সুসংবাদ প্রতিদিন
চরফ্যাশনে জৈব সারে তরমুজের উৎপাদন বেড়েছে
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নুর উল্লাহ আরিফ, চরফ্যাশন (ভোলা)

ভোলার চরফ্যাশনে জৈব পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করে সাফল্যের মুখ দেখছেন কৃষকরা। কম খরচ, বেশি ফলন এবং উন্নত স্বাদের কারণে এ পদ্ধতি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। চরফ্যাশন উপজেলার আবুবকরপুর ইউনিয়নের কৃষক ইসমাইল মাঝি বলেন, আগে রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহার করে তরমুজ চাষে লাভ হতো না। এবার জৈব পদ্ধতিতে চাষ করে খরচ কমেছে, ফলনও বেড়েছে।
তিনি জানান, আড়াই একর জমিতে তরমুজ আবাদ করে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় দুই লাখ টাকা লাভ করেছেন। শুধু ইসমাইল মাঝি নন, উপজেলার অনেক কৃষকই এবার জৈব সার ও জৈব বালাইনাশকের দিকে ঝুঁকেছেন। তাদের মতে, এতে কীটনাশকের খরচ কমে, মাটির গুণাগুণ ঠিক থাকে এবং তরমুজের আকার ও স্বাদ দুটোই উন্নত হয়। ফলে বাজারেও ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে।
দক্ষিণাঞ্চলের খরা ও লবণাক্ততার সঙ্গে লড়াই করেও চরফ্যাশনের মাঠজুড়ে এখন তরমুজের সমারোহ। সবুজ লতায় ভরপুর মাঠে পাকা তরমুজ যেন এক নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। ভোর থেকেই শুরু হয় তরমুজ সংগ্রহের কাজ। শ্রমিকরা দলবেঁধে মাঠে কাজ করেন- কেউ বাছাই, কেউ পরিবহন কাজে ব্যস্ত।
বর্তমানে পাইকাররা সরাসরি মাঠে এসে তরমুজ কিনে নিচ্ছেন। নদীপথে লঞ্চ ও কার্গোযোগে এসব তরমুজ যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। এতে কৃষকদের সময় ও পরিবহন খরচ দুটোই কমছে। তরমুজ মৌসুমকে ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এসেছে গতি। দিনমজুর, নারী ও কিশোররা বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়ে আয় করছেন। গ্রামজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ, বসেছে অস্থায়ী বাজার। চরফ্যাশন উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর প্রায় ১২ হাজার ৮৭৫ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। চরকলমী, মুজিবনগর, নজরুলনগর, নীলকমল, নুরাবাদ, আবুবকরপুর ও আহম্মদপুর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় এর বিস্তৃতি রয়েছে। চাষ হয়েছে গ্লোরি, হাইব্রিড, ড্রাগন, থাই সুপার, সাইকিং, বেঙ্গল কিংসহ বিভিন্ন জাতের তরমুজ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার ও হর্টিকালচার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৪০ একর জমিতে জৈব পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করা হয়েছে। গত বছরের লোকসানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার কৃষকরা জৈব পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। তরমুজ চাষি আজিজুর রহমান বলেন, আগে ভাবতাম বেশি ওষুধ দিলে ফলন ভালো হয়। এখন বুঝি, সঠিক পদ্ধতিতে কম খরচেই বেশি লাভ সম্ভব। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা জানান, তরমুজ চাষে সাফল্যের কারণে অনেক কৃষক ধান চাষ ছেড়ে এদিকে ঝুঁকছেন। জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত তরমুজের ওজন সাধারণত ৩ থেকে ৫ কেজি হয় এবং এর স্বাদ ও গুণগত মান ভালো হওয়ায় বাজারমূল্যও বেশি পাওয়া যায়। প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি, সুষম সার ব্যবহার ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ বছর বাম্পার ফলন হয়েছে। ভবিষ্যতে চরফ্যাশনে একটি হর্টিকালচার সেন্টার ও টিস্যু কালচার ল্যাব স্থাপন করা হলে কৃষকরা আরও উন্নতমানের চারা ও প্রযুক্তি সহায়তা পাবেন। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, জৈব পদ্ধতি, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের সমন্বয় উপকূলীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে জৈব উপকরণের সহজলভ্যতা, প্রশিক্ষণ এবং উন্নত বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
