ইরানে হামলা ঝুঁকিপূর্ণ হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য
প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

ইরানে মার্কিন আক্রমণ চালালে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। তবে, এ বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর সমালোচনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। গত সোমবার আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের তীব্র সমালোচনা করেন যেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এবং মার্কিন হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা গত রোববার প্রতিবেদনে জানায়, কেইন গত সপ্তাহে এক বৈঠকে ট্রাম্পকে বলেছিলেন যে, গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রশস্ত্র এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থনের অভাব আমেরিকার জন্য ভালো হবে না। কারণ মার্কিন আক্রমণের ক্ষেত্রে ইরান যখন সম্ভাব্য প্রতিশোধ নিতে চাইবে তখন তা নিয়ন্ত্রণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সমস্যা হতে পারে। প্রতিবেদন অনুসারে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত মার্কিন অস্ত্রের মজুদ, ইসরাইল এবং ইউক্রেনের মতো মিত্রদের সমর্থনে ইতোমধ্যে ব্যবহার করা হয়েছে।
কেইন ইরানের যেকোনো অভিযানের মাত্রা, এর অন্তর্নিহিত জটিলতা এবং মার্কিন হতাহতের সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সংবাদপত্রটি এই বিষয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনার সাথে পরিচিত একজন ব্যক্তির বরাত দিয়ে জানিয়েছে। ট্রাম্পের সাথে আলোচনায় কেইন-এর উদ্বেগের বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন করেছে অনলাইন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। গত সোমবার সন্ধ্যায় এক নিবন্ধে তারা বলেছে, কেইনই একমাত্র সামরিক ব্যক্তিত্ব যিনি কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্পকে ইরান সম্পর্কে ব্রিফ করছেন।
সংবাদমাধ্যমটি জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান তদারকির দায়িত্বে নিযুক্ত মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারকে জানুয়ারি থেকে ট্রাম্পের সাথে কোনো বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বা কথা বলা হয়নি। দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে অ্যাক্সিওস জানায়, জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের জন্য কেইন ভেনিজুয়েলার অভিযানে সম্পূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন তবে ইরানকে ঘিরে আলোচনায় তিনি আরও সতর্ক ছিলেন।এই বৈপরীত্যের কথা উল্লেখ করে, একটি সূত্র কেইনকে ইরানের ব্যাপারে ‘অনিচ্ছুক যোদ্ধা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। কেইন ইরানে একটি বড় অভিযানের ঝুঁকি বেশি বলে মনে করেন, যার ফলে জড়িয়ে পড়ার এবং আমেরিকানদের হতাহতের ঝুঁকিও বেশি, ধারণা তার।
তবে, ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে এগুলোকে ‘ভুয়া সংবাদ মাধ্যম’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং কেইনকে নিয়ে যে বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে তার বিরোধীতাও করেছেন। ট্রাম্প বলেছেন, ‘তিনি ইরানে হামলা চালাতে না করেননি। এমনকি আমি যে ভুয়া সীমিত হামলার কথা গণমাধ্যমে পড়ছি, সে সম্পর্কেও কিছু বলেননি। তিনি কেবল একটি জিনিস জানেন, কীভাবে জিততে হয় এবং যদি তাকে তা করতে বলা হয়, তবে তিনিই দলের নেতৃত্ব দেবেন।’মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ইরানের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধ সম্পর্কে যা কিছু লেখা হয়েছে তা ভুলভাবে লেখা হয়েছে, এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে। ট্রাম্প কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের উপর আক্রমণের কথা ভাবছেন, সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল বাহিনীকে কেন্দ্রীভূত করছেন যা এই অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা ও সংঘাত ছড়িয়ে দিতে পারে।অন্যদিকে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা নিয়ে আশা প্রকাশ করেছে যে বৈঠক ফলপ্রসূ হবে, কিন্তু পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আঞ্চলিক প্রক্সিদের সমর্থনের মতো বিষয়গুলো যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দাবি তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরান আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ:
এক্স সোশ্যাল নেটওয়ার্কে ইংরেজিতে লেখা এক বার্তায়, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেন: ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি আরও বলেন: সাম্প্রতিক আলোচনায় কার্যকর প্রস্তাব বিনিময় অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত এসেছে।
রাষ্ট্রপতি জোর দিয়ে বলেন: তবে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছি এবং সম্ভাব্য যে-কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রস্তুতির বিষয়টি আমরা বিবেচনা করে রেখেছি।
ইহুদিবাদী ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বেড়েছে:
ইরানে বিশ্ব কুদস দিবস বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রমজান শরীফ বলেছেন, গাজায় বহু নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা বিশ্বজুড়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। তাঁর মতে, এখন আগের চেয়ে বেশি মানুষ ইহুদিবাদী ইসরায়েলের প্রকৃত চেহারা বুঝতে পারছে।
মেহর নিউজের বরাত দিয়ে পার্সটুডে জানিয়েছে, রমজান শরীফ বলেছেন, এ বছর গত শুক্রবার ইরানে বিশ্ব কুদস দিবসের ৪৬তম র্যালি অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি বলেন, প্রায় ৪৭ বছর আগে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতায় রুহুল্লাহ খোমেনী জায়নবাদী ইসরায়েলকে “ক্যান্সার” হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই মন্তব্যের সত্যতাকেই সামনে এনেছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রমজান শরীফ আরও বলেন, গত দুই বছরেরও কম সময়ে গাজায় ইহুদিবাদী শাসনব্যবস্থার হাতে লক্ষাধিক নিরপরাধ মানুষ শহীদ হয়েছে এবং আরও দুই লক্ষাধিক মানুষ পঙ্গু ও আহত হয়েছে।
কমান্ডার শরীফের মতে, এসব ঘটনার পর বিশ্বব্যাপী এক ধরনের সচেতনতা তৈরি হয়েছে। ‘আল-আকসা তুফান অভিযান’-এর পর এই জনমত আরও জোরালো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ইরানের বিশ্ব কুদস দিবসের কেন্দ্রীয় স্টাফের প্রধান আরও উল্লেখ করেন, ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা সত্ত্বেও অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জায়নবাদী শাসনব্যবস্থা কঠিন চাপে রয়েছে।
ট্রাম্পের প্রশ্নে ইরানের সাফ জবাব আত্মসমর্পন করব না কারণ আমরা ইরানি:
ইরান কেন আত্মসমর্পন করছে না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন প্রশ্নের জবাবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আত্মসমর্পণ করব না কারণ আমরা ইরানি। “ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট “ডোনাল্ড ট্রাম্প” এর ইরানের আত্মসমর্পন না করা সম্পর্কে কৌতূহলের জবাবে তার এক্স অ্যাকাউন্টে লিখেছেন: আমরা কেন আত্মসমর্পণ করব না তা জানতে আগ্রহী? কারণ আমরা “ইরানি”।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিশেষ প্রতিনিধি এবং দেশটির প্রধান আলোচক “স্টিভ উইটকফ”, ফক্স নিউজের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন: ট্রাম্প আমাকে এই প্রশ্নটি করেছেন, এবং আমি “হতাশ” শব্দটি ব্যবহার করতে চাই না। কারণ তিনি জানেন যে তার কাছে অনেক বিকল্প আছে, কিন্তু তিনি (ট্রাম্প) কৌতূহলী কেন তারা অর্থাৎ (ইরানিরা) আত্মসমর্পণ করেনি।
উইটকফ আরও বলেন: “ ইরানিরা এত চাপের মুখে আমাদের কাছে কেন আসেনি এবং বলেনি যে আমরা স্বীকার করি যে আমরা আর কোনো অস্ত্র বানাতে চাই না? আমেরিকা “যা করতে প্রস্তুত” তার জন্যই এই অঞ্চলে সামরিক বাহিনী স্থানান্তর করছে,এবং অবশ্যই এই স্থানান্তর “কঠিন”।
“আমেরিকার প্রতি ইরানের অনমনিয় অবস্থানের কারণ তিনটি তাত্ত্বিক স্তরের (জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক) উপর নির্ভর করে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এই কাঠামোতে, ইরানের কঠোর অবস্থানের পেছনে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, ভূ-রাজনৈতিক এবং মূল্যবোধের যুক্তি রয়েছে। ইরান এমন একটি দেশ যা ইতিহাস জুড়ে বহুবার বিদেশী শক্তি দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়েছে, কিন্তু কখনও পরাজিত হয়নি। বহু প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে ইরানের যুদ্ধ থেকে শুরু করে নব্য-ঔপনিবেশিক যুগ এবং সমসাময়িক যুগ পর্যন্ত, ইরানের জাতীয় মানসিকতা “আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের” ধারণা দ্বারা গঠিত হয়েছে।
এই ইতিহাস “প্রতিরোধ” ইরানের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতির একটি অংশ করে তুলেছে। প্রতিরোধ হল জনগণের জন্য সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক ইরান। এই জাতীয় সংস্কৃতি এবং অভ্যন্তরীণ সংহতির কারণে, বহিরাগত চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করতে জানে না ইরানিরা।
এছাড়াও এটা লক্ষ করা উচিত যে পশ্চিম এশীয় অঞ্চলে, যেখানে দেশগুলির মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক প্রায়শই অস্থিতিশীল এবং জাতিগত, ধর্মীয় এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত সেখানে, ইরান সবসময় নায়কের ভূমিকায় ছিল এবং এখনো আছে যাকে কখনো বৃহৎ শক্তির আনুগত্য করতে হয়নি।
