নয় বছর পর নতুন রূপে ওসমানী উদ্যান

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

শহুরে জীবনে ক্লান্তি ঘোঁচাতে সবুজে ঘেরা যে জায়গাটিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলত নগরবাসী, ঐতিহাসিক সেই ওসমানী উদ্যানের দরজা নয় বছর বন্ধের পর খুলে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ এ সময়ে সবুজ উদ্যানে ইট-পাথরের মিশেলে সংস্কার ও আধুনিকায়নের কর্মযজ্ঞ চলেছে। গাছপালা কেটে নগরবাসীর জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে জাদুঘর, গ্রন্থাগার, শরীরচর্চাকেন্দ্র, শৌচাগার, ফুড কোর্ট, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, গাড়ি পার্কিং আর শিশুদের খেলার মাঠ। যদিও এত লম্বা সময়ের পরও এসব স্থাপনা এখনও চালু হয়নি। ষোল দিন আগে, গত ২০ অক্টোবর উদ্যানের ফটকগুলো খুলে দেওয়া হলেও ভেতরে ঢুকে নানা বিড়ম্বনায় পড়ার কথা বলছেন নগরবাসী।

সংস্কারের আগে সেখানে প্রবেশে টাকা লাগত না। এখন প্রবেশে ১০ টাকা করে ফি নেওয়া হচ্ছে। উদ্যানের ভেতরে প্রকাশ্যে ধূমপান, নির্জন কোণে বসে মাদক সেবনে মতো অস্বস্তিকার পরিবেশের পাশাপাশি শৌচাগার চালু না থাকার কথা বলেছেন দর্শনার্থীরা। এছাড়া উদ্যানের বাইরে ভবঘুরেদের উৎপাত ও হকারদের হাঁকডাকে উদ্যানের পরিবেশ যে নষ্ট হচ্ছে, সে কথাও বলেছেন তারা। নগর কর্তৃপক্ষ এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছেন। উদ্যানে প্রবেশ করতে ফি নেওয়ার প্রসঙ্গে তারা বলছেন, উন্মুক্ত করে দিলে ভবঘুরে আর মাদকসেবীরা অবাধে প্রবেশ করতে পারেন। তাদের নিয়ন্ত্রণে ফির ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে প্রবেশ ফি নির্ধারণের বিষয়টিকে 'নাগরিক অধিকারের পরিপন্থি' বলছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। 'রক্ষণাবেক্ষণ খরচের ফাঁদে পড়ে' নাগরিকদের কাছ থেকে অযৌক্তিকভাবে প্রবেশমূল্য নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি তাদের।

আর সংস্কারের নামে 'সবুজ ধ্বংস করে' কংক্রিটের স্থাপনা বানিয়ে উদ্যানের 'মৌলিক চরিত্র নষ্ট করা হয়েছে' বলেও অভিযোগ তুলেছেন তারা।

দুই বছরের প্রকল্প ৯ বছর : ওসমানী উদ্যানের অবস্থান গুলিস্তানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) কার্যালয় নগরভবন ও সচিবালয়ের মাঝখানে। ২৩ একরের বেশি জায়গাজুড়ে বিস্তৃত উদ্যানের নামকরণ করা হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর নামানুসারে।

২০১৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে উদ্যানটি সংস্কারের প্রকল্প নেওয়া হয়। পরের বছর জানুয়ারিতে 'গোস্বা নিবারণী পার্ক' নাম দিয়ে সংস্কারের প্রকল্প কাজের উদ্বোধন করেন সেসময়ের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণে ঢাকার ওসমানী উদ্যানে নির্মাণ করা হচ্ছে ১০০ ফুট উচ্চতার স্মৃতিস্তম্ভ

শুরুতে 'দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স' নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজের দায়িত্ব পেলেও নানা অভিযোগের পরে তাদের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়। এরপর ২০২৩ সালে নতুন করে কাজের দায়িত্ব পায় 'পিএফ কর্পোরেশন'। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সেখানে একটি 'জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ' ও দুটি ফটক নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ঠিকাদারি কোম্পানি ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই) কাজটি করে।

নয় বছর পর গত ১৯ অক্টোবর সংস্কার করা উদ্যানটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদ্বোধন করেন। পরদিন থেকে জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রথম পালা এবং দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দ্বিতীয় পালায় উদ্যান খোলা থাকছে।

গত বুধবার উদ্যান ঘুরে দেখা যায়, ১০ টাকার টিকেট নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ হাঁটাহাঁটি করছেন, কেউ বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। ভেতরে সারি সারি লাগানো হয়েছে অর্জুন, কুর্ছি, হিজল, কাঠবাদাম, শিমুল, কাঠগোলাপ, বাতাবি লেবু, আমড়া, গামার, গর্জন, চিকরাশি, কৃষ্ণচূড়া, দেবকাঞ্চন, নাগলিঙ্গম, পাকুড়, সেগুন, বটবৃক্ষ ও মান্দারসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। ওয়াকওয়ে বা হাঁটার পথে বসানো হয়েছে সড়কবাতি ও সিসিটিভি ক্যামেরা। রাখা হয়েছে ডাস্টবিনও।

শৌচাগারসহ কোনো স্থাপনাই চালু হয়নি : উদ্যানের ভেতরে ১২টি ফুড কোর্ট, জাদুঘর, গ্রন্থাগার, ইনডোর গেমস রুম, জিমনেসিয়াম, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, গাড়ি পার্কিং ও শিশুদের খেলার মাঠের জন্য স্থাপনা ও জায়গা তৈরি করা হলেও সেগুলোর কোনোটিরই কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি।

উদ্যানে আনসার সদস্যদের একজন রাহাদ বলেন, "পর্যায়ক্রমে এগুলো খুলবে। কিন্তু এখনো ওয়াশরুমই বানানো হয়নি। আমরা অস্থায়ী একটা ওয়াশরুম ব্যবহার করি, যেটা কাজ চলার সময় ওয়ার্কারদের জন্য করা হয়েছিল।