বিশ্ববাজারে হু হু করে বাড়ছে তেলের দাম
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েই চলেছে। সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ না থাকায় বাজারে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্টের দাম গতকাল সোমবারও ছিল ঊর্ধ্বমুখী। গত রোববার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম তিন শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৬ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। গতকাল সোমবার কিছুটা কমলেও বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৪ দশমিক ৬৩ ডলারে লেনদেন হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এ পর্যন্ত ৪০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা জাগিয়ে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকতে পারে- এমন আশঙ্কা থেকেই বাজারে তেলের দাম বাড়ছে।
ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার জেরে ইরান এই নৌপথটি কার্যত অচল করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ) একে ইতিহাসের বৃহত্তম ‘জ্বালানি সরবরাহ বিপর্যয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও)-এর তথ্যমতে, আগে প্রতিদিন গড়ে ১৩৮টি জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করত। বর্তমানে প্রতিদিন পাঁচটির বেশি জাহাজ চলাচল করতে পারছে না। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬টি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী ফের সচল করতে মিত্র দেশগুলোর প্রতি সামরিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে চীন, জাপান, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর কাছ থেকে এখনো কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ওই অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
এ প্রসঙ্গে ‘দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, যদি তার এই প্রস্তাবে সাড়া না পাওয়া যায়, তবে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ‘খুবই খারাপ’ হতে পারে।
প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালী পার করানোর কথাও বলেছেন ট্রাম্প। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা আরও দুর্বল না হওয়া পর্যন্ত সেখানে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হবে না।
এবার হরমুজ প্রণালী নিরাপদ করতে চীনের সহায়তা চাইছেন ট্রাম্প : ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার আসন্ন বৈঠক নিয়ে কথা বলেছেন। ট্রাম্প আশা করছেন, বৈঠকের আগেই চীন হরমুজ প্রণালী আবার চালু করতে সহায়তা করবে। তার ভাষায়, চীন তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল সংগ্রহে এই হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে থাকে। চলতি মাসের শেষের দিকে অর্থাৎ মার্চেই বেইজিংয়ে এই বৈঠক হওয়ার কথা। তবে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ওই বৈঠকের আগেই এ বিষয়ে চীনের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ দেখতে চান। তার মতে, দুই সপ্তাহ অনেক দীর্ঘ সময়। তিনি আরও জানান, এই সফর পিছিয়েও যেতে পারে, যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চীনের কাছে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান এমন সময়ে এলো, যখন তেহরানের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকায় বেইজিংয়ের হয়তো নিজেদের তেলবাহী জাহাজ পার করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো জোটের প্রয়োজন নাও হতে পারে।
এর আগে ভারতও জানিয়েছে, তেহরানের সঙ্গে এক সমঝোতার মাধ্যমে তাদের দুটি তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হওয়ার অনুমতি পেয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, যে দেশগুলো হরমুজ প্রণালী থেকে সুবিধা পায়, তাদের এখন স্বাভাবিকভাবেই এই প্রণালী আবার চালু করতে সহায়তা করা উচিত। কারণ তার মতে, ইউরোপ ও চীন পারস্য উপসাগর দিয়ে আসা তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি অন্য দেশগুলো এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে ন্যাটোর ভবিষ্যতের জন্য তা খুবই খারাপ হবে। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র তার ইউরোপিয়ান মিত্রদের প্রতি খুবই সহানুভূতিশীল। ট্রাম্প আরও বলেন, ইউক্রেনকে সাহায্য করা আমাদের বাধ্যতামূলক ছিল না। ইউক্রেন আমাদের থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে। তবুও আমরা তাদের সাহায্য করেছি।
তিনি বলেন, এখন দেখার পালা যে তারা আমাদের সাহায্য করে কি না। কারণ আমি অনেক দিন ধরেই বলছি, আমরা তাদের জন্য থাকি, কিন্তু তারা আমাদের জন্য থাকে না। সত্যি বলতে আমি নিশ্চিত নই যে, তারা সত্যিই আমাদের পাশে আছে কি না।
এর একদিন আগে চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যকে ট্রাম্প আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দিতে এই যৌথ উদ্যোগে অংশ নেয়। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত তেল পরিবহন পথ। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বারবার হুমকি দিয়েছে যে, তারা কোনো তেলবাহী জাহাজকে এই প্রণালী দিয়ে যেতে দেবে না। এরই মধ্যে কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলাও করা হয়েছে।
