বাংলাদেশের মূল ঝুঁকি অপরাধ ও অবৈধ অর্থনৈতিক তৎপরতা

জানাল ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম

প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনীতিতে সব সময়-ই ঝুঁকি থাকে। সেই ঝুঁকি আগেভাগে চিহ্নিত করা গেলে তার প্রভাব মোকাবিলা করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম মনে করছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ঝুঁকি হবে অপরাধ ও অবৈধ অর্থনৈতিক তৎপরতা। প্রতিটি দেশের জন্য পাঁচটি প্রধান ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে প্রতিবেদনে। দেখা যাচ্ছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান ঝুঁকি হবে ভূ-অর্থনৈতিক সংঘাত, যেমন নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই। তৃতীয় প্রধান ঝুঁকি হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। বলা বাহুল্য, দেশে প্রায় চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। ২০২৫ সালে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চতুর্থ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অর্থনৈতিক ধীরগতিকে। তারা বলেছে, মন্দা বা স্থবিরতার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। পঞ্চম ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ঋণ- সরকারি, করপোরেট ও পারিবারিক। বাস্তবতা হলো গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা বেড়েছে। জাতীয় বাজেটের প্রধান খাত এখন ঋণের সুদ পরিশোধ। এই চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তাই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়তে পারে, এমন ঝুঁকি আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) প্রকাশিত গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট-২০২৬-এ স্বল্প মেয়াদে বিভিন্ন ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা ঝুঁকি চিহ্নিত করার পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক ঝুঁকিও চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রতিটি দেশের ঝুঁকি চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গের সাক্ষাৎকার নিয়েছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়ার্ল্ড ইকোনমি ফোরামের অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর ওপর জরিপ পরিচালনা করেছে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তাসহ দেশের ১০২টি কোম্পানির নির্বাহীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে জরিপ করা হয়েছে। সারা বিশ্বে একই প্রশ্নমালায় এই জরিপ করে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। সেখান থেকে তারা এই ঝুঁকির তালিকা করেছে।

২০২৫ সালের মে-জুলাই মাসে এই জরিপ করা হয়েছে। ৩৪টি বিষয়ের মধ্যে আগামী ২ বছরের জন্য ঝুঁকির জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে বলা হয়েছিল কোম্পানির নির্বাহীদের। গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশের কোম্পানিগুলো যে তখন অবৈধ অর্থনৈতিক তৎপরতাকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। ওই সময় দেশে চাঁদাবাজি, লুটপাট, ছিনতাই—এসব অনেক বেড়ে গিয়েছিল। তবে তখনকতার তুলনায় পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করেন গোলাম মোয়াজ্জম। তিনি বলেন, তখনকার তুলনায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কমেছে, কিন্তু ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে গেছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে এআইয়ের অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ছে।

নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। ফলে অর্থনৈতিক ধীরগতি যে শঙ্কা ছিল, তা কিছুটা কমেছে বলে মনে করেন গোলাম মোয়াজ্জেম। বিশ্ব ব্যাংক বলেছে, চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) হবে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান সম্পর্কে বলা হয়েছে, মানুষ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বিযুক্ত বোধ করায় অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল। উন্নত জীবনের আশা তাদের হারিয়ে যাচ্ছিল। সেই ক্ষোভ ও বঞ্চনা থেকেই দেশে এই অভ্যুত্থান। শ্রীলঙ্কা ও নেপালের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।

বৈশ্বিক ঝুঁকি : বৈশ্বিক পরিসরে এবার অনেক বড় ঝুঁকির কথা বলেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। তারা মনে করছে, নতুন প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক ব্যবস্থায় প্রবেশের প্রেক্ষাপটে ভূ-অর্থনৈতিক সংঘাত ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক ঝুঁকি। এরপরের চারটি ঝুঁকি হলো রাষ্ট্রীয় সংঘাত, চরম আবহাওয়া, সামাজিক মেরুকরণ আর ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা বিশ্বেই অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। ফলে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। স্বল্প মেয়াদে অর্থনৈতিক ঝুঁকি অনেক বেশি। এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি- উভয়ই বেড়েছে। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে উদ্বেগ তীব্র হচ্ছে। স্বল্প মেয়াদে পরিবেশগত ঝুঁকি কিছুটা কমেছে। গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, মূলত কোনো দেশের অর্থনীতির কাঠামো বোঝার জন্য এ ধরনের জরিপ করা হয়। কাঠামো সাধারণত রাতারাতি পরিবর্তিত হয় না। তবে বৈশ্বিক ও দেশি পরিস্থিতি অনেকটা টালমাটাল। অনেক কিছু বদলে যাচ্ছে। উদীয়মান দেশগুলোর ক্ষেত্রে একসময় মূল্য চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত।