ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

‘অনুসন্ধানের বদলে মুনাফায় ঝুঁকলে সাংবাদিকতার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে’

‘অনুসন্ধানের বদলে মুনাফায় ঝুঁকলে সাংবাদিকতার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে’

পাকিস্তানের সংবাদপত্র ডনের সম্পাদক জাফর আব্বাস বলেছেন, বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তান—সবখানেই অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এখন অনুসন্ধানের বদলে মুনাফার দিকে ঝুঁকছে। এই প্রবণতা সাংবাদিকতার অস্তিত্বকে বিপন্ন করবে। গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এর প্রথম সেশনে জাফর আব্বাস এ কথা বলেন। দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক এই কনফারেন্সের আয়োজক মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)।

নিজের সম্পাদিত পত্রিকার অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে জাফর আব্বাস বলেন, ডন অনেক বড় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছে। তার জন্য পত্রিকাটিকে মাশুলও গুনতে হয়েছে। পাকিস্তানের অন্যতম একজন সাহসী সাংবাদিক এক বড় আবাসন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে একের পর এক প্রতিবেদন করেছিলেন। এর জবাবে সেই ব্যবসায়ী অন্য সব পত্রিকায় ডনের বিরুদ্ধে পূর্ণ পাতার বিজ্ঞাপন দেন। দুঃখজনকভাবে, অন্য পত্রিকাগুলো অর্থের লোভে সেই বিজ্ঞাপন ছাপাতে রাজি হয়ে যায়।

আলোচনায় গণমাধ্যমের স্বআরোপিত নিয়ন্ত্রণ (সেলফ-সেন্সর) প্রসঙ্গও উঠে আসে। জাফর আব্বাস বলেন, প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের চেয়ে ‘সেলফ-সেন্সর’ অনেক বেশি বিপজ্জনক। প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ থাকলে জনগণের সামনে বলা যায় যে সামরিক শাসন বা কর্তৃত্ববাদী শাসকের কারণে কিছু প্রকাশ করা যাচ্ছে না। কিন্তু ‘সেলফ-সেন্সর’-এর ক্ষেত্রে জনগণকে এটুকুও বলার উপায় থাকে না যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন আছে, অথচ প্রকাশ করা হচ্ছে না। এই অদৃশ্য চাপই সবচেয়ে কঠিন সমস্যা।

গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা যদি ‘সেলফ-সেন্সর’-এ অভ্যস্ত হয়ে পড়েন, তাহলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা টিকে থাকতে পারবে না বলে মন্তব্য করেন জাফর আব্বাস। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কারণ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মূল কাজই হলো বেসরকারি খাত বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি উন্মোচন করা। এই প্রবণতা ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ বহু দেশে চলতে থাকলে সাংবাদিকতার জন্য তা হবে এক ভয়ংকর পরিণতি।

কানডার গণমাধ্যম টরন্টো স্টারের সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতা। গভীর বিশ্লেষণ, মন্তব্যের পাশাপাশি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাই একটি সংবাদকক্ষকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে তোলে। এ ধরনের প্রতিবেদন করতে শুধু সাংবাদিকের সাহস নয়; সম্পাদক, মালিক ও আইনজীবীর অটল সমর্থনও দরকার। কারণ, বড় অনুসন্ধান কখনো একার কাজ নয়।

মাইকেল কুক বলেন, সাংবাদিকেরা গণতন্ত্রের পক্ষে এবং দুর্নীতি ও গোপনীয়তার বিরুদ্ধে কাজ করেন। গণতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও তাঁদের সম্পাদকেরা সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে লড়াই করে যাচ্ছেন।

সরকারগুলোর পতনের অন্যতম কারণ স্বাধীন গণমাধ্যমকে বিকশিত হতে না দেওয়া -মাহফুজ আনাম : সরকারের নিজেদের সাফল্যের জন্যই স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রয়োজন বলে মনে করেন দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তিনি বলেছেন, বিগত সরকারগুলোর পতনের অন্যতম কারণ ছিল স্বাধীন গণমাধ্যমকে বিকশিত হতে না দেওয়া। গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এর প্রথম সেশনে মাহফুজ আনাম এ কথা বলেন। দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক এই কনফারেন্সের আয়োজক মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)।

প্রথম সেশনের মূল আলোচিত বিষয় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। মাহফুজ আনাম বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মধ্যেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিহিত। তবে দেশে অতীতে যথেষ্ট পরিমাণে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হয়নি। বর্তমানেও হচ্ছে না। আর ভবিষ্যতেও হবে কি না, তা নির্ভর করছে সম্পাদকদের ভূমিকার ওপর।

মাহফুজ আনাম আরও বলেন, ‘রাইজ অব এডিটোরিয়াল ইনস্টিটিউশন এবং ইনডিপেনডেন্ট জার্নালিজমই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পূর্বশর্ত। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সম্পাদকেরা সেই মানে পৌঁছাতে পারছেন না।’

সাংবাদিকতাকে রাজনৈতিকীকরণ করা হয়েছে উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আমরা যারা সাংবাদিকতা করি, আমরা পেশাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছি না বলে আমার ধারণা। আমরা খুব সহজেই সাংবাদিকতা করতে করতে রাজনীতির মধ্যে ঢুকে যাই। আমরা দেখেছি যে একটা শাসনকাল যখন থাকে, তখন একদল সাংবাদিক যারা সেই শাসনের পক্ষে থাকে। তারা নেতৃত্বের মধ্যে থাকে। আর অন্য দলের সাংবাদিকেরা চুপি চুপি ঘুরে বেড়ায় এবং তাদের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে থাকে। আবার শাসন যখন বদলায়, তখন সাংবাদিকদের নেতৃত্ব বদলে যায়।’

মাহফুজ আনাম আরও বলেন, রাজনীতির পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার একটা বড় প্রভাব রয়েছে। উন্নতি করতে হলে ক্ষমতার লড়াই, দুর্নীতির লড়াই এবং সরকারি তহবিল ও সম্পদের অপব্যবহার রুখতে হবে। শুধু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমেই ক্ষমতাকে দায়বদ্ধ করা যায়। একমাত্র অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাই সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে এবং সমাজে জবাবদিহি আনতে পারে। এটা গণতন্ত্রের বিকাশের প্রাণকেন্দ্র এবং এ মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য এটা অত্যন্ত জরুরি।

এ সেশনে আলোচক হিসেবে ছিলেন পাকিস্তানের ডন পত্রিকার সম্পাদক জাফর আব্বাস, টরন্টো স্টারের সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক, যমুনা টেলিভিশনের সিইও ফাহিম আহমেদ। সেশনটি পরিচালনা করেন বিবিসির সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত