সুসংবাদ প্রতিদিন

পাতাকপি চাষে বাজিমাত

প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  চান্দিনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মেহার গ্রাম। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে সূর্য যখন আড়মোড়া ভেঙে পুব আকাশে উঁকি দেয়, তখন সেই রোদের ঝিলিক মেহার গ্রামের দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে। তবে এবারের শীতের সকালগুলো এই গ্রামের কৃষক বিল্লাল হোসেনের জন্য একটু অন্যরকম আনন্দ আর প্রাপ্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। তার ৩০ শতাংশ জমিতে এখন শুধু সবুজ পাতাকপির সমারোহ নয়, বরং সেখানে দানা বেঁধেছে এক সফল কৃষকের স্বপ্ন পূরণের গল্প। কৃষিকে যারা শুধু টিকে থাকার লড়াই মনে করেন, তাদের জন্য বিল্লাল হোসেন এখন এক অনন্য উদাহরণ।

কৃষক বিল্লাল হোসেন জানান, তার এই জমিতে ৩০০০ পাতাকপির চারা রোপণ করেছিলেন। শুরুর দিকে কিছুটা দুশ্চিন্তা থাকলেও মাটির উর্বরতা আর নিয়মিত পরিচর্যায় চারাগুলো দ্রুত বাড়তে থাকে। মেহার গ্রামের উর্বর পলিমাটিতে প্রতিটি চারা এখন বিশাল আকৃতির পুষ্ট পাতাকপিতে রূপ নিয়েছে। খেতের দিকে তাকালে দেখা যায়, মাটির বুক চিরে সারি সারি সাজানো একেকটি কপি যেন সবুজের কার্পেট বিছিয়ে রেখেছে। এই বাম্পার ফলন দেখে শুধু বিল্লাল নন, এলাকার অন্যান্য কৃষকরাও মুগ্ধ হয়ে তার ক্ষেতে ভিড় জমাচ্ছেন। একটি সফল ফসলের পেছনে থাকে হাড়ভাঙা শ্রম আর সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ। বিল্লাল হোসেনের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে চারা কেনা, সময়মতো সুষম সার প্রয়োগ, রোগবালাই দমনে প্রয়োজনীয় কীটনাশক এবং শ্রমিকের মজুরি বা কামলা খরচ মিলিয়ে তার মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। বর্তমান সময়ে কৃষি উপকরণের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এই বিনিয়োগটুকু করাও ছিল বিল্লালের জন্য এক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সব প্রতিকূলতা জয় করে তার নিবিড় যত্ন আর পরম মমতায় ফলন হয়েছে আশাতীত। প্রতিটি কপির আকার এবং মান এতটাই ভালো হয়েছে যে, বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে পাইকারি বাজারে শীতকালীন এই সবজির বেশ ভালো দাম যাচ্ছে। বিল্লাল হোসেনের খেত থেকে একেকটি পাতাকপি পাইকারি দরে বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত। পাইকাররা সরাসরি খেতে এসেই ফসল দেখে দরদাম করছেন, যা কৃষকের জন্য বাড়তি সুবিধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যদি বাজারের এই স্থিতিশীলতা আর চড়া দাম আগামী কয়েক সপ্তাহ বজায় থাকে, তবে বিল্লাল হোসেনের ধারণা, তিনি এই ৩০ শতাংশ জমির ফসল থেকে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা অনায়াসেই আয় করতে পারবেন। অর্থাৎ, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে খরচ বাদে তার নিট মুনাফা দাঁড়াবে প্রায় ৬০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা। বিল্লাল হোসেনের এই সাফল্য শুধু তার একার নয়; এটি মেহার গ্রামের সামগ্রিক কৃষিতে এক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তার এই বাম্পার ফলন দেখে স্থানীয় অনেক বেকার যুবক এবং সাধারণ চাষিরা এখন সবজি চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন।

আধুনিক কৃষি পদ্ধতি আর সঠিক বাজারজাতকরণ সুবিধা পেলে যে সাধারণ কৃষকও স্বাবলম্বী হতে পারেন, মেহার গ্রামের বিল্লাল হোসেন আজ তারই এক জীবন্ত প্রমাণ। বাজারে টাটকা ও বিষমুক্ত সবজির চাহিদা বাড়তে থাকায় বিল্লালের মতো কৃষকদের এই অবদান স্থানীয় অর্থনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করছে। তীব্র শীত আর ভোরের কুয়াশা উপেক্ষা করে বিল্লাল এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন খেত থেকে কপি সংগ্রহ আর বাজারজাতকরণে। তার চোখে-মুখে এখন জয়ের আনন্দ। বিল্লাল হোসেনের এই সফলতার গল্প চান্দিনার অন্যান্য কৃষকদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। সঠিক সময়ে সঠিক ফসল নির্বাচন এবং কঠোর পরিশ্রম করলে মাটির বুক চিরে যে সোনালি কিংবা সবুজ বিপ্লব ঘটানো সম্ভব, মেহরগ্রামের ফসলের মাঠ আজ সেই কথাই বলছে। শীতের এই মিঠে রোদে বিল্লালের হাসিমাখা মুখ যেন প্রতিটি সফল কৃষকের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।