তেলের দাম বৃদ্ধির শঙ্কায় পাম্পগুলোতে হিড়িক

প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের সংকট বা দাম বৃদ্ধির ‘শঙ্কায়’ ঢাকার জ্বালানি তেলের পাম্পগুলোতে ‘হুমড়ি খেয়ে’ পড়েছেন ক্রেতারা। গতকাল বৃহস্পতিবার পাম্পগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ি ও বাইকের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে, কোনো কোনোটির দীর্ঘ সারি পাম্পের সীমানা ছাড়িয়ে সড়কেও চলে আসে। তবে পাম্প কর্মীরা বলছেন, দাম বাড়তে পারে এমন কোনো ‘আশঙ্কা’ বা ‘নির্দেশনা’ এখনো নেই তাদের। ‘হুজুগে’ পড়ে সবাই বাড়তি তেল নিচ্ছেন, এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের ওপর চাপ পড়েছে।

গ্যাস-সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে গেল রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) ও কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (কাফকো) ইউরিয়া সার উৎপাদন। গত বুধবার বেলা তিনটায় এসব কারখানার উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডে এখনো ইউরিয়া উৎপাদন চালু আছে। তবে যেকোনো মুহূর্তে সেটির উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। গত বুধবার সরকারি নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে এসব কারখানার উৎপাদন স্থগিত করা হয়।

সিইউএফএল সূত্র জানায়, সিইউএফএল চালু থাকলে দৈনিক ১১ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদন করে। প্রতি মেট্রিক টন সার ৩৮ হাজার টাকা হিসাবে কারখানাটিতে দৈনিক ৪ কোটি ১৮ লাখ টাকার সার উৎপাদিত হয়। সিইউএফএল সূত্র আরও জানায়, পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনের জন্য সম্পূর্ণ গ্যাসনির্ভর এ কারখানায় দৈনিক ৪৮ থেকে ৫২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। গ্যাস-সংকট এবং যান্ত্রিক নানা সমস্যা থাকায় গত অর্থবছরে কারখানাটিতে প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদিত হয়েছে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা বছরে প্রায় ২৬ লাখ মেট্রিক টন। তার মধ্যে সিইউএফএলসহ বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণাধীন কারখানাগুলো প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন করে। অবশিষ্ট ১৬ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া উচ্চ মূল্যে আমদানি করতে হয়। ওই কারখানার কর্মকর্তারা জানান, গ্যাসনির্ভর এ কারখানা টানা বন্ধ থাকলে বিভিন্ন যান্ত্রিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। কেমিক্যালের বিভিন্ন সঞ্চালন লাইনসহ যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। ফলে চালু করার পর যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেয়। সিইউএফএল সূত্র জানায়, দুই বছর ধরে কখনো যান্ত্রিক ত্রুটি, আবার কখনো গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ ছিল সিইউএফএল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শুধু পাঁচ দিন চালু ছিল এ কারখানা। এর বাইরে, ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ে। টানা ১০ মাস বন্ধের পর ১৩ অক্টোবর সিইউএফএল চালু হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের ৩ জানুয়ারি আবারও যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে দীর্ঘ সময় লাগে কারখানাটি চালু করতে। সর্বশেষ ওই বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত আড়াইটার সময় কারখানা চালু হয়। টানা দেড় মাস কারখানা চালু থাকলেও, পরে ১১ এপ্রিল থেকে গ্যাস বন্ধ করে দেওয়ায় কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর টানা ছয় মাস ইউরিয়া বন্ধ থাকার পর ২ নভেম্বর কারখানা চালু হয়। কিন্তু চালুর দিনই আবার বন্ধ হয়ে পড়ে কারখানা। এরপর গত ২ মার্চ আবার চালু হলেও গ্যাস-সংকটের কারণে বুধবার কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সিইউএফএল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৭ সালের ২৯ অক্টোবর জাপানের কারিগরি সহায়তায় কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে আনোয়ারা উপজেলার রাঙ্গাদিয়ায় সার কারখানাটি প্রতিষ্ঠা করে সরকার। কারখানা চালু হওয়ার সময় এর উৎপাদনক্ষমতা ছিল দৈনিক ১৭০০ মেট্রিক টন এবং বার্ষিক ৫ লাখ ৬১ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া। বর্তমানে দৈনিক ১ হাজার ১০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন করতে সক্ষম এটি। পাশাপাশি দৈনিক ৮০০ মেট্রিক টন এবং বার্ষিক তিন লাখ ১০ মেট্রিক টন অ্যামোনিয়া উৎপাদন করতে পারে সিইউএফএল।

জানতে চাইলে সিইউএফএলের উৎপাদন বিভাগীয় প্রধান উত্তম চৌধুরী বলেন, গত বুধবার বিকেলে কারখানার ইউরিয়া উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। গ্যাস সরবরাহ পেলে আবার উৎপাদন শুরু করা যাবে। তিনি আরও বলেন, ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমরা ৬৫ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছি।’ বন্ধ আরেকটি কারখানা কাফকোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁরা ফোন ধরেননি।

পাম্পে গাড়ির লাইন, বেশির ভাগই চান ফুল ট্যাঙ্ক, দুটিতে বিক্রি বন্ধ : রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেল (অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল) ও গ্যাস বিক্রির পাম্পগুলোতে যানবাহনের ভিড় ও দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেক জায়গায় যানবাহনের সারি রাস্তায় ছড়িয়ে গেছে। কিছু পাম্পে আবার জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পাম্প ঘুরে ও জ্বালানি বিক্রয়কারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশির ভাগ ক্রেতাই ট্যাঙ্ক পূর্ণ করে জ্বালানি নিচ্ছেন। এতে পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের রিজার্ভ কমে গেছে। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে রাজধানীর দুটি জ্বালানি তেল বিক্রয়কেন্দ্রে সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ রাখতে দেখা গেছে। এ ছাড়া একটি পাম্পে খোলা ড্রাম বা বোতলে ডিজেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। পাম্পগুলোর দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, জ্বালানি সরবরাহে স্বল্পতার কারণেই কিছু ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। সকাল সোয়া ৯টার দিকে মিরপুর-২ নম্বর সনি মোড়সংলগ্ন স্যাম অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড পাম্পে গিয়ে মোটরসাইকেল চালকদের লম্বা সারি ও ভিড় দেখা গেছে। বিক্রয়কর্মীরা জানালেন, চালকদের বেশির ভাগই ট্যাঙ্ক ফুল করে জ্বালানি কিনছেন।

সেখানে কথা হয় সালাম মিয়া নামের এক মোটরসাইকলের চালকের সঙ্গে। তিনি অ্যাপে রাইড শেয়ারের কাজ করেন। সালাম বলেন, এমনিতে দিনে দুই থেকে তিনবার ২০০ থেকে ৩০০ টাকার তেল ভরি। কারণ, পকেটে টাকা থাকে না। তবে আজ জমানো কিছু টাকা একত্র করে ফুল ট্যাঙ্ক করলাম। ১ হাজার ৬০ টাকা লেগেছে। ফুল ট্যাঙ্ক নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার রোজগারই হয় বাইক চালিয়ে। এখন তেল না পেলে বাইক যদি বন্ধ থাকে আমার সংসার চলবে কীভাবে?’

পাম্পটিতে ডিজেল খোলা বোতল বা ড্রামে বিক্রি বন্ধ রাখতে দেখা গেছে। রিকশায় করে ওই পাম্প থেকে ৩০ লিটারের ড্রামে ডিজেল নিতে এসেছিলেন পাইলিংয়ের কাজ করা শ্রমিক মাহফুজ আলী। তিনি বলেন, ‘বলতেছে ডিজেল নাই। প্রতিদিনের কাজে ৩০ লিটার লাগে। গত দেড় মাস ধরে এই পাম্প থেকেই তেল কিনছি। এখন (বৃহস্পতিবার) বলছে ডিজেল নাই। কাজ বন্ধ রেখে ডিজেল কিনতে এসেছিলাম।’

ডিজেল বিক্রি বন্ধ রাখার বিষয়ে স্যাম অ্যাসোসিয়েটস পাম্পের ক্যাশিয়ার শরীফ আহমেদ বলেন, পাম্পে সাধারণত ২০ থেকে ২৭ হাজার লিটার জ্বালানি মজুত থাকে। সেটা এখন প্রায় ৫ হাজারে নেমে এসেছে। ডিজেল প্রায় শেষের দিকে। তাই খোলা বিক্রি বন্ধ রেখে শুধু যানবাহনে দিচ্ছি। কারণ যানবাহনটা এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সকাল পৌনে ১০টার দিকে কল্যাণপুরের খালেক পাম্পেও যানবাহনের ভিড় দেখা গেছে। পাম্পটিতে মোটরসাইকেলের চাইতে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ বেশি ছিল। পাম্পের এক বিক্রয়কর্মী জানান, গত বুধবার রাতে ও আজ সকাল থেকে যানবাহনের চাপ স্বাভাবিক সময়ের চাইতে দেড়-দুই গুণ বেশি ছিল। ওই পাম্পেও বেশির ভাগ ক্রেতা ট্যাঙ্ক ফুল করে জ্বালানি কিনছেন বলে জানান তিনিও।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আসাদগেটসংলগ্ন তালুকদার ফিলিং স্টেশনে গিয়ে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির ভিড় দেখা যায়। ব্যক্তিগত গাড়ির সারি মূল সড়ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ায় পাম্পকে কেন্দ্র করে সড়কে যানজট সৃষ্টি হচ্ছিল। সেই যানজট নিরসনে কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের তৎপরতা দেখা গেছে। তবে এর প্রায় ৯ মিনিট পরেই ১০টা ৩৪ মিনিটের দিকে কর্মীরা পাম্পের ভেতরে ঢোকার অংশটি বাঁশ দিয়ে বন্ধ করে দেন। সড়কে দাঁড়িয়ে অনবরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা হাত নেড়ে সংকেত দিতে থাকেন পাম্প বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে পাম্প থেকে বেরিয়ে যাওয়ার গেট দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করেন। তালুকদার ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার ইমরান আহমেদ বলেন, এই পাম্পে দৈনিক প্রায় ৪০ হাজার লিটার জ্বালানি তেল আসে এবং বিক্রি করা হয়। মজুত থাকে ২০ হাজার লিটারের কাছাকাছি। কিন্তু ডিপো থেকে গাড়ি আসছে না। মজুত কমে গেছে। পাম্পের রিজার্ভ ট্যাঙ্কে ন্যূনতম ৪০০ লিটার রাখা লাগে। এখন প্রায় এর কাছাকাছি চলে এসেছে। তাই বিক্রি বন্ধ রাখা ছাড়া গতি নেই।

পাম্পটির ব্যবস্থাপক তন্ময় বাড়ৈ বলেন, যদি বিকেলে বা সন্ধ্যায় ডিপো থেকে গাড়ি আসে, তখন আবার বিক্রি করা হবে। তবে বরাদ্দ মাত্র ৪০ শতাংশ দেবে বলেও শুনতে পাচ্ছেন তারা। বেলা পৌনে ১১টার দিকে বিজয় সরণির ট্রাস্ট রিফুয়েলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, ব্যক্তিগত যানবাহনের সারি পাম্পের নির্ধারিত সীমানা ছাড়িয়ে সড়কে অনেক দূর চলে গেছে। সারিতে অপেক্ষমাণ গাড়ির শেষ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, সারির সর্বশেষ প্রান্তের গাড়ি দাঁড়ানো রয়েছে, নাখালপাড়া অংশে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ৪ নম্বর ফটকের বিপরীত পাশে। পাম্প থেকে প্রায় ৩৫০ মিটার দূরের ওই জায়গা পর্যন্ত ৯৭টি গাড়ি অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কালশীর সুমাত্রা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সব ধরনের জ্বালানি তেল ও এলপিজি গ্যাস বিক্রি বন্ধ রেখেছে ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ।