আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলা, উত্তেজনা
* পাকিস্তানের বিমান হামলার পর আফগান নেতাদের জরুরি বৈঠক * যেকোনো হুমকির দাঁতভাঙা জবাব দেবে পাকিস্তান
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রতিবেশী আফগানিস্তানের ভেতরে একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। আফগান সরকার জানিয়েছে, হামলায় অনেকে হতাহত হয়েছেন। এর মধ্যে নারী-শিশুও রয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে দুই দেশ সংঘাতে জড়িয়েছিল। তখন উভয়পক্ষের ৭০-এরও বেশি মানুষ নিহত হন। সেই ঘটনার পর এটিই সবচেয়ে বড় হামলা। বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে এমনটি বলা হয়েছে। গতকাল রোববার সকালে প্রকাশিত ২১ ফেব্রুয়ারির এক বিবৃতিতে পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বলেছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সামরিক বাহিনী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও তাদের সহযোগী গোষ্ঠীর সাতটি ক্যাম্প ও আস্তানায় হামলা চালিয়েছে। একই বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, স্পষ্ট প্রমাণ আছে যে টিটিপি আফগানিস্তানে থাকা তাদের নেতাদের নির্দেশে পাকিস্তানে সাম্প্রতিক হামলাগুলো চালিয়েছে।
আফগানিস্তান জানিয়েছে, হামলাগুলো নানগারহার ও পাকতিকা প্রদেশে চালানো হয়েছে, যেখানে বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ এক্সে লিখেছেন, পাকিস্তানি জেনারেলরা তাদের দেশের নিরাপত্তার ঘাটতি ঢাকতে এই ধরনের অপরাধে লিপ্ত হচ্ছেন। এএফপির এক সাংবাদিক নানগারহার জেলার বিহসুদ এলাকায় দেখেছেন, হামলার পরে মানুষ ধ্বংসাবশেষের নিচে হতাহতদের খুঁজে পেতে বুলডোজার ব্যবহার করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আফগান এক নিরাপত্তা সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, বিহসুদে একটি বাড়ি লক্ষ্য করে হামলায় ১৭ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১২ জন শিশু ও কিশোর। পাকিস্তান বলেছে, ইসলামাবাদের একটি শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ এবং উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে সাম্প্রতিক অন্যান্য আত্মঘাতী হামলার জবাবে এসব চালানো হয়েছে, যার মধ্যে শনিবারের হামলাও রয়েছে। উভয়পক্ষের উত্তেজনার কারণে সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্রসিং বারবার বন্ধ হয়েছে এতে বাণিজ্য ও সীমান্ত পারাপার ব্যাহত হয়েছে।
গত বছরের অক্টোবরে সংঘর্ষের পর দুই পক্ষই একটি অস্থায়ী শান্তিচুক্তিতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু ইসলামাবাদ এখনো আফগানিস্তানের তালেবানদের দিকে এই বলে আঙুল তুলছে যে তারা সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দিচ্ছে। তবে কাবুল তা বারবারই অস্বীকার করেছে।
উপযুক্ত জবাব দেওয়ার হুমকি-পাকিস্তানের বিমান হামলার পর আফগান নেতাদের জরুরি বৈঠক : আফগানিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় আজ রোববার ভোরে বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এসব হামলার পর দেশটির তালেবান সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জরুরি বৈঠক করেছেন। সেখানে পাকিস্তানকে পাল্টা জবাব দেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা হয়। আফগান সরকার এক বিবৃতিতে বলেছে, পাকিস্তান হামলা চালিয়ে আফগানিস্তানের ভৌগলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন করেছে এবং কাবুলের এটির জবাব দেওয়ার অধিকার আছে। কোন সময় প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো হবে সেটি তালেবান নেতৃবৃন্দ নির্ধারণ করবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।
সংবাদমাধ্যম দ্য উইক জানিয়েছে, পাকিস্তান নতুন করে হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতির চুক্তি লঙ্ঘ করেছে বলে মনে করছে আফগান সরকার। এ ব্যাপারে সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোকে অবহিত করেছে আফগানিস্তান।
জানা গেছে, সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় এফ-১৬ এবং জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান থেকে হামলা চালানো হয়। পাকিস্তান দাবি করেছে, গোয়ন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানা লক্ষ্য করে সূক্ষ্ম হামলা চালানো হয়েছে। তবে আফগান তালেবানের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ এক্সে এক পোস্টে জানিয়েছেন, পাকিস্তানের বিমানবাহিনী বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা চালিয়েছে। এতে অন্তত ডজনখানেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
গত বছর আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্তে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছিল। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর পর সংঘর্ষ থামে। তবে সম্পতি পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী হামলা বেড়ে গেছে। এসব হামলার পরিকল্পনা আফগানিস্তান থেকে করা হয়েছে দাবি করে দেশটি আজ আফগানিস্তানে হামলা চালিয়েছে।
যেকোনো হুমকির দাঁতভাঙা জবাব দেবে পাকিস্তান : পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া বান্নুতে হওয়া এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার জবাবে আফগানিস্তান সীমান্তে সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানায় বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। এই অভিযানের পর দেশটির সংসদ বিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রী তারিক ফজল চৌধুরী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে জানিয়েছেন যে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার যেকোনো অপচেষ্টা বা হুমকির দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। গতকাল রোববার ভোরে পাকিস্তান বিমান বাহিনী আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসীদের আস্তানায় সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী হামলা চালায়, যাতে ফিতনা আল-খাওয়ারিজ এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বেশ কয়েকজন সদস্য নিহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এই বিমান হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে বান্নু, বাজাউর এবং ইসলামাবাদের ইমামবারগাহে হওয়া আত্মঘাতী হামলার সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত শনিবার বান্নুতে হওয়া এক আত্মঘাতী হামলায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল গুলফরাজ এবং সিপাহী কারামত শাহাদাত বরণ করেন। গোয়েন্দা তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও সহায়তাকারীরা আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তান বিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে এবং তারা মূলত পাকিস্তানি তালেবান ও ফিতনা আল-খাওয়ারিজ গোষ্ঠীর সাথে জড়িত।
মন্ত্রী তারিক ফজল চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে পাকিস্তানিদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, পাকিস্তানের প্রতিটি ইঞ্চি ভূমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং রাষ্ট্রের দিকে কেউ কুদৃষ্টি দিলে তা সমূলে নির্মূল করা হবে। বিমান বাহিনীর সফল অভিযানের প্রশংসা করে তিনি দেশপ্রেমমূলক স্লোগান দিয়ে তার বক্তব্য শেষ করেন। এই অভিযানের মাধ্যমে পাকিস্তান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে সীমান্তের ওপার থেকে পরিচালিত কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম তারা বরদাস্ত করবে না এবং দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সামরিক শক্তি প্রয়োগ অব্যাহত রাখবে।
