অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে অচল চট্টগ্রাম বন্দর

* তিন টার্মিনালে সুনসান নীরবতা, বন্ধ জাহাজ চলাচল * অচলাবস্থা নিরসনের উদ্যোগ নেই * বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির বৈধতার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি সোমবার

প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  চট্টগ্রাম ব্যুরো

শ্রমিক ও কর্মচারীদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর। নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সরকারি উদ্যোগের প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার সকাল থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত কর্মবিরতি চলেছে। এসময়ে জেটিতে পণ্য ওঠানামা, ইয়ার্ড থেকে কার্গো ডেলিভারি, বন্দর দিয়ে জাহাজের আগমন ও বহির্গমনসহ সব ধরনের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

আন্দোলনের পঞ্চম দিনে গতকাল সকাল থেকে বন্দরের জেটি ও ইয়ার্ড জনশূন্য দেখা গেছে। মানুষ ও যানবাহনের কোনো চলাচল ছিল না, সব শেড ও অফিসও ছিল বন্ধ। এছাড়াও সকালে জোয়ারের সময় বন্দরের ছয়টি জাহাজ ছাড়ার কথা ছিল এবং বহির্নোঙর থেকে আটটি জাহাজ জেটিতে ভেড়ার সূচি ছিল। তবে বাস্তবে কোনো জাহাজই চলাচল করতে পারেনি। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবির বলেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ উপেক্ষা করেই সরকার এখনও চুক্তি সইয়ের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ নেই। সরকার চুক্তি সইয়ের প্রক্রিয়া বাতিল না করা পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে বলে জানান তিনি।

বিভিন্ন শিপিং এজেন্ট ও ফিডার অপারেটরদের কর্মকর্তারা জানান, মঙ্গলবার সকালে কর্তৃপক্ষ পাইলটেজ কার্যক্রম শুরু করার চেষ্টা করলেও আন্দোলনকারীদের বাধার মুখে তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়। তারা আরও জানান, বুধবার সকাল থেকে আন্দোলনকারীরা নির্ধারিত জেটিতে অবস্থান নিয়ে টাগবোট, পাইলট বোট ও মুরিং বোটসহ প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস নৌযানের নোঙর ঠেকিয়ে দেন। ফলে পাইলটেজ কার্যক্রম একেবারেই শুরু করা যায়নি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, গতকাল সকাল ১০টা থেকে জোয়ার শুরু হলেও জাহাজ পরিচালনার জন্য নিযুক্ত সব পাইলট কন্ট্রোল রুমে প্রস্তুত ছিলেন। তবে আন্দোলনের কারণে তারা কাজ শুরু করতে পারেননি। বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব মো. রুহুল আমিন শিকদার জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকে বন্দর ও দেশের ১৯টি বেসরকারি ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোর (আইসিডি) মধ্যে আমদানি, রপ্তানি কিংবা খালি কন্টেইনার পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বন্দর ইয়ার্ডের ডেলিভারি পয়েন্টগুলোও ছিল ফাঁকা। কোনো শ্রমিক বা কর্মচারী কাজে যোগ দেননি। আমদানি পণ্য ছাড় ও রপ্তানি চালান বন্ধ থাকায় বন্দর ইয়ার্ড এবং আইসিডিগুলোতে কন্টেইনারের জট ক্রমেই বাড়ছে। বার্থ অপারেটরস, শিপ-হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, এভাবে পুরো বন্দর অচল হয়ে পড়া নজিরবিহীন। তিনি বলেন, বন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়া দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতির। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত এই সংকটের সমাধান প্রয়োজন।

তিন টার্মিনালে সুনসান নীরবতা, বন্ধ জাহাজ চলাচল : চট্টগ্রাম বন্দরের ৪ নম্বর ফটক। স্বাভাবিক সময়ে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার জাহাজে তোলার জন্য নেওয়া হয় এই ফটক দিয়ে। আবার আমদানি পণ্য বা কনটেইনারও এই ফটক দিয়ে বের করা হয়। এ কারণে সব সময় ফটকের সামনে দেখা যায় পণ্যবাহী যানবাহনের দীর্ঘ সারি। তবে বুধবার ফটকের আশপাশে পণ্য পরিবহনের কোনো গাড়ি দেখা যায়নি। ফটকের দুই পাশই বন্ধ। একই অবস্থা বন্দরের অন্য সব ফটকেও। ফটক পেরিয়ে বন্দরের ভেতরে প্রায় চার কিলোমিটার লম্বা তিনটি টার্মিনাল রয়েছে। পাশের উড়ালসড়কের ওপর থেকে দেখা যায়, তিন টার্মিনালেই সুনসান নীরবতা। কোনো কনটেইনার ওঠানো-নামানো হচ্ছে না। টার্মিনালের জেটিতে থাকা ১১টি জাহাজ ক্রেন গুটিয়ে বসে থাকে। গ্যান্ট্রি ক্রেনের বুম (যে অংশ দিয়ে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়) সেগুলোও গুটিয়ে রাখা হয়।

২০০৭ সাল থেকে গত ১৯ বছরে শ্রমিক-কর্মচারীদের এমন কর্মসূচি দেখা যায়নি। বন্দরের তিনটি টার্মিনাল- জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দিয়ে সিংহভাগ কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়। গত অর্থবছরের হিসাবে, বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি হওয়া মোট কনটেইনারের ৯৭ শতাংশ এই তিন টার্মিনালে ওঠানো-নামানো হয়। বাকি তিন শতাংশ ওঠানো-নামানো হয় সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে পরিচালিত আরএসজিটি চিটাগং টার্মিনালে। ২০২৪ সালে সৌদি কোম্পানি টার্মিনালটি পরিচালনার দায়িত্ব পায়। তবে চলমান আন্দোলনের আঁচ লাগেনি আরএসজিটি চিটাগং টার্মিনালে।

আন্দোলনকারীরা যা বলছেন : চলমান আন্দোলন নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, এনসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে সরকার যাতে সরে আসে, সে জন্য এই আন্দোলন কর্মসূচি। শ্রমিক-কর্মচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন চালিয়ে গেলেও বিষয়টি সমাধানে সরকার থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

অচলাবস্থা নিরসনের উদ্যোগ নেই : নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় জিটুজি ভিত্তিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হলে শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলনে নামেন। শুরুর দিকে মিছিল-সমাবেশেই সীমাবদ্ধ ছিল আন্দোলন কর্মসূচি। বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ছাড়াও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটিসহ বিভিন্ন পেশাজীবী ও রাজনৈতিক সংগঠন কর্মসূচি পালন করেন।

তবে এনসিটি চুক্তির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত ধাপে যাওয়ার পরই কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। আন্দোলনকে বৃহত্তর রূপ দিতে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। মূলত এই ব্যানারে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলন করছেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় নিউমুরিং টার্মিনাল নির্মিত হয় ২০০৭ সালে। টার্মিনালটি নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি সংযোজনে বন্দর কর্তৃপক্ষ ধাপে ধাপে মোট ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কনটেইনারের সিংহভাগ এই টার্মিনাল দিয়ে পরিবহন হয়। বর্তমানে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড। বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার আগপর্যন্ত চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেডের এই টার্মিনাল পরিচালনা করার কথা রয়েছে।

টার্মিনালটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ১৫ বছর মেয়াদে ছেড়ে দেওয়া হবে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ছেড়ে দেওয়া হলে টার্মিনালের সব মাশুল কোম্পানিটিই আদায় করবে। তখন প্রতি কনটেইনারে ডিপি ওয়ার্ল্ড বন্দরকে কত ডলার পরিশোধ করবে, তা নিয়েই এখন দর-কষাকষি চলছে। ঢাকায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে এই দর-কষাকষি চলছে। গত সপ্তাহ থেকে এই দর-কষাকষি শুরু হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি।

একদিকে ইজারাপ্রক্রিয়া চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে, অন্যদিকে প্রতিবাদে চলছে শ্রমিক-কর্মচারীদের লাগাতার কর্মবিরতি। এরই মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হলেও বিষয়টি নিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নেই সরকারের। আন্দোলনকারীদের সঙ্গেও আলোচনার উদ্যোগ নেই। উল্টো একের পর এক আদেশে কর্মচারীদের বদলির কারণে আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছে।

বিদেশি কোম্পানির সাথে চুক্তির বৈধতার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি সোমবার : চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তির বিষয়ে করা রুল খারিজ করেছেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে শুনানির জন্য আগামী সোমবার দিন ঠিক করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত।

গত মঙ্গলবার এ আদেশ দেন চেম্বার জজ আদালত। আদালতে আপিল আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম ও সৈয়দ মামুন মাহবুব। তাদের সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার মো. আনোয়ার হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনিক আর হক। এছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. হেলাল উদ্দিন চৌধুরী।

এর আগে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তির বিষয়ে করা রুল খারিজ করে আদেশ দেন হাইকোর্ট। গত ২৯ জানুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। রিটের বিষয়ে হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চের বিভক্ত রায়ের পর সেদিন রুল খারিজ করে রায় দেন হাইকোর্টের একক বেঞ্চ। এর মধ্য দিয়ে হাইকোর্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে রিট খারিজের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।

আদালতে ওইদিন রিট আবেদনকারীর পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম ও সৈয়দ মামুন মাহবুব শুনানি করেন। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. আনোয়ার হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যার্টনি জেনারেল অনীক আর হক। এছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে আইনজীবী মো. হেলাল উদ্দিন চৌধুরী শুনানি করেন। বার্থ অপারেটর এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন সেলিমের পক্ষে আইনজীবী নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম শুনানিতে অংশ নেন।

রায়ের বিষয়ে রিট আবেদনকারীর অন্যতম আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, হাইকোর্টের একক বেঞ্চ রুল ডিসচার্জ (খারিজ) করে রায় দিয়েছেন। রিট খারিজের সংখ্যাগরিষ্ঠের রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়েছে। আদালত বলেছেন লিভ টু আপিল করার জন্য।

রায়ের বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের আইনজীবী হেলাল উদ্দিন চৌধুরী জানান, এ ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের পিপিপি অ্যাক্ট, ২০১৭ সালের জিটুজি পলিসি ও ২০১৮ সালের প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন, অর্থাৎ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে বলে রায়ে এসেছে। এখানে আইনবহির্ভূত কিছু নেই। আর ডিপি ওয়ার্ল্ড সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারেরই কোম্পানি।