সুসংবাদ প্রতিদিন
জাজিরায় মসলা চাষে বদলে যাচ্ছে কৃষিচিত্র
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
এসএম মজিবুর রহমান, শরীয়তপুর

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় দিন দিন বাড়ছে উচ্চমূল্যের মসলা ফসলের আবাদ। কৃষকরা ধান, পাট বা অন্যান্য প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি এখন পেঁয়াজ, রসুনসহ মসলা ফসলের আবাদ করছেন। তবে তুলনামূলক কম ঝুঁকি, ভালো দাম এবং সংরক্ষণ সুবিধা এই তিনটি ইতিবাচক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে ধনিয়া ও কালোজিরা চাষে বেশি ঝুঁকছেন।
জাজিরার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের পলিযুক্ত উর্বর বালুমাটি ধনিয়া ও কালোজিরা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। মাটির গঠন, পর্যাপ্ত রোদ এবং উপযুক্ত আবহাওয়া মিলিয়ে এই এলাকায় মসলাজাতীয় ফসলের ফলন বেশ ভালো হয়। ফলে কৃষকরা কম খরচে বেশি লাভের আশায় ধীরে ধীরে তাদের জমির একটি বড় অংশ এসব ফসলের আওতায় নিয়ে আসছেন। এছাড়াও পেঁয়াজ ও রসুনেরও আবাদ হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও কৃষকদের সঙ্গে সরেজমিন কথা বলে জানা গেছে, ধনিয়া ও কালোজিরা চাষে রোগবালাই তুলনামূলক কম হয়। অন্যান্য ফসলের মতো অতিরিক্ত কীটনাশক বা পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। এতে তুলনামূলক উৎপাদন খরচ কমে লাভের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এছাড়া এই ফসলগুলো সহজে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় বলে কৃষকেরা বাজারে দাম অনুকূলে এলে বিক্রি করতে পারেন। এতে লোকসানের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে। কালোজিরা আবাদে কৃষকের বিঘাপ্রতি খরচ হয় ২৫ হাজার থেকে ২৬ হাজার টাকা। ফলন ভালো হলে বিক্রি হয় ৫২ হাজার থেকে ৫৪ হাজার টাকা। অপর দিকে ধনিয়া আবাদে কৃষকের বিঘাপ্রতি খরচ হয় ১৮ হাজার থেকে ১৯ হাজার টাকা। বিক্রি হয় ৪০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। উপজেলার কুন্ডেরচর ইউনিয়নের কৃষক হামেদ খাঁ জানান, আগে আমরা মূলত ধানচাষ করতাম। কিন্তু ধানের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবং বাজারমূল্যের অনিশ্চয়তার কারণে অনেক সময় লোকসান গুনতে হতো। এখন ধনিয়া ও কালোজিরা চাষ করে তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হচ্ছি। মসলা ফসল চাষে তুলনামূলক খরচ কম হয়। সংরক্ষণ করে সুবিধাজনক সময়ে বিক্রি করা যায় বলে লোকজসানের ঝুঁকিও কমে যায়। এবার আমি সাড়ে তিন বিঘা জমিতে কালোজিরা ও দুই বিঘা জমিতে ধনিয়া আবাদ করেছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। কোন দুর্যোগ ছাড়া যদি ফলন ঘরে তুলতে পারি, তবে বেশ লাভবান হওয়ার আশা করছি।
একই উপজেলার পৌরসভার ফকির মাহমুদ আকনকান্দি গ্রামের কৃষক দীল মোহাম্মদ মাদবর বলেন, কৃষি বিভাগের অনুপ্রেরণায় গত ৭-৮ বছর ধরে মসলা ফসলের আবাদ করছি। কৃষি বিভাগের প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ে পরামর্শের ফলে আগের তুলনায় বেশি লাভবান হচ্ছি। ৪-৫ বছর ধরে জমিতে মৌ-বাক্স স্থাপনের মাধ্যমে এখন আগের তুলনায় ফলনও বৃদ্ধি পেয়েছে।
জাজিরা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক জানান, উচ্চমূল্যের এই মসলা ফসলের আবাদ বাড়াতে কৃষি বিভাগ বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, উন্নত বীজ সরবরাহ এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে তাদের সহায়তা করা হচ্ছে। আমরা চাই কৃষকেরা যেন কম খরচে বেশি লাভবান হন। সে লক্ষ্যে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ সুবিধা সম্পন্ন ধনিয়া ও কালোজিরা চাষে তাদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। মসলা ফসলের ফলন বাড়াতে জমিতে মৌমাছির পরাগায়নের মাধ্যমে ধনিয়া ও কালোজিরার ফুল থেকে বেশি পরিমাণে বীজ উৎপাদন সম্ভব হয়। ফলে একদিকে যেমন ফলন বাড়ে, অন্যদিকে মধু উৎপাদনের মাধ্যমেও অতিরিক্ত আয় করা যায়। এতে কৃষকের আয়ের উৎস আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে।
জাজিরা উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জাজিরা উপজেলায় প্রায় ২ হাজার ৩শ’ ৯৩ হেক্টর জমিতে ধনিয়া এবং ১ হাজার ১শ’ ৫০ হেক্টর জমিতে কালোজিরার আবাদ হয়েছে। যা গত কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্থানীয় বাজারেও এই ফসলের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। জাজিরার মসলা ফসলকে কেন্দ্র করে কাজিরহাটে গড়ে উঠেছে এ অঞ্চলের সবচাইতে বড় ধনিয়া ও কালোজিরার পাইকারি হাট। ব্যবসায়ীরা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধনিয়া ও কালোজিরা সংগ্রহ করার ফলে কৃষকেরাও ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এসব মসলা সরবরাহ করা হচ্ছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে।
