সুসংবাদ প্রতিদিন

স্ট্রবেরি বদলে দিচ্ছে দিনাজপুরের কৃষির চিত্র

প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সিদ্দিক হোসেন, দিনাজপুর

উত্তরের শীতপ্রধান জনপদে এক সময় যেখানে শুধু ধান, গম কিংবা ভুট্টার চাষই ছিল কৃষকদের প্রধান ভরসা, সেখানে এখন লাল রঙের আকর্ষণীয় ফল স্ট্রবেরি বদলে দিচ্ছে চাষাবাদের চিত্র। দিনাজপুরের বিরল উপজেলার রবিপুর গ্রামের বিরল উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি প্রদর্শনী হিসেবে মোঃ আরিফুল ইসলাম ও মো. শাহরিয়ার একর জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করে সাফল্য অর্জন করেছেন এবং কাহারোল উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের কান্তনগর গ্রামের কৃষক মজিবুর রহমান প্রথমবারের মতো ৬৫ শতক জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করে এলাকায় সৃষ্টি করেছেন নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত।

দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ফসল চাষ করলেও প্রত্যাশিত লাভ না হওয়ায় বিকল্প ও উচ্চমূল্যের ফসল চাষের চিন্তা করেন মজিবুর। বাজারে স্ট্রবেরির চাহিদা, পুষ্টিগুণ এবং তুলনামূলক ভালো দাম তাকে এই চাষে আগ্রহী করে তোলে। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, অভিজ্ঞদের পরামর্শ এবং নিজস্ব উদ্যোগে জমি প্রস্তুত করে শুরু করেন স্ট্রবেরি চাষ। চলতি মৌসুমে তিনি দুইটি জাতের স্ট্রবেরি আবাদ করেন বারি স্ট্রবেরি-১ এবং বারি স্ট্রবেরি-২। শীতকালীন আবহাওয়ায় এ জাত দুটি ভালো ফলন দেয় এবং ফলের রং, আকার ও স্বাদের কারণে বাজারে গ্রহণযোগ্যতা বেশি। জমিতে উঁচু বেড তৈরি, সঠিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং জৈব সার প্রয়োগের মাধ্যমে চারা রোপণ করা হয়। চারা লাগানোর প্রায় তিন মাস পর থেকেই গাছে ফল আসতে শুরু করে। নিয়মিত পরিচর্যার ফলে ফলন হয়েছে আশানুরূপ ভালো।

এ পর্যন্ত পাঁচবার স্ট্রবেরি উত্তোলন করা হয়েছে। প্রতিবারই ফলন সন্তোষজনক হওয়ায় কৃষক মজিবুর রহমান আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। তিনি পাইকারি ও খুচরা দুইভাবেই ফল বিক্রি করছেন। পাইকারিতে প্রতি কেজি ৪০০-৪৫০ টাকা এবং খুচরায় ৫০০-৫৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে স্ট্রবেরি। স্থানীয় বাজার ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা সরাসরি বাগানে এসে ফল সংগ্রহ করছেন। এতে বাজারজাতকরণে সুবিধা হচ্ছে এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। কৃষক মজিবুর রহমান জানান, স্ট্রবেরি চাষে ব্যাপক পরিচর্যা প্রয়োজন হয়। নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করা, পরিমিত সেচ দেওয়া, মাটির আর্দ্রতা ঠিক রাখা এবং রোগবালাই দমনে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। জমি প্রস্তুতের সময় তিনি পচা গোবর সার, ভার্মি কম্পোস্ট, কেঁচো সার, বায়োলিডসহ বিভিন্ন ধরনের জৈব কম্পোস্ট ব্যবহার করেছেন। তার মতে, এসব জৈবসার মাটির গঠন উন্নত করে, পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায় এবং গাছকে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করে। এছাড়া মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করলে আগাছা কম জন্মায় এবং মাটির আর্দ্রতা দীর্ঘসময় ধরে বজায় থাকে, ফলে ফলনও ভালো পাওয়া যায়।

কৃষকের ছেলে দেলোয়ার হোসেন দুলাল এই উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করছেন। তার মতে, এ অঞ্চলে স্ট্রবেরি খুব একটা চাষ করা হয় না, অথচ ফলটির চাহিদা ব্যাপক। বাজারে উচ্চমূল্য ও পুষ্টিগুণ বিবেচনায় তারা সাহস করে চাষ শুরু করেছেন এবং প্রথম বছরেই ভালো ফলন পেয়ে ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ জাহিদুর রহমান জানান, দিনাজপুর অঞ্চলের মাটি ও শীতকালীন আবহাওয়া স্ট্রবেরি চাষের জন্য উপযোগী। তবে ফলটি সংবেদনশীল হওয়ায় সঠিক পরিচর্যা ও দ্রুত বাজারজাতকরণ জরুরি। পরিকল্পিত চাষ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে স্ট্রবেরি স্থানীয় কৃষিতে একটি সম্ভাবনাময় উচ্চমূল্যের ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

কান্তনগর গ্রামের এই স্ট্রবেরি বাগান এখন অনেকের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয় কৃষকেরা বাগান পরিদর্শন করছেন এবং বিকল্প ফসল হিসেবে স্ট্রবেরি চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কৃষক মজিবুর রহমানের উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, সঠিক পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও আধুনিক কৃষি ভাবনা থাকলে গ্রামবাংলার মাটিতেই গড়ে উঠতে পারে লাভজনক ও সম্ভাবনাময় কৃষি অর্থনীতি।

এক সাক্ষাৎকারে দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মোঃ আফজাল হোসেন বলেন দিনাজপুর জেলার বিরল ও কাহারোল উপজেলায় তিন একর জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করা হয়েছে। আগামীতে যেন আরও বেশি জমিতে স্ট্রবেরি চাষ হয সে আলোকে দিনাজপুর জেলার ১৩টি উপজেলার কৃষি কর্মকর্তারা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।