
ষড়ঋতুর এই বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা এখন বেশ স্পষ্ট। যখন যে ফসলের মৌসুম, তখন মিলছে না অনুকূল আবহাওয়া। তবে প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নতুন সম্ভাবনার গল্প লিখছেন কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার এক লড়াকু কৃষক। অসময়ে, অর্থাৎ তীব্র গরম আর বর্ষার মাঝে গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষ করে এলাকায় রীতিমতো সাড়া ফেলেছেন তিনি। প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে লোকসানের শঙ্কা উড়িয়ে এখন লাভের মুখ দেখার অপেক্ষায় দিন গুনছেন এই প্রান্তিক চাষি।
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার ছায়কোট গ্রামের কৃষক মনির হোসেন। পেশাগত জীবনে চাষাবাদই তার প্রধান অবলম্বন। প্রথাগত চাষের বাইরে গিয়ে একটু ভিন্ন কিছু করার তাড়না থেকেই তিনি বেছে নেন গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষ। নিজের ২৪ শতাংশ জমিতে এই অসময়ের সবজি চাষের সিদ্ধান্ত নেন মনির। শীতের সবজি গরমে চাষ করা মোটেও সহজ কোনো কাজ ছিল না। তবে এই কঠিন যাত্রায় তার পাশে এসে দাঁড়ায় স্থানীয় কৃষি বিভাগ। পৌর কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা গোলাম সারোয়ার হোসেনের সার্বিক সহযোগিতা ও নিয়মিত পরামর্শ মনিরের আত্মবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সঠিক সময়ে বীজ বপন, চারা তৈরি এবং জমি প্রস্তুত করার প্রতিটি ধাপে কৃষি কর্মকর্তার দিকনির্দেশনা মনিরের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেয়।
চাষের শুরুর দিনগুলো ছিল বেশ সম্ভাবনাময়। মনির হোসেন জানান, যখন কপির চারাগুলো জমিতে রোপণ করা হয়েছিল, তখন খেতের চেহারা ছিল দারুণ চমৎকার। সারিবদ্ধ সবুজ চারাগুলো দেখে মন জুড়িয়ে যেত যেকোনো মানুষের। এক বুক আশা নিয়ে কপির পরিচর্যা করে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু প্রকৃতির হিসাব কিতাব সব সময় মানুষের সঙ্গে মেলে না। মাঝপথে এসে হানা দেয় অসময়ের অতি বৃষ্টি। টানা ভারী বর্ষণে কপির খেতে জলবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, যা এই চাষের জন্য সবচেয়ে বড় শত্রু। অতি বৃষ্টির কারণে খেতের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। অনেক চারা নষ্ট হয়ে যায়, যা মনিরের মনে কিছুটা হতাশার জন্ম দিয়েছিল।
তবে কঠোর পরিশ্রম আর সঠিক নির্দেশনার জোরে সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছেন মনির। শত বিপর্যয়ের পরও তার যত্নে বেঁচে থাকা ফুলকপি গাছগুলোতে এখন সাদা ফুল আসতে শুরু করেছে। খেতে খেতে ফুটে থাকা এই অসময়ের ফুলকপি যেন মনিরের কষ্টের সার্থক রূপ। এরমধ্যেই তিনি খেত থেকে ফুলকপি তোলা এবং বাজারে বিক্রি করার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করে দিয়েছেন।
সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, অসময়ে বাজারে এই সবজির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাজারে শীতকালীন সবজির প্রাপ্যতা না থাকায় মনির হোসেন তার উৎপাদিত ফুলকপি বিক্রি করছেন প্রতি কেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকা দরে। ভালো দাম পাওয়ায় খেতের প্রাথমিক ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে যাচ্ছে। ২৪ শতাংশ জমিতে এই ফুলকপি চাষ করতে মনিরের মোট খরচ হয়েছিল মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। বৃষ্টির কারণে কিছুটা উৎপাদন কম হলেও বর্তমান বাজারের চড়া দাম তাকে বড় ধরনের লোকসানের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কৃষক মনির হোসেনের মুখে এখন স্বস্তির হাসি। তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে হয়তো লাভের অংকটা আরও অনেক বড় হতে পারত। তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি মোটেও অসন্তুষ্ট নন। তার মতে, লোকসান হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, হয়তো লাভের পরিমাণ প্রত্যাশার চেয়ে কিছুটা কম হবে। কিন্তু এই প্রতিকূলতার মাঝেও যে লাভ করা সম্ভব, সেটাই তার সবচেয়ে বড় পাওয়া। চান্দিনার এই চিত্র প্রমাণ করে যে, সঠিক সময়ে সঠিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষি বিভাগের সময়োপযোগী পরামর্শ পেলে যেকোনো বাধা টপকে যাওয়া সম্ভব।