র্যাব কর্মকর্তা হত্যার প্রধান আসামির হুমকি
জঙ্গল সলিমপুরে ঝামেলা করলে জনবিস্ফোরণ ঘটবে
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
‘জঙ্গল সলিমপুরে যদি অহেতুক কোনো ঝামেলা সৃষ্টি হয় বা অপরাধের ফাঁদে ফেলে কেউ গোলযোগ সৃষ্টি করে, তাহলে বড় ধরনের পাবলিক বিস্ফোরণ ঘটবে।’ গত বুধবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে নিহত র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া হত্যা মামলার প্রধান আসামি ইয়াসিন এক ভিডিও বার্তায় এ কথা বলেন। তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যে ইয়াসিনকে আরও বলতে শোনা যায়, র্যাব এখানে কী জন্য এসেছে- গাড়ি ছাড়া, পোশাক ছাড়া এভাবে কেন ঢুকেছে। তারা কোন আসামি ধরতে এসেছে- সে বিষয়ে কারো নাম শোনা যায়নি। কোনো আসামির নাম প্রকাশ করা হয়নি।
তিনি বলেন, এখানে যত সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সবই রুকন মেম্বারের লোকজনের মাধ্যমে। ডিসি পার্ক থেকে শুরু করে সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় তার লোকেরা চাঁদাবাজি করছে। সে চাঁদাবাজির উদ্দেশে আমাদের এই এলাকা দখল করতে চায়। তার কাছে সব অস্ত্রের ভান্ডার রয়েছে। আমি কথা দিচ্ছি, এই রুকন মেম্বারকে গ্রেপ্তার করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। সে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে টাকা তুলে এখানে র্যাবকে এনেছে।
ইয়াসিন বলেন- আজ আবারও জোরালোভাবে বলছি, এলাকায় যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, তাহলে বড় ধরনের জনবিস্ফোরণ ঘটবে। এই জনবিস্ফোরণের দায় প্রশাসনকেই নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, যদি তারা বলে তাদের কোনো আসামি আছে এবং তাকে ধরতে যাবে, তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে আসামির নাম ও ঠিকানা বলতে হবে। ঢালাওভাবে অভিযান চালিয়ে ডিসি মমিনের মতো আচরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ইয়াসিন বলেন- প্রশাসন চাইলে আমাকে বাড়ি থেকে সাময়িকভাবে উচ্ছেদ করতে পারে কিন্তু আমার ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি থেকে স্থায়ীভাবে উচ্ছেদের কোনো সুযোগ নেই। বল প্রয়োগ বা নির্যাতনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। গত সোমবার জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের হামলায় চট্টগ্রাম র্যাবের উপ-সহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন নিহত হন। একই ঘটনায় র্যাবের আরও তিন সদস্য এবং মনা নামে একজন সোর্স গুরুতর আহত হন। নিহত মোতালেব বিজিবির নায়েব সুবেদার ছিলেন এবং প্রেষণে র্যাবে কর্মরত ছিলেন। এ ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার সীতাকুণ্ড থানায় ইয়াসিনকে প্রধান আসামি করে মোট ২৯ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়। এতে অজ্ঞাত পরিচয়ের আসামি করা হয়েছে ১৫০ থেকে ২০০ জনকে। ঘটনার পর থেকে এ পর্যন্ত ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ, র্যাব ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার বিকালে ইয়াসিনের নেতৃত্বে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় একটি রাজনৈতিক কার্যালয় উদ্বোধনের কথা ছিল। এ কারণে সেখানে বিপুলসংখ্যক লোকজন জড়ো হন। অন্যদিকে রুকন গ্রুপের অনুসারী ও র্যাবের সোর্স মনা র্যাবকে জানান, ওই অনুষ্ঠানে ইয়াসিন উপস্থিত থাকবেন। এ তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম র্যাবের পতেঙ্গা কোম্পানি থেকে একটি টিম সেখানে অভিযান পরিচালনার জন্য যায়।
বিকাল পৌনে ৪টার দিকে অভিযানে যাওয়া র্যাব সদস্যদের ওপর ইয়াসিন গ্রুপের অনুসারীরা হামলা চালায়। একপর্যায়ে র্যাবের চার সদস্য ও সোর্স মনাকে আটকে ফেলা হয়। এ সময় র্যাবের অন্য সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে সরে যান। আটকে রাখা সদস্যদের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে তাদের ব্যাপক মারধর করা হয়।
খবর পেয়ে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ উদ্ধার অভিযান শুরু করে এবং স্থানীয় একটি পক্ষের সহায়তা নেয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় পাঁচজনকে উদ্ধার করে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক র্যাবের উপসহকারী পরিচালক মোতালেবকে মৃত ঘোষণা করেন।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড় দখল, অবৈধ বসতি ও প্লট বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সশস্ত্র সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য। হাজার কোটি টাকার সরকারি খাস জমির নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে এখানে বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও খুনোখুনি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার পতনের পর থেকে এই সহিংসতার মূল কেন্দ্রে রয়েছে ইয়াসিন ও রুকন গ্রুপের দীর্ঘদিনের আধিপত্যের লড়াই। রুকন উদ্দিন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। নানা অভিযোগে এরইমধ্যে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
