মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদন
মানব পাচার রোধ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশে
প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

পুলিশসহ সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশে মানব পাচার রোধ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাচার রোধে পাচারকারীদের বিচারের আওতায় নিয়ে শাস্তির সংখ্যা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে নিবন্ধিত পতিতালয়গুলোতে শিশুদের যৌনকর্মী হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে। সরকার এখনও ন্যূনতম মান অনুসরণ করতে না পারলেও পরিস্থিতি আগের চেয়ে কিছুটা উন্নত হয়েছে। বাংলাদেশ নিয়ে এমনটাই বলা হয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত ২০২২ সালের মানব পাচার প্রতিবেদনে। গত মঙ্গলবার রাতে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের মতো এবারও বাংলাদেশ মানব পাচারের মান টায়ার-২ বা ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে। মানবপাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশে কিছু ক্ষেত্রে ন্যূনতম মান অনুসরণ করা হয় না। তবে মানবপাচার নির্মূলে আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা রয়েছে সরকারের। মানবপাচার রোধে সরকারের উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা করোনা মহামারিতে বাধা হওয়ায় টায়ার-২-এ রয়েছে বাংলাদেশ। ২০২১ সালে আগের বছরের তুলনায় মানবপাচারের শিকার বেশ কিছু মানুষকে সরকার চিহ্নিত করেছে। তবে ভুক্তভোগীদের দেখভালের ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সার্বিক প্রচেষ্টা বাড়িয়েছে। ২০১২ সালের মানবপাচার প্রতিরোধ আইনের অধীনে এখন পর্যন্ত ৫৯৪টি মামলার তদন্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩২টি যৌনকর্মী পাচারের, ১৮২টি জোরপূর্বক শ্রম পাচারের এবং ২৮০টি মামলা অনির্দিষ্ট। এর বাইরে ৪৪৯টি মামলা তদন্ত করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তবে কিছু পুলিশ কর্মকর্তা তদন্ত খুবই ধীরগতিতে এবং ত্রুটিপূর্ণ উপায়ে করে থাকেন, যাতে করে পাচারকারীরা শাস্তির সম্মুখীন না হয়। পুলিশের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে পাচারের ব্যবস্থা করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে নিবন্ধিত যৌনপল্লিতে পুলিশ অর্থের বিনিময়ে নির্যাতনের মতো বিষয়গুলো এড়িয়ে যায়। পল্লিতে সবার বয়স নথি অনুযায়ী ১৮ বছরের ওপর। তবে এগুলো জাল নথি। সেখানে ১০ বছরের মেয়েশিশুও পাওয়া গেছে। একটি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০ হাজার মেয়েকে বাংলাদেশে শোষণের শিকার হতে হয়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০ হাজার মেয়েশিশুকে পতিতালয়ে যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করতে হয়।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পাচারকারীরা বাংলাদেশে ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু উভয়কে শোষণ করে। তাদের বাংলাদেশে ও বিদেশে যৌন ও জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করে। পাচারকারীরা রোহিঙ্গা মেয়েদের প্রথমে চট্টগ্রাম, পরে ঢাকা এবং সেখান থেকে ভারত, মালয়েশিয়া ও নেপালে যৌনকর্মী হিসেবে পাচার করে। এদের অনেককে ভালো চাকরি এবং কাউকে বিয়ের কথা বলে পাচার করা হয়। কোনো কোনো পাচারকারী ইন্টারনেটে রোহিঙ্গা মেয়েদের বিক্রি করে থাকে। আন্তর্জাতিক কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশি কিছু কর্মকর্তা এসব পাচারকারীকে সুযোগ করে দেন।
বিদেশে শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশের সঙ্গে ১৫টি দেশের দ্বিপক্ষীয় শ্রমচুক্তি রয়েছে। এই চুক্তিগুলো পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলেও জানানো হয়। যদিও এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, এই চুক্তিগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে। ১০ লাখ শ্রমিক নেওয়ার জন্য ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে পাঁচ বছরের চুক্তি হয়েছে। এখানে মালয়েশিয়ার সরকার ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে এ নিয়োগ সীমাবদ্ধ রেখেছে। যদিও বাংলাদেশ থেকে সবার জন্য উন্মুক্ত ব্যবস্থা রাখার আহ্বান জানানো হয়।
সুপারিশে মানবপাচারকারীদের, বিশেষ করে শ্রমিকদের যারা পাচার করে, তাদের বিচারের আওতায় নিয়ে এসে শাস্তির সংখ্যা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। রিক্রুটমেন্ট ফি শ্রমিকদের থেকে নেওয়া বাতিল করে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পাচারের শিকার মানুষদের চিহ্নিত করার জন্য আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে করে পাচারের শিকার মানুষ শাস্তির শিকার না হয়। মানবপাচার রোধে সরকারের নেওয়া জাতীয় অ্যাকশন পরিকল্পনা ২০১৮-২০২৫ সংশোধন করতে হবে।
