
সীমান্ত সুরক্ষা, অপরাধ দমন, চোরাচালান, সন্ত্রাস, মাদক ও নারী-শিশু পাচার রোধ এবং অনুপ্রবেশ বন্ধে কঠোর নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। দেশের ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে দেশের সীমান্ত সুরক্ষা ও অপরাধ দমনে কাজ করছে বিজিবি। এ ছাড়া সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমনে বিজিবি ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করছে।
এ বিষয়ে বিজিবি সদর দপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব মুর্শেদ রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অপরাধ দমনে অপরাধীদের আটক করে আইনের আওতায় আনা, সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, বিএসএফের সঙ্গে নিয়মিত পতাকা বৈঠক ও যৌথ টহলের মাধ্যমে সীমান্ত এলাকার সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে বিজিবি কাজ করছে। এ ছাড়া বিশেষ পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় উদ্ধারকাজেও অংশ নিচ্ছেন বিজিবির সদস্যরা।
তিনি বলেন, বিজিবি সীমান্তে রাডার, থার্মাল ক্যামেরা এবং হাই-স্পিড বোট ব্যবহার করে নজরদারি জোরদার করছে। বিজিবি জওয়ানরা প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, নদীমাতৃক জনপদ এবং সুন্দরবনের মতো গহিন বনাঞ্চলেও অক্লান্ত পরিশ্রম করে দায়িত্ব পালন করছেন। সীমান্তের সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে পর্যবেক্ষণ চৌকি স্থাপন এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, দেশের সীমান্ত অপরাধ দমনে বিজিবি ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতা আরো জোরদার করতে হবে।
তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকায় কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। সীমান্ত অপরাধের সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটদের আইনের আওতায় আনতে হবে। যেসব সীমান্ত দিয়ে অপরাধ হয়, তা চিহ্নিত করে প্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে ব্যবস্থা নিতে হবে। মাহবুব মুর্শেদ রহমান বলেন, বিজিবি অবজারভেশন পোস্ট (বিওপি) পরিচালনা এবং স্মার্ট ডিজিটাল সার্ভিলেন্স সিস্টেম ব্যবহার করার মাধ্যমে সীমান্তে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল ও অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমরা সীমান্তের প্রতিটি ইঞ্চি জমিকে নিজেদের সন্তানের মতো রক্ষা করি। সীমান্ত পিলার সংরক্ষণ, অবৈধ স্থাপনা প্রতিরোধ এবং ভূমি দখলের যেকোনো অপচেষ্টা প্রতিহত করা বিজিবির পবিত্র দায়িত্ব। এদিকে বিজিবি থেকে বলা হয়েছে, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিজিবিকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে। জনবল বৃদ্ধি, নতুন ব্যাটালিয়ন গঠন, বিওপি সম্প্রসারণ এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া বিজিবিকে আরো উন্নত ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে এর সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জওয়ানদের অস্ত্র চালনা, শারীরিক যোগ্যতা, বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা ও মানবাধিকার বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচন, স্থানীয় নির্বাচন, বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব, দুর্গাপূজা, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা এবং অন্যান্য জাতীয় কর্মসূচিতে বিজিবি জওয়ানরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিযুক্ত রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা ভূমিধসের সময় বিজিবির সদস্যরা দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ায়। ত্রাণ বিতরণ, উদ্ধার তৎপরতা ও পুনর্বাসনকাজে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে। সীমান্তবর্তী দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পেইন, শিক্ষা সহায়তা এবং অসচ্ছল পরিবারের কন্যাদের বিবাহে সহযোগিতার মতো জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি নিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশের সীমান্তে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা থাকা জরুরি। এ ব্যাপারে কোনো সংকট থাকলে তা সমাধান করতে হবে। সীমান্তে বিজিবির টহল ও অভিযান জোরদার এবং সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। তিনি বলেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ যাতায়াত বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে বিজিবি সদস্যদের আরো উন্নত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
বিজিবি সূত্র জানায়, গত ৬ মাসে দেশব্যাপী চোরাচালানবিরোধী অভিযান চালিয়ে বিজিবি ১ হাজার ৫৩৪ কোটি ৮৬ লাখ ৬৫ হাজার ৮৯ টাকা মূল্যের চোরাই পণ্য জব্দ করেছে। অভিযানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মূল্যবান ধাতু ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া গত ৬ মাসে বিজিবি অভিযান চালিয়ে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য জব্দ করেছে।