দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহার ইতিবাচক হলেও যথেষ্ট নয়

প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ বা ৭৭ শতাংশ ভোটার মনে করেন, রাস্তা, কালভার্ট নির্মাণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। অর্থাৎ উন্নয়ন সম্পর্কে ভোটারদের ধারণা এখনো অবকাঠামো নির্মাণকেন্দ্রিক। জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিষয়টি তাঁদের প্রভাবিত করছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সাম্প্রতিক এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে ‘নির্বাচনী এলাকায় সবুজ টেকসই অর্থনীতির চালচিত্র ও প্রত্যাশা: প্রার্থী ও ভোটার জরিপের ফলাফল’ শীর্ষক এ জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।

মিডিয়া ব্রিফিংয়ে জরিপের তথ্য উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। উপস্থিত ছিলেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত, অনুষ্ঠান সহযোগী সামি মোহাম্মদ, মালিহা সাবাহ ও নূর ইয়ানা জান্নাত।

সিপিডির জরিপে দেখা গেছে, উন্নয়ন বলতে অধিকাংশ ভোটার এখনো সড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট ও অন্যান্য দৃশ্যমান অবকাঠামো প্রকল্পকেই প্রধান সূচক হিসেবে দেখছেন। পাশাপাশি এসব প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান যুক্ত থাকায় তাঁদের বিবেচনা হলো, এসব উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

গবেষণায় দেখা গেছে, শহরাঞ্চলের প্রায় ৮৬ শতাংশ ভোটার উন্নয়নের সঙ্গে ব্রিজ ও সড়ক নির্মাণের বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করে দেখেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম (সিএইচটি), উপকূলীয় অঞ্চল, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে এ ধারণা প্রবল।

ভোটারদের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের মধ্যেও উন্নয়ন নিয়ে প্রায় একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দেখা গেছে। কিছু ক্ষেত্রে দলীয় প্রতিনিধিদের মধ্যে উন্নয়ন ধারণা তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত হলেও ভোটারদের ধারণা এখনো মূলত অবকাঠামোকেন্দ্রিক রয়ে গেছে।

সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত বলেন, বাংলাদেশে সবুজ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব-৯৫ শতাংশ ভোটার এমন আশাবাদী ধারণা পোষণ করেন।

হেলেন মাশিয়াত বলেন, উন্নয়ন ধারণার এই একমুখী প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু অভিযোজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে আড়ালে ফেলে দিতে পারে। তাঁদের মতে, উন্নয়ন আলোচনায় কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জীবনমানের বিষয়গুলোকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জরিপে ১৫০টি নির্বাচনী এলাকার ৪৫০ জন নির্বাচন প্রার্থী, তাঁদের মনোনীত প্রতিনিধি ও বিভিন্ন জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ১ হাজার ২০০ ভোটারের মতামত নেওয়া হয়েছে। জরিপে পরিবেশ, সবুজ অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়ন—এই তিন স্তম্ভে ভোটার ও প্রার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি, প্রত্যাশা ও বাস্তব পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

পরিবেশ রক্ষায় সহজ সমাধানের প্রতি ঝোঁক:

জরিপে উঠে এসেছে, পরিবেশ রক্ষার উপায় হিসেবে প্রায় ৬১ শতাংশ ভোটার গাছ লাগানো ও প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন। রাজনৈতিক প্রার্থীরাও প্রায় একই ধরনের সমাধানের কথা বলেছেন। গবেষকদের মতে, ভোটারদের মধ্যে একধরনের আচরণগত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সেটা হলো, তাঁরা যেটা ব্যক্তিগতভাবে সহজে করতে পারেন, সেটাকেই পরিবেশ রক্ষার মূল সমাধান হিসেবে দেখছেন।

জরিপে দেখা গেছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পর্কে জানেন এমন ভোটারের হার ৪৭ শতাংশ। প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৪২ শতাংশ। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি আছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, পরিবেশ ও অর্থনীতির তুলনায় সামাজিক স্তম্ভকে সবচেয়ে কম গুরুত্ব দিচ্ছেন ভোটার ও প্রার্থীরা। ভোটারদের কাছে দারিদ্র্য, আয় ও কর্মসংস্থানের চাপ এতটাই প্রবল যে সামাজিক বিষয়গুলো তাঁদের কাছে গৌণ হয়ে উঠছে।

সামাজিক উন্নয়নের প্রশ্নে ভোটারদের অগ্রাধিকার খুবই মৌলিক দুটি বিষয়ে। সেই দুটি বিষয় হলো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা। সিপিডির মতে, এই বাস্তবতা থেকে দেখা যায়, দেশের বড় একটি অংশ এখনো মৌলিক চাহিদা পূরণের লড়াই করছে।

দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার ইতিবাচক হলেও যথেষ্ট নয়: জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর দেয়া ইশতেহার অনেকটা ইতিবাচক হলেও যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন সিপিডি গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ইশতেহার ঘোষণা করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, পরিবেশ সুরক্ষায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী–খালখনন ও পুনঃখনন, ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করতে চায় দলটি।

এদিকে, পাঁচ বছরে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২৫ শতাংশ যোগান নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করতে চায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সরকারি দফতরের ছাদে সোলার স্থাপন এবং সরকারি গাড়ির ৪০ শতাংশ বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছে দলটি।

শিল্পকারখানাগুলোতে ইটিপি প্ল্যান্ট স্থাপন বাধ্যতামূলক, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেয়ার কথা বলেছে জামায়াত ইসলামী। শিশু ও বয়স্কদের ফ্রি চিকিৎসা সেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। উচ্চশিক্ষা মেয়েদের জন্য ফ্রি করার কথা বলছে জামায়াত। আর কুইক রেন্টাল বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

সংবাদ সম্মেলনে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে নতুনত্ব এনেছে রাজনৈতিক দলগুলো। রাস্তাঘাট বা অবকাঠামো উন্নয়নের গৎ বাঁধা প্রতিশ্রুতি থেকে বেরিয়ে এসেছে। তারা সামাজিক উন্নয়নের দিকে নজর দিয়েছে। তবে তাও যথেষ্ট নয়।’

নির্বাচন ও গণভোট ইস্যুতে নিজেদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা যাচ্ছে না। গণভোটের ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।’

নানা উদ্যোগের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও বাস্তবায়নে অর্থের যোগান আসবে কোথা থেকে, নির্বাচনী ইশতেহারে তার উল্লেখ নেই বলেও মন্তব্য করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক।

অর্থনীতি বাঁচাতে নতুন ব্যাংক অনুমোদন না দিয়ে বরং দুর্বল ব্যাংকগুলো বন্ধ করে দেয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন সরকারকে সে ব্যাপারে নজর দেয়ার অনুরোধ করেছে সিপিডি।

কাঠামোগত দুর্বলতায় গণভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে:

গণভোটের বিদ্যমান কাঠামো ও সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশের দুর্বলতার কারণে এর ফলাফল নিয়ে গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সিপিডি পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন এবং ইশতেহার ঘোষণা করে ভোটারদের সামনে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন। একইসঙ্গে একটি কথা বলা জরুরি, জাতীয় নির্বাচন যেই অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া প্রয়োজন, বাস্তবে সেই অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, গণভোটের কাঠামো ও অধ্যাদেশে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার কারণে এর ফলাফল নিয়েও গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন থাকতে পারে। এ বাস্তবতায় সিপিডির পক্ষ থেকে মনে করা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে মূলত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। নির্বাচনী ইশতেহার বিশ্লেষণের বিষয়ে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সিপিডিসহ অন্যান্য থিংক ট্যাংকগুলো নির্বাচন সামনে রেখে সাধারণত ইশতেহার নিয়ে গভীর ও বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা করে থাকে। কী ধরনের ইশতেহার হওয়া উচিত, দলগুলোর ইশতেহারের মধ্যে কী ধরনের পার্থক্য রয়েছে এবং কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুপস্থিত—এসব দিক তুলে ধরে। মিডিয়া ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, সিপিডির এ গবেষণায় সারা দেশের পরিবেশ ও দুর্যোগপ্রবণ ১৫০টি নির্বাচনী এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে ৪৫০ জন সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী এবং ১ হাজার ২০০ জন ভোটার অংশ নেন। জরিপের ফলাফলের মাধ্যমে নির্বাচনী এলাকায় ‘সবুজ সমাজ’ গঠনের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভোটারদের প্রত্যাশার চিত্র তুলে ধরা হয়।