সুসংবাদ প্রতিদিন
পলিনেট হাউসে সবজির চারা উৎপাদনে বিপ্লব
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আব্বাস আলী, নওগাঁ

অসময়ে সবজি চাষে লাভবান ও কীটনাশকমুক্ত সবজি চাষের উদ্যোশে নওগাঁয় সাতজন কৃষককে দেওয়া হয়েছে পলিনেট হাউস। সেখানে কেউ সবজির চারা উৎপাদন করছেন, আবার কেউ সবজি চাষ করে লাভবান হচ্ছে। তবে পলিনেট হাউসে সবজি চারা উৎপাদন হওয়ায় ব্যাপক সাড়া পড়েছে। যে কোন মৌসুমে পলিনেট হাউসে সবজি চারা উৎপাদন হওয়ায় আবহাওয়াজনিত কারণে কোন ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় না। প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে নিরাপদ শাকসবজিসহ কৃষিপণ্য উৎপাদনের আধুনিক পদ্ধতি পলিনেট হাউজ। অসময়ে সবজি চাষের জন্য পলিনেট হাউস দেশে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির এক নতুন মাত্রা সৃষ্টি করবে।
জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বছরব্যাপী নিরাপদ ফসল উৎপাদনে কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প থেকে নওগাঁর পাঁচ উপজেলার সাতজন কৃষককে দেয়া হয় পলিনেট হাউস। সদর উপজেলায় দুইজন, বদলগাছী উপজেলায় একজন, রানীনগর উপজেলায় একজন, মান্দা উপজেলায় দুইজন এবং সাপাহার উপজেলায় একজন। পলিনেট হাউসে- উচ্চমূল্যের ফসল ক্যাপসিকাম, টমেটো, ব্রোকলি, স্কোয়াশ, শসা ও ফুলকপিসহ অন্যান্য ফসল চাষাবাদ করা হচ্ছে। ভারি বৃষ্টিপাত, তাপ, কীটপতঙ্গ, ভাইরাসজনিত রোগ ইত্যাদির মতো প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে নিরাপদ শাক-সবজি ও চারা উৎপাদন হচ্ছে। গত দুই বছর থেকে চাষিরা সেখানে সবজি চাষের পাশাপাশি চারা উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছে কৃষক। সদর উপজেলার মকমলপুর গ্রামের কৃষক লিটন হোসেন। গত দেড় বছর থেকে পলিনেট হাউসে বিভিন্ন সবজির চারা উৎপাদন করছেন তিনি। সেখানে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, মরিচ ও পেঁপে চারা উৎপাদন করছেন। চলতি মৌসুমে ৪৫ হাজার পিস পেঁপে চারা উৎপাদন করেছেন। এরইমধ্যে ১০ হাজার পিস বিক্রি হয়েছে। প্রতিপিস চারা উৎপাদনে খরচ পরেছে ২০ থেকে ২২ টাকা। এতে খরচ পড়েছে প্রায় ৯ লাখ টাকা। প্রতিপিস চারা পাইকারিতে বিক্রি করছেন ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। কৃষক লিটন হোসেন বলেন- পেঁপে চারার চাহিদা সবসময় বেশি থাকে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৯ লাখ টাকার পেঁপে চারা উৎপাদন করা হয়েছে। যেখানে বিক্রির আশা প্রায় ১৫ লাখ টাকার ওপর। এতে খরচ বাদে লাভ থাকবে অন্তত ৬ লাখ টাকা। পেঁপে চারায় নিজের চাহিদা পূরণ হয়। পাশাপাশি চারা উৎপাদন করে বিক্রি করে লাভবান হওয়া যায়।
তিনি বলেন- পলিনেট হাউসে চারা উৎপাদন সুবিধা হয়। যেকোন মৌসুমে চারা উৎপাদন করা যায়। শুরুতে ককপিটে বীজ রোপণ করে চারা তৈরি করা হয়। এরপর চারাগুলো ওয়ান টাইম গ্লাসে স্থাপন করা হয়। প্রায় ১ মাসে চারা উৎপাদন হয়ে যায়। গুণগত মান ভালো হওয়ায় চাষিদের কাছে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। অনেকে ফোন করে আগেই বুকিং দিয়ে রাখেন। আবার অনেকে খামারে এসে নিয়ে যান। জেলার চাহিদা মিটিয়ে পাশের জেলায় এসব চারা সরবরাহ করা হয়। খামারে চারজন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে।
বর্ষাইল গ্রামের কৃষক আসাদুজ্জামন বলেন- লিটন ভাইয়ের কাছ থেকে অনেকে পেঁপে চারা নিয়ে রোপন করে অল্প সময়ে ফলন পেয়েছে। তাদের দেখে আমিও এ খামার থেকে ৩৫ টাকা পিস হিসেবে ১৫টি চারা নিয়েছি। উৎপাদন ভালো হলে আগামীতে বড় পরিসরে বাগান করার ইচ্ছে আছে। কারণ পেঁপে চাষে খরচ কম লাভ বেশি। শিক্ষার্থী রিয়াজ উদ্দিন জানায়- এ খামারে গত ৪ মাস থেকে কাজ করছি। প্রতিদিন ৪০০ টাকা মজুরি পাওয়া যায়। লেখাপড়ার পাশাপাশি খামারে কাজ করে বাড়তি আয় হয়, যা দিয়ে সংসারের কিছু খরচ মেটানো হয়। খামারে চারা নিয়মিত পরিচর্চা, পানি সেচ, বালাই নাশক প্রয়োগ ও ককপিটে চারা রোপন করার কাজ করা হয়। ফতেরপুর গ্রামের কৃষক সুইট হোসেন বলেন- পলিনেট হাউজে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রিত ও ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত হওয়ায় আগাম পাংল ও সবুজ শাক চাষ করে ভাল দাম পেয়ে লাভবান হয়েছি। এরপর মরিচ আবাদ করার জন্য চারা রোপণ করেছি। তার আগে তরমুজ চাষ করে ভালো দাম পেয়েছিলাম।
নওগাঁ সদর বর্ষাইল ইউনিয়ন উপ-সহকারী কৃষি অফিসার মোঃ রতন আলী বলেন- পলিনেট হাউজে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সবজির চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। ঝড়-বৃষ্টি যে কোন অবস্থায় ভিতরের পরিবেশ একই রকম থাকে। পলিনেট হাউসে উচ্চ মূল্যের ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি রোগ-বালাই ও পোকামাকড় বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোছা. হোমায়রা মন্ডল বলেন- কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতায় আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প থেকে জেলায় সাতজন কৃষককে পলিনেট হাউস প্রদান করা হয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে কৃত্রিম উপায়ে তাপ নিয়ন্ত্রণ নিরাপদ শাক-সবজি ও চারা উৎপাদন হচ্ছে। চাষিদের কারিগরি সহায়তাসহ বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। অসময়ে সবজি উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছে চাষিরা। পলিনেট হাউস সম্ভবনাময় বলে জানান তিনি।
