সুসংবাদ প্রতিদিন
‘চাষি বাজার’ বদলে দিচ্ছে মধ্যাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি
প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
এসএম মজিবুর রহমান, শরীয়তপুর

কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা দীর্ঘদিন থেকেই বাংলাদেশের কৃষকদের অন্যতম প্রধান দাবি। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, অস্বচ্ছ লেনদেন আর দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনায় অনেক সময়ই উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হয় কৃষকদের। সেই বাস্তবতায় শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার মিরাশার চাষি বাজার আজ কৃষকদের আস্থার ঠিকানা। যেখানে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাসহ সার্বিক ব্যবস্থপনাই কৃষকবান্ধব।
২০০৮ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, উপজেলা প্রশাসন ও সমবায় কার্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে মাত্র ৩২ শতক জমির ওপর যাত্রা শুরু করা মিরাশার বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের এই বাজার এখন দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি কৃষি বাজারে পরিণত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতাবিক্রেতার সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকায় বাজারের পরিধিও বেড়েছে চাহিদার ভিত্তিতে। বর্তমানে এর আয়তন চার একর। চলতি মৌসুমেও ক্রেতা বিক্রেতার সমাগমের কথা মাথায় রেখে বাড়ানো হয়েছে এক একর।
ভরা মৌসুমে বিশেষ করে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এই বাজারে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৩০০ কোটি টাকার কৃষি পণ্য বেচা-কেনা হয়। প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার ছোট-বড় পাইকার ও দশ হাজারের বেশি কৃষক বিক্রেতার উপস্থিতিতে বাজারটি প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে। এখানে পেঁয়াজ, রসুন, শাকসবজি, শশা, কুমড়া, বেগুনসহ প্রায় সব ধরনের মৌসুমি কৃষি পণ্যের বেচা-কেনা হয়। তবে মুড়িকাটা পেঁয়াজের মৌসুমেই বাজারটি সবচাইতে বেশি জমজমাট থাকে। শুধু শরীয়তপুর নয়, পার্শ্ববর্তী মাদারীপুর জেলার কৃষকরাও নিয়মিত এই বাজারে ফসল বিক্রি করতে আসেন। জাজিরার পালেরচরের কৃষক কাশেম আলী বলেন, মিরাশার চাষি বাজার আমাদের জন্য সত্যিকারের আস্থার জায়গা। এখানে কোনো ঝুট-ঝামেলা নেই, দালালও চোখে পড়ে না। খুব সহজেই ন্যায্য দামে ফসল বিক্রি করা যায়। এখানে বাড়তি খরচ না থাকায় আমাদের লাভও বেশি হয়।
মাদারীপুর জেলার সিলারচর এলাকার কৃষক মফিজুল বলেন, এই বাজারে ফসলের দাম ভালো পাওয়া যায় বলেই পেঁয়াজ, রসুন, শশা ও অন্যান্য সবজি নিয়ে এখানে আসি। একদিনেই বিক্রি করে বাড়ি চলে যেতে পারি। এতে সময় ও খরচ দুটোই সাশ্রয় হয়। বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুল জলিল মাদবর জানান, মিরাশার চাষি বাজারের সুনাম এখন দেশজুড়ে। এখানে অদৃশ্য খরচ না থাকায় ও ঝামেলামুক্ত ব্যবস্থপনার কারণেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকারদের আস্থা অর্জন করতে পেরেছি।
মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ ছাড়াও রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ সিলেট, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলা পর্যন্ত এই বাজারের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে। ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। এ বছরও এক একর বাড়ানো হয়েছে। ভরা মৌসুমে এই বাজারে প্রতিদিন সাড়ে ৩০০ কোটি টাকর কৃষি পণ্য বেচা-কেনা হয়। আর এ সময় প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার ছোট-বড় পাইকার ও দশ হাজারের বেশি কৃষক বিক্রেতার সমাগম ঘটে।
জাজিরা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা বাজার ব্যবস্থাপনার কাজ করছি। নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে, যাতে কেউ হয়রানির শিকার না হন এবং বাজারে শৃঙ্খলা বজায় থাকে। বিশেষ করে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় আমাদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট।
মিরাশার চাষি বাজার শুধু একটি কৃষি ভিত্তিক বাণিজ্যকেন্দ্র নয় এটি সমবায়ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থাপনার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখানে কৃষক সরাসরি পাইকারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারায় মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা নেই বললেই চলে। ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন এবং ভোক্তাও তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে কিনতে পারছেন। কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য, স্বচ্ছতা ও আস্থার এই মডেল যদি দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও অনুসরণ করা যায়, তাহলে কৃষি খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা আরও সহজ হবে বলেও আমরা আশাবাদী।
