সুসংবাদ প্রতিদিন
বাড়ির আঙিনায় সমন্বিত কৃষি খামার সাড়া ফেলেছে
প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
এসএম মজিবুর রহমান, শরীয়তপুর

কৃষিজমিতে বসতি স্থাপন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর অবকাঠামো উন্নয়নের চাপে দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে উৎপাদনক্ষম জমির পরিমাণ। অন্যদিকে বাড়তে থাকা জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে গিয়ে বাণিজ্যিক কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে বাজারে নিরাপদ খাদ্যের সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় ব্যক্তি উদ্যোগে বাড়ির আঙিনায় সমন্বিত কৃষি হতে পারে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের এক কার্যকর ও টেকসই সমাধান।
শরীয়তপুর জেলা সদরের দক্ষিণ বালুচড়া এলাকায় এমনই এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কবিপুত্র ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অনিক ঘটক চৌধুরী। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহধন্য প্রয়াত কবি রথীন্দ্র কান্ত ঘটক চৌধুরীর স্মৃতিবিজড়িত জেলা সদরের শিক্ষা সংস্কৃতির আতুরঘর রথীন্দ্র ভবনের প্রায় আট একর বাড়ির আঙিনা সেজেছে সমন্বিত নিরাপদ কৃষি খামারের রূপে। এখানে সারি সারি শাকসবজি, মৌসুমভিত্তিক ও সারা বছর ফলন দেওয়া ফলের গাছ, আর মাছসমৃদ্ধ পুকুর। নিরাপদ উপায়ে গড়ে ওঠা এই খামার শুধু পরিবারের খাদ্য চাহিদাই মেটাচ্ছে না, বরং আশপাশের মানুষদের মধ্যেও নিরাপদ কৃষি চর্চার আগ্রহ সৃষ্টি করছে। আগামীতে গরুর দুগ্ধ খামারের পরিকল্পনার কথাও জানান এই উদ্যোক্তা।
স্থানীয় বাসিন্দা ইব্রাহিম সরদার বলেন, অনিক ঘটক চৌধুরীর বাড়ির আঙিনায় যেভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে শাক-সবজি ও ফলমূল চাষ হচ্ছে, তা আমাদের জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা। ইচ্ছা থাকলেই বাড়ির আশপাশের খালি জায়গা কাজে লাগিয়ে মৌসুম অনুযায়ী সবজি আবাদ করা সম্ভব। এতে পরিবারের চাহিদা মিটবে, আবার আত্মীয়স্বজনকেও নিরাপদ খাবার উপহার দেওয়া যাবে। এখানটায় পরিকল্পিতভাবে উন্নত জাতের ফলের গাছ লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়ার যে দৃশ্য আমরা দেখছি তা দ্রুতই অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছে।
উদ্যোক্তা অনিক ঘটক চৌধুরী জানান, বাজারে নিরাপদ সবজি ও ফলমূলের প্রাপ্যতা দিন দিন কমে যাওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে এই চিন্তা থেকেই ২০১৬ সাল থেকে তিনি নিজের বাড়ির আঙিনায় চাষাবাদ শুরু করি। বিশেষ করে যেসব ফলের গাছ আমাদের আঙিনায় নেই সেগুলো ধীরে ধীরে রোপণ করেছি। পাশাপাশি সারা বছর পাওয়া যায় এমন শাক-সবজির আবাদ করেছি। এতে পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি স্বজনদের উপহার দেওয়া যাচ্ছে, এমনকি অতিরিক্ত আয়ও হচ্ছে।
তাই সবার উদ্দেশে বলব, যাদের বাড়ির আঙিনায় সামান্য জায়গা ফাঁকা আছে, সবাই যেন নিরাপদ ফলমূল ও সবজি চাষে এগিয়ে আসেন। এতে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন কমবে, তেমনি জাতীয় পর্যায়েও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
শরীয়তপুরের উপ-পরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন বলেন, প্রত্যেকের বাড়ির আঙিনায় সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে উঠলে শুধু পারিবারিক স্বাস্থ্যঝুঁকিই কমবে না, সার্বিক কৃষি উন্নয়নেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বাণিজ্যিক কৃষি ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী এবং লাভজনক করবে। তিনি আরও বলেন, বাড়ির আঙিনাভিত্তিক সমন্বিত কৃষি এখন আর শুধু শখের বিষয় নয় এটি হয়ে উঠছে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের এক সম্ভাবনাময় সমাধান। শাকসবজি, ফল ও মাছ এই তিনের সমন্বয়ে পরিকল্পিত চাষাবাদ যেমন পরিবারকে দিচ্ছে পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তা, তেমনি কমাচ্ছে বাজারনির্ভরতা এবং কমছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। সচেতনতা, পরিকল্পনা আর আগ্রহের সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাড়ির আঙিনাই হয়ে উঠতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ নিরাপদ কৃষি খামার। যা জাতীয় পর্যায়ে এক ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে দিতে পারে বলে কৃষি বিভাগ আশাবাদ।
