পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেককে মারধর

প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এত দিন ‘যুবরাজ’ বলে চিহ্নিত তৃণমূল কংগ্রেসের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে মারধর করা হয়েছে। গত শনিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সোনারপুরে হামলার শিকার হন লোকসভার সদস্য অভিষেক। এ ঘটনার জন্য বিজেপির বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলটি বলেছে, পরিকল্পনামাফিক এ ঘটনা রাজ্যের শাসক দল ঘটিয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, কিছু লোক অভিষেককে যথেচ্ছভাবে কিল-চড়, ঘুষি মারছে। এ ঘটনা ঘটার সময় কাছ থেকে ডিম ছুড়েও তৃণমূল নেতাকে মারা হয়। এদিন দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে নিহত দলীয় কর্মী সঞ্জু কর্মকারের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পথে প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়েন তৃণমূলের শীর্ষস্থানীয় নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সোনারপুরের একটু আগে নারীরা তাঁকে কালো পতাকা দেখান আর সোনারপুরে ঢোকার পরে শুরু হয় ডিমের বৃষ্টি। বহু মানুষ জড়ো হয়ে ‘চোর চোর’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। ধারাবাহিকভাবে ডিম ছোড়ার ফলে অভিষেকের পোশাক বেশ খানিকটা হলুদ হয়ে যায়। তিনি গাড়ি থেকে নেমে একটি বাইকে চড়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর বাইক ঘিরে ধরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। তিনি মাথায় হেলমেট পরে নেন। সেটারই ওপরেই ডিমের বৃষ্টি চলতে থাকে। হেলমেট ও জামাকাপড় হলুদ হয়ে যায়। একপর্যায়ে মারতে মারতে তাঁর জামাও ছিঁড়ে ফেলা হয়। এ সময় দলীয় নেতাকর্মী ও কিছু নিরাপত্তারক্ষী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এরপরে সোনারপুরে নিহত তৃণমূল কর্মী সঞ্জু কর্মকারের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে তাকে ঘিরে ধরেন সাংবাদিকেরা। অভিষেক বলেন, ‘এই হলো ডাবল ইঞ্জিন (সরকারের) নমুনা। সবাই চেয়েছিল, ডাবল ইঞ্জিন হোক (ডাবল ইঞ্জিন অর্থাৎ কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার) ওরা চায়, আমাদের মেরে ফেলতে। মারুক। আমার মৃতদেহ এখান থেকে বেরোবে।’

হামলার ভয়াবহতা তুলে ধরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমার মাথাটা বেঁচে গেল শুধু হেলমেট ছিল বলে। পুলিশ কোথাও নেই। সব ঘটনার ভিডিও রেকর্ড রইল। পুলিশকে খবর দেওয়া হোক। আমি এখান থেকে বেরিয়ে যেতেই পারি। কিন্তু এই পরিবারের ওপর হামলা হবে আমি বেরিয়ে যাওয়ার পরে। আমি এখন এদের ছেড়ে যেতে পারব না। নিরাপত্তা বাহিনী পাঠিয়ে আগে এদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।’ হামলায় অভিষেকের চশমা, ঘড়ি ইত্যাদি ভেঙে গেছে বলে স্থানীয় প্রচারমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।

এ হামলা রাজনৈতিক নেতা হিসেবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুনর্জন্ম ঘটাবে বলে মন্তব্য করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক ও অন্যতম মুখপাত্র কুনাল ঘোষ। তিনি বলেছেন, ‘সম্পূর্ণ চক্রান্ত করে সংগঠিত ও পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে। এই একইভাবে হামলা চালানো হয়েছিল ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর ওপরে। অভিষেকের মতোই তারও নিরাপত্তা তুলে নেওয়া হয়েছিল এবং তার কী ফল হয়েছিল, তা আমরা দেখেছি।’

‘এ হামলার ফলে অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের পুনর্জন্ম ঘটল। এত দিন যাকে অভিহিত করা হতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো বলে, আজ তার ওপর আক্রমণ করে তার নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হলো। আজকে যে লড়াই হলো- সেই স্নায়ুযুদ্ধকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অতিক্রম করে গেছেন এবং এর মধ্য দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসে একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।’ হামলার নিন্দা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, শাসক ঘাতকে পরিণত হয়েছে।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার ঘটনা নিয়ে ক্ষমতাসীন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘এসবের মধ্যে বিজেপি নেই। এ ধরনের ঘটনা সুস্থ, স্বাভাবিক, গণতান্ত্রিক পরিবেশে হয় না। আজ বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে বলেই তৃণমূলের নেতারা অক্ষত রয়েছেন। ওরা যে পরিমাণ অত্যাচার মানুষের ওপর করেছে, আমাদের জেলা সভাপতি, আমাদের দলের কর্মীদের ওপর করেছে, তারপর আমরা ছিলাম বলেই ওদের বিধায়ক-সাংসদেরা এখনও এ অবস্থায় আছেন। অন্য কোনো দল থাকলে এতক্ষণ সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে বলার সুযোগ পেতেন না।’

এ ঘটনার পরে সন্ধ্যায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে হুইলচেয়ারে বসিয়ে শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করানো হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা আজ রাতে হাসপাতালে তাকে দেখতে গেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-নেত্রীদের বক্তব্য থেকে পরিষ্কার, শীর্ষস্থানীয় নেতার ওপর এ হামলার ঘটনাকে সামনে রেখে আপাতত তারা প্রতিবাদের রাজনীতি শুরু করবেন।

একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে হকার উচ্ছেদ ও বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পে নতুন করে নাম নথিভুক্তিকরণের বিষয়টি নিয়ে পথে নামবে তৃণমূল কংগ্রেস। ২ মাস ধরে সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোয় অর্থসহায়তা পাচ্ছেন না নারীরা, এ নিয়ে এরমধ্যেই গরম হয়ে উঠেছে রাজ্য রাজনীতি। এরপরে তৃণমূল কংগ্রেস, যাদের এখনও ৪০ শতাংশ ভোট রাজ্যে রয়েছে, তারা পথে নামলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আবার নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন রাজ্য রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা।

তৃণমূল কংগ্রেসের আরও এক এমপির ওপর হামলা : তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা অভিষেক ব্যানার্জী হামলার শিকার হওয়ার একদিন পর পশ্চিমবঙ্গে দলের আরেক সংসদ সদস্য কল্যাণ ব্যানার্জী নিজ নির্বাচনি এলাকায় হামলার মুখে পড়েছেন। গতকাল রোববার সকালে হুগলির চণ্ডীতলায় একটি কর্মসূচিতে অংশ নিতে গেলে তার ওপর হামলা করা হয় ঘটনাস্থলের ভিডিওতে দেখা যায়, ভিড় নিয়ন্ত্রণে পুলিশ চেষ্টা চালানোর সময় হঠাৎ মাথায় আঘাত পেয়ে তিনি মাথা চেপে ধরে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

শ্রীরামপুরের সংসদ সদস্য কল্যাণ ব্যানার্জীকে কালো পতাকা দেখানো হয় এবং ‘চোর চোর’ স্লোগান দেওয়া হয়। আগের দিন দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধেও একই ধরনের বিক্ষোভ দেখা গিয়েছিল। তবে কল্যাণ ব্যানার্জী দাবি করেছেন, এটি স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ নয়। তার অভিযোগ, এর পেছনে রয়েছে বিজেপি। যদিও এ বিষয়ে বিজেপির তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

পোস্ট-পোল সহিংসতার অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় থানায় স্মারকলিপি জমা দিতে রোববার সকালে চণ্ডীতলায় যান কল্যাণ ব্যানার্জী ও তার সমর্থকেরা। এ সময় একটি ট্রাকের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ পেছন থেকে কোনো বস্তু এসে তার মাথায় আঘাত করে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভিডিওতে দেখা যায়, আঘাত পাওয়ার পর তিনি মাটিতে পড়ে যান। পরে পুলিশ তাকে ঘিরে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। কিছু সময় পর তিনি উঠে দাঁড়ালেও ভারসাম্য রাখতে পারছিলেন না। পরে মাথায় সাদা কাপড় বেঁধে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। তিনি দাবি করেন, তার মাথায় ক্রিকেট বল অথবা পাথর ছোড়া হয়েছিল। তিনি ঘটনাটিকে হত্যাচেষ্টা বলে উল্লেখ করে বিজেপিকে দায়ী করেন।

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, যানজটের কারণে গাড়ি রেখে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এ সময় ১০-১৫ জন ব্যক্তি স্লোগান দিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করে এবং গালাগাল শুরু করে। এরপর তার মাথা লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া হয়। তিনি বলেন, আমার কুর্তা ও পাজামায় রক্ত লেগে যায়। আমি রাস্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। তখন কেন্দ্রীয় বাহিনীর এক সদস্য এসে আমাকে উদ্ধার করেন।

কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে নীরব দর্শক বলে সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে এবং তৃণমূল নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। এর একদিন আগে সোনারপুরে পোস্ট-পোল সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত দলীয় কর্মীদের দেখতে গিয়ে হামলার মুখে পড়েন অভিষেক ব্যানার্জী। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর ভাতিজা অভিষেককে ঘিরে বিক্ষোভকারীরা ধাক্কাধাক্কি করে, ডিম ও পাথর নিক্ষেপ করে এবং ‘চোর চোর’ স্লোগান দেয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে ক্রিকেট হেলমেট পরিয়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। পরে তাকে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা জানান, তার আঘাত গুরুতর নয়। মমতা দাবি করেন, হেলমেট না থাকলে অভিষেকের প্রাণহানিও ঘটতে পারতো। তিনি ও অভিষেক দুজনই হামলার জন্য বিজেপিকে দায়ী করেন। তবে বিজেপি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, এটি কোনো রাজনৈতিক হামলা নয়; বরং দীর্ঘদিনের শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।