মার্কিন হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ছড়িয়ে পড়বে যুদ্ধ

* আমরা খুব দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে যাচ্ছি : ট্রাম্প * ফের যুদ্ধ হলে ‘আরও চমক’ দেখবে বিশ্ব : ইরানের হুঁশিয়ারি * ফের হামলা হলে যুদ্ধ ‘মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়বে’: আইআরজিসি * ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা কমাতে ফের সিনেটে উদ্যোগ * তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতেই ট্রাম্পের সুর নরম * আহমেদিনেজাদকে নিয়ে গোপন পরিকল্পনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল

প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ খুব দ্রুত শেষ হবে বলে তিনি আশা করছেন। হোয়াইট হাউজে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, আমরা খুব দ্রুত এই যুদ্ধ শেষ করতে যাচ্ছি। ট্রাম্প দাবি করেন, তারা (ইরান) খুব খারাপভাবে একটি চুক্তি করতে চায়। তারা এই পরিস্থিতিতে ক্লান্ত। তিনি আরও বলেন, তাদের মাথায় পারমাণবিক অস্ত্রের চিন্তা রয়েছে, আর আমরা তাদের কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দেবো না। মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষায়, আমরা দারুণ কাজ করেছি। আমার মনে হয়, খুব দ্রুতই সব শেষ হয়ে যাবে। তারা পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না এবং আশা করি বিষয়টি খুব সুন্দরভাবেই সমাধান হবে। এদিকে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন সময় এলো, যখন রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত মার্কিন সিনেট গত মঙ্গলবার একটি ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলেশন’ এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে। প্রস্তাবটি অনুযায়ী, কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে।

ফের যুদ্ধ হলে ‘আরও চমক’ দেখবে বিশ্ব, ইরানের হুঁশিয়ারি : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে ইরান এবং ভবিষ্যতে আবার যুদ্ধ শুরু হলে আরও অনেক চমক অপেক্ষা করছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্য এমন সময় এলো, যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে চুক্তিতে পৌঁছাতে দুই থেকে তিন দিন সময় দিয়েছেন। এদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচনায় অনেক অগ্রগতি হয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের হামলায় দক্ষিণ লেবাননে অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। গত ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলি হামলায় মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪২ জনে। এছাড়া, গাজাগামী ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র আরও একটি নৌযান আটক করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত ৬১টি নৌযান আটক করা হলো। যুক্তরাষ্ট্র ফের হামলা চালালে যুদ্ধ ‘মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়বে’-আইআরজিসি : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ফের ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ অঞ্চলটির বাইরেও ছড়িয়ে পড়বে বলে গতকাল বুধবার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। আইআরজিসি তাদের ‘ওয়েবসাইট সেপাহ নিউজে’ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ইরানের বিরুদ্ধে ফের আগ্রাসন চালানো হলে, প্রতিশ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধ এবার অঞ্চলটির অনেক বাইরেও ছড়িয়ে পড়বে। আমাদের ধ্বংসাত্মক হামলা আপনাদের গুঁড়িয়ে দেবে।’ তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামনের কয়েক দিনের মধ্যে স্থায়ী সমাধানে কোনো চুক্তি না হলে, ইরানে আবারও হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর, এ সতর্কবার্তা দিল রেভল্যুশনারি গার্ড।

দুই পক্ষই যুদ্ধ বন্ধে প্রস্তাব বিনিময়ের পাশাপাশি পরস্পরের বিরুদ্ধে হুমকি বাড়িয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এ যুদ্ধে ৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। আইআরজিসি বলেছে, ‘আমেরিকান-জায়নবাদী শত্রুকে জানতে হবে যে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল দুই সেনাবাহিনীর পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করে আমাদের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হলেও, আমরা এখনও ইসলামী বিপ্লবের পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করিনি।’

প্রায় ৪০ দিনের এই যুদ্ধে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ নেতারা নিহত হন। এর জবাবে তেহরান অঞ্চলজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। গত মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, সমঝোতা না হলে, কয়েক দিনের মধ্যেই আবার হামলা শুরু হতে পারে। এর একদিন আগে তিনি বলেন, উপসাগরীয় আরব নেতারা শেষ মুহূর্তে তাকে হামলা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেছিলেন।

ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা কমাতে ফের সিনেটে উদ্যোগ : মার্কিন সিনেট এমন একটি ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলেশন’ এগিয়ে নিয়েছে, যা পাস হলে ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে পারবেন না। প্রস্তাবটি এগিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াগত ভোটে ৫০-৪৭ ব্যবধানে অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটরও ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দেন, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য বিরল রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সংঘাত না থামায় রিপাবলিকানদের একটি অংশ ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে।

ভোটের আগে ডেমোক্র্যাট সিনেট নেতা চাক শুমার বলেন, এই প্রেসিডেন্ট যেন লোড করা বন্দুক হাতে থাকা এক শিশুর মতো আচরণ করছেন। তিনি আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত থেকে সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে আমাদের প্রস্তাব সমর্থনের এটাই সঠিক সময়।

আল জাজিরার প্রতিবেদন- তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতেই ট্রাম্পের সুর নরম : লাগাতর হুমকির পর হুট করেই ইরানের সঙ্গে আলোচনার কথা বলছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফোয়াদ ইজাদির মতে, তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এই কৌশল নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইজাদি বলেছেন, ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য আন্তর্জাতিক তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ ‘খুব দ্রুত’ শেষ হবে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমেছে। তবে অপরিশোধিত তেলের দাম এখনও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে রয়েছে। ইজাদি বলেন, ইরান যুদ্ধ মার্কিন জনগণ পছন্দ করছে না। কারণ এই যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি জ্বালানি বাজারে পড়ছে এবং সাধারণ আমেরিকানদের গ্যাস স্টেশনে বাড়তি মূল্য দিতে হচ্ছে। আমেরিকানরা শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের খরচ দিচ্ছে না, তারা গ্যাস স্টেশনেও এই যুদ্ধের মূল্য দিচ্ছে।

আহমেদিনেজাদকে নিয়ে গোপন পরিকল্পনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার পর দেশটিতে নেতৃত্ব পরিবর্তনের পরিকল্পনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। সেই পরিকল্পনায় সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে নতুন নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে। ইসরাইলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি ও শীর্ষ কর্মকর্তারা যুদ্ধের শুরুর দিকেই নিহত হওয়ার কয়েক দিন পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন, ইরানের ক্ষমতা যদি ‘ভেতরের কেউ’ গ্রহণ করত, তাহলে সেটাই সবচেয়ে ভালো হতো। পরে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর সময় এক নির্দিষ্ট ও বিস্ময়কর ব্যক্তিত্বকে সামনে রেখে পরিকল্পনা করেছিল। তিনি আর কেউই নন- ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদ। তিনি কঠোর ইসরায়েলবিরোধী ও আমেরিকাবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইসরায়েলিদের তৈরি সেই সাহসী পরিকল্পনা খুব দ্রুতই ভেঙে পড়ে। কর্মকর্তারা বলেন, পরিকল্পনা সম্পর্কে আহমাদিনেজাদকেও অবহিত করা হয়েছিল। তবে তিনি কী সাড়া দিয়েছিলেন, সেই বিষয়ে কিছু জানা যায়নি।

তাদের এবং আহমাদিনেজাদের এক সহযোগীর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের প্রথম দিনেই তেহরানে তার বাড়িতে একটি ইসরায়েলি হামলায় আহমাদিনেজাদ আহত হন। হামলাটি তাকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যেই চালানো হয়েছিল। এরপর থেকে তাকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি এবং তার বর্তমান অবস্থানও অজানা।