ঢাকা বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সুসংবাদ প্রতিদিন

সিংড়ায় আঙুর চাষে বাণিজ্যিক সাফল্য

সিংড়ায় আঙুর চাষে বাণিজ্যিক সাফল্য

সাধারণত আঙুর চাষের কথা উঠলেই চোখে ভেসে ওঠে ইউরোপের বিস্তীর্ণ মাঠ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমির বাগান। দেশের মাটিতে মিষ্টি আঙুর চাষ করা অসম্ভব এমন প্রচলিত ধারণাও কম-বেশি সবার মনে ছিল। তবে সেই চেনা ছক ও ধারণা সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছেন নাটোরের সিংড়া উপজেলার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষিপ্রেমী শিক্ষক। শখের বসে ইউটিউব দেখে শুরু করা তার আঙুর চাষের উদ্যোগ আজ রূপ নিয়েছে এক সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক বাগানে। তার এই অভাবনীয় সাফল্য এখন জেলাজুড়ে নতুন এক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে। নাটোরের সিংড়া উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের বাসিন্দা ও পেশায় কৃষি শিক্ষক আব্দুল আজিজ। ছাত্রজীবন থেকেই মাটির প্রতি তার ছিল অন্যরকম এক টান। এর আগে পটল, ড্রাগন, আপেল কুল ও ভারত কুল চাষে সফলতা পেয়ে এলাকায় বেশ নাম কুড়িয়েছেন। তবে এবার তিনি নতুন স্বপ্ন বুনেছিলেন আঙুরকে ঘিরে।

মাত্র ৯ মাস আগে বাড়ির পাশের প্রায় ১ বিঘা পতিত জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি আঙুরের চারা রোপণ করেন আজিজ। চাষাবাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা না থাকায় ভরসা করেন ইন্টারনেটে। ইউটিউব ঘেঁটে প্রতিনিয়ত শেখেন চাষের কলাকৌশল ও গাছের পরিচর্যা। শুরুতে আবহাওয়া ও রোগবালাই নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও তার ধৈর্য, অক্লান্ত পরিশ্রম আর বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনায় শেষ পর্যন্ত মিলেছে সাফল্য। আব্দুল আজিজের বাগানে গিয়ে দেখা যায় এক চোখ জুড়ানো দৃশ্য। মাচায় মাচায় দোল খাচ্ছে থোকায় থোকায় রঙিন আঙুর। বাগানটিতে বর্তমানে বাইকুনুর, সামার রয়েল, ডিক্সন, গ্রীন লং, ব্ল্যাক ম্যাজিক এই পাঁচ ধরনের উন্নত জাতের আঙুর রয়েছে। শুরুতে বাড়ির আঙিনায় মাত্র ৪টি ‘বাইকুনুর’ জাতের চারা রোপণ করেছিলেন তিনি। সঠিক পরিচর্যার পর মাত্র একটি গাছ থেকেই পান ৭ থেকে ৮ কেজি ফল। প্রথম চালানের এই মিষ্টি স্বাদ ও বাম্পার ফলনই বদলে দেয় তার চিন্তা-ভাবনা। এরপরই তিনি বড় পরিসরে ১ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে এই বাগান গড়ে তোলেন।

উদ্যোক্তা ও শিক্ষক আব্দুল আজিজ বলেন, ‘শুরুতে এটা শুধুই একটা শখ ছিল। কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছি এটি অত্যন্ত লাভজনক ও সম্ভাবনাময় একটি খাত। সঠিক পরিচর্যা ও সঠিক জাত নির্বাচন করলে আমাদের দেশের মাটিতেও আঙুরের বাম্পার ফলন সম্ভব। বাজার পরিস্থিতি ও দাম অনুকূলে থাকলে এই মৌসুমেই প্রায় ৯ লাখ টাকার আঙুর বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি। শিক্ষক আজিজের এই ব্যতিক্রমী ও সফল উদ্যোগের খবর ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে স্থানীয় কৃষক, ফল চাষি ও উৎসুক সাধারণ মানুষ ভিড় করছেন তার বাগান দেখতে। অনেকেই সশরীরে এসে গাছের ফলন দেখে অভিভূত হচ্ছেন। বাগান দেখার পাশাপাশি তারা আজিজের কাছ থেকে নিচ্ছেন চাষের পরামর্শ এবং কিনে নিয়ে যাচ্ছেন চারা গাছ। বাগানে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীর মধ্যে ফজলে রাব্বী, আবু জাফর সিদ্দিকী, শহিদুল ইসলাম সুইট জানান, মোবাইল বা টিভিতে বহুবার আঙুর বাগান দেখেছি। কিন্তু নিজের এলাকায় এসে সরাসরি গাছের মাচায় এত আঙুর ঝুলতে দেখব, তা ভাবিনি। ফলগুলো দেখতেও যেমন সুন্দর, খেতেও মিষ্টি। আমরাও এখান থেকে চারা নিয়ে বাড়িতে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

স্থানীয়দের মতে, আজিজের দেখাদেখি যদি এই অঞ্চলে আঙুর চাষ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা যায়, তবে নাটোরের স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য জেলাতেও এই ফল সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে করে বৈদেশিক ফল আমদানির ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে। দেশের মাটিতে আঙুর চাষের এই সাফল্যকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে দেশের বিভিন্ন এলাকাতেই পরীক্ষামূলকভাবে আঙুর চাষ ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ বলেন,গত বছরও সিংড়ায় পরীক্ষামূলকভাবে আঙুর চাষে বেশ ভালো সফলতা পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ‘বাইকুনুর, সামার রয়েল, ডিক্সন, গ্রিন লং ও ব্ল্যাক ম্যাজিক’ জাতের আঙুরের ফলন ছিল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে বাংলাদেশের মাটিতে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের মাটিতেও যে সফলভাবে মিষ্টি আঙুর উৎপাদন সম্ভব, তা নিজের হাত দিয়ে প্রমাণ করেছেন শিক্ষক আব্দুল আজিজ। তার এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের মাঝে নতুন করে আশার আলো ও তুমুল আগ্রহ তৈরি করেছে।

শুধুমাত্র শখ নয়, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে যে কৃষিতে নতুন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেওয়া যায়, তার জীবন্ত উদাহরণ আব্দুল আজিজ। এই শিক্ষকের হাত ধরে নাটোরের সিংড়ার মাটিতে আজ যে নতুন স্বপ্নের বীজ বোনা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ফল উৎপাদনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে- এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত