৩ লাখ টন ডিজেল কেনায় নীতিগত অনুমোদন

প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে উদ্ভূত অস্থিতিশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ৩ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা করেছে সরকার। এই ডিজেল আমদানি করতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তিনটি প্রস্তাবের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। গতকাল বুধবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে এসব প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ আন্তর্জাতিক উৎস থেকে মোট ৩ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি করবে। এর মধ্যে- ইয়ার এনার্জির (এজি) কাছ থেকে এক লাখ মেট্রিক টন ইএন ৫৯০-১০ পিপিএম ডিজেল, কে অ্যান্ড আর ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং কোম্পানির কাছ থেকে এক লাখ মেট্রিক টন ১০-৫০ পিপিএম ডিজেল এবং এম/এস সিকদার ইন্টারন্যাশনালের কাছ থেকে এক লাখ মেট্রিক টন ইএন৫৯০-১০ পিপিএম মাত্রার সালফারযুক্ত ডিজেল কেনার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সবগুলো আমদানিই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।

এর আগে, গত ৪ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে এক লাখ মেট্রিক টন ডিজেল এবং ২ কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই বৈঠকে কাজাখস্তানভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কাজাখ গ্যাস প্রসেসিং প্ল্যান্ট এলএলপি থেকে- এক লাখ মেট্রিক টন ৫০ পিপিএম সালফার মানের ডিজেল সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে মোট ব্যয় ধরা হয় ৫ কোটি ৫৯ লাখ ৯৪ হাজার ৭৬০ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৬৮৯ কোটি ২৯ লাখ ৫৪ হাজার ৯৫৬ টাকা।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম অ্যাক্ট, ১৯৭৪ এবং পেট্রোলিয়াম আইন, ২০১৬ অনুযায়ী দেশে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের আমদানি, মজুত, প্রক্রিয়াকরণ ও বিতরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। ২০১৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিপিসি ৫০ শতাংশ জ্বালানি তেল সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) পদ্ধতিতে এবং বাকি ৫০ শতাংশ আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে আমদানি করে আসছে।

বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের বড় অংশই আমদানিনির্ভর। বিপিসি বিভিন্ন গ্রেডের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পাশাপাশি অপরিশোধিত তেল আমদানি করে ইস্টার্ন রিফাইনারী পিএলসিতে পরিশোধন করে থাকে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য, প্রিমিয়াম ও পরিবহন খরচে অস্বাভাবিক অস্থিরতা দেখা দেয়। পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক রপ্তানিকারক দেশ সরবরাহ সীমিত করে।

একই সময়ে কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় ইউরোপে গ্যাসের দাম বেড়ে যায় এবং বিকল্প হিসেবে তরল জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধি পায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ও মূল্যচাপ আরও বাড়ে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জ্বালানি রেশনিং, ভর্তুকি ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বাংলাদেশও একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে।

এদিকে বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে বিপিসির বিদ্যমান চুক্তিবদ্ধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত সময় অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহে সমস্যায় পড়েছে। এরইমধ্যে ইউনিপেক সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেড এবং পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কোম্পানি লিমিটেড চলতি বছরের এপ্রিল মাসের কিছু পার্সেল সরবরাহে অপারগতা জানিয়ে ফোর্স মেজর ঘোষণা করেছে। ফলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে ঝুঁকি তৈরি হয়।

এই প্রেক্ষাপটে জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬-এর ধারা ৬৮(১) এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণের সুযোগ রয়েছে।