
অমর একুশে বইমেলা-২০২৬-এর ষষ্ঠ দিনে পাঠক ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম। গতকাল মঙ্গলবার নির্ধারিত সময়ে মেলা শুরু হলেও সারাদিনই মেলা প্রাঙ্গণে এক ধরনের নিস্তরঙ্গ পরিবেশ বিরাজ করে। মেলার স্থায়িত্ব কম হওয়া এবং রমজান মাসের প্রভাবে পাঠক খরা চলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বাংলা একাডেমির স্টলসহ বেশ কিছু স্টলের নির্মাণ ও সাজসজ্জার কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। অনেক স্টলের সামনের হাঁটার পথও অসম্পূর্ণ। মেলায় ঘুরতে আসা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, আবেগ ও অনুভূতির টানেই বইমেলায় আসা। তবে এবারের ব্যবস্থাপনা আরও গোছালো হতে পারত। লেখক ও সাংবাদিক পল্লব মোহাইমিন বলেন, ফেব্রুয়ারির চিরচেনা আমেজ এবার নেই। রমজান ও সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে পাঠক উপস্থিতি কম। এদিকে সন্তানদের ইন্টারনেট আসক্তি কমাতে সন্তানদের বইমেলায় নিয়ে আসার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন অভিভাবকরা। শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় বরাবরের মতো শীর্ষে রয়েছেন প্রয়াত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ। বিকেলে এক পশলা বৃষ্টির পর মেলা প্রাঙ্গণে স্নিগ্ধ পরিবেশ বিরাজ করলেও সন্ধ্যার পর ভিড় সামান্য বাড়ে।
বিকালে মেলার মূলমঞ্চে ‘সাহিত্যে জনপ্রিয়তা: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। মঈনুল কাসেমের প্রবন্ধ উপস্থাপনায় এতে আলোচনায় অংশ নেন পারভেজ হোসেন এবং সভাপতিত্ব করেন শহীদুল্লা মাসুদ। বক্তারা বলেন, সহজ-সরল ভাষায় গ্রামীণ জীবন ও সামাজিক সংকট তুলে ধরাই ছিল শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তার মূল চাবিকাঠি। বিকেল ৪টায় শুরু হওয়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শাহরিয়ার পারভেজ রিপনসহ অন্যান্য শিল্পীরা আবৃত্তি পরিবেশন করেন। সংগীত পরিবেশন করেন পার্থ বড়ুয়া, অনিমা রায় ও ফাহিমা ইয়াসমিনসহ বিশিষ্ট শিল্পীবৃন্দ। বইমেলা সাংবাদিকতায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি চায় পিআইবি: বইমেলা উপলক্ষে গতানুগতিক প্রচারণামূলক প্রতিবেদন থেকে বেরিয়ে এসে আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ, তথ্যনির্ভর ও সমালোচনামূলক রিপোর্ট তৈরির আহ্বান জানিয়েছে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)।
গতকাল মঙ্গলবার পিআইবিতে দুই দিনব্যাপী ‘একুশের কর্মশালা: গণমাধ্যমে বইমেলা’ শীর্ষক কর্মশালা শেষে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সনদ বিতরণের মাধ্যমে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
সমাপনী অনুষ্ঠানে পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ বলেন, বইমেলা কেবল স্টল, বই প্রকাশ বা ভিড়ের খবরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রকাশনা শিল্প, মুদ্রণ ব্যবসা, লেখক-পাঠকের সম্পর্ক এবং একটি বড় অর্থনৈতিক কার্যক্রম। তাই গণমাধ্যমকে আরও বিশ্লেষণধর্মী ও অনুসন্ধানী কভারেজে মনোযোগী হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলা একাডেমি আয়োজিত এ মেলার একটি ‘এজমালি’ বা সামষ্টিক চরিত্র রয়েছে, যা বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বহুমাত্রিক দিকগুলোকে প্রতিবেদনে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন কবি, লেখক ও অনুবাদক জাভেদ হুসেন এবং পিআইবির জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষক গোলাম মুর্শেদ। গোলাম মুর্শেদ জানান, বইমেলা, বই বাজার, প্রকাশনা ব্যবসা, মুদ্রণ শিল্প, বই পর্যালোচনা এবং লেখক-প্রকাশকের সাক্ষাৎকার গ্রহণে পেশাদার মান উন্নয়নই ছিল এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
দুই দিনের এ কর্মশালায় জাতীয় দৈনিক, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক এবং ফিচার লেখকেরা অংশ নেন।
প্রথম দিনে রিসোর্সপারসন ছিলেন ফারুক ওয়াসিফ ও সাহিত্য সমালোচক এমরান মাহফুজ। দ্বিতীয় দিনে সেশন নেন সাংবাদিক আশীষ-উর-রহমান ও জাভেদ হুসেন।
কর্মশালায় আলোচনার বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল—অমর একুশে বইমেলার ইতিহাস ও সামাজিক গুরুত্ব, বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের কাঠামো ও অর্থনীতি, বইমেলা কভারেজে নতুন প্রতিবেদন ধারণা, পেশাদার বই পর্যালোচনা লেখার কৌশল, লেখক ও প্রকাশকের সাক্ষাৎকার গ্রহণের দক্ষতা, সাহিত্য সাংবাদিকতার নৈতিকতা এবং ডিজিটাল যুগে বই সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ।
আয়োজকদের আশা, এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বইমেলা ও প্রকাশনা শিল্প নিয়ে আরও গভীর, দায়িত্বশীল ও মানসম্পন্ন সাংবাদিকতা চর্চা বাড়বে এবং পাঠকেরা বই ও সাহিত্য সম্পর্কে আরও প্রাসঙ্গিক ও তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবেদন পাবেন।