্রাবাড়ী-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কাজী মনিরুল ইসলাম মনু, পটুয়াখালী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এস এম শাহজাদা, পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজ, বরিশাল-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথ এবং বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ।
এছাড়া রয়েছেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি কামরুল হাসান রিপন, যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ মুন্না, ভাণ্ডারিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলাম মিরাজ এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সজল কুণ্ড।
যাদের অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আতিকুর রহমান, ৬৩ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য হাবিবুর রহমান, যাত্রাবাড়ী থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অর্থ দাস, রবিন খান ওরফে মেকআপ রবিন, মনির আহমেদ ও লুৎফুর রহমান।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় যাত্রাবাড়ীর দনিয়া ও লাকি কমিউনিটি সেন্টার এলাকায় আন্দোলনে অংশ আবু তালেবকে খুঁজতে বাড়ি থেকে বের হন তার বাবা বাবুল মৃধা।
লাকি কমিউনিটি সেন্টার এলাকায় পৌঁছালে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রায় এক মাস চিকিৎসার পর তাকে বিজিবি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ২২ আগস্ট তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) স্থানান্তর করা হয়।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার ৫২ দিন পর ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিএমএইচে মারা যান বাবুল মৃধা। এ ঘটনায় তার স্ত্রী সীমা বেগম ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা করেন।
এ মামলায় কাজী মনিরুল ইসলাম মনু, চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ তিনজন কারাগারে রয়েছেন। আট আসামি জামিনে রয়েছেন। অন্য আসামিরা পলাতক।
মামলার বাদী সীমা বেগম বলেন, "আমার স্বামী রাজমিস্ত্রির কাজ করত। দুই ছেলেকে নিয়ে ভালোই ছিলাম। স্বামী মারা গেল। আমি এর বিচার চাই।" তিনি বলেন, "বড় ছেলেটা এবার দনিয়া কলেজ থেকে ইন্টার পরীক্ষা দিছে। সে ঢাকায় থাকে। আমরা গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর দশমিনায় চলে আসছি। ঢাকা থাকলে বাসা ভাড়া তো দিতে হয়। স্বামী যখন ছিল টেনশন ছিল না। পুরুষ মানুষ না থাকলে যা হয়। তিনিই সবকিছু দেখতেন। আমার স্বামীটা ভালো ছিল। ভালো ছিল দেখে হয়তো আল্লাহ তাকে নিয়ে গেছেন।"
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সীমা বেগম বলেন, "বড় ছেলেকে নিয়ে আমার স্বামীর অনেক আশা ছিল। ছেলেটা পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি করবে। তিনি দেখে যেতে পারেননি। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।"
এ বিষয়ে জানতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার এসআই মাহমুদুল হাসান ইরফানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।
