সুসংবাদ প্রতিদিন

মাছের পোনায় ফিরছে সচ্ছলতা

প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ওসমান গনি, চান্দিনা (কুমিল্লা)

কুমিল্লার চান্দিনার বদরপুর গ্রামটি দিনের অন্য সময়ে শান্ত-স্নিগ্ধ রূপ নিয়ে থাকলেও, ভোরের আলো ফোটার আগেই সেখানে এক অন্যরকম কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয়। চারপাশের স্তব্ধতা ভেঙে জেগে ওঠে এক ঐতিহ্যবাহী বাজার। এটি কোনো সাধারণ কাঁচাবাজার বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের হাট নয়, এটি রূপালি স্বপ্নের হাট, মাছের পোনা বিক্রির এক বিশাল সমাহার। প্রতিদিন সকালে এই হাটে ঢল নামে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের, যেখানে নিমিষেই লাখ লাখ টাকার মাছের পোনা কেনাবেচা হয়ে থাকে। চান্দিনা ও এর আশপাশের এলাকাগুলো মূলত মৎস্য চাষ অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এখানকার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজারো পুকুর আর দীঘিই স্থানীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ফলে এই অঞ্চলে মাছের পোনার চাহিদা সবসময়ই আকাশচুম্বী। আর সেই চাহিদাকে কেন্দ্র করেই বদরপুর বাজারে গড়ে উঠেছে প্রতিদিনের এই মাছের পোনার হাট। প্রতিদিন ভোরে যখন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ঘুমে মগ্ন থাকে, তখন এই হাটে হাজির হন পোনা ব্যবসায়ীরা। তারা বিশাল সব হাঁড়ি, ড্রাম ও আধুনিক পাত্রে করে নিয়ে আসেন হরেক রকমের মাছের পোনা। রুই, কাতল, মৃগেল, পাঙ্গাশ, সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প থেকে শুরু করে হরেক পদের দেশি-বিদেশি মাছের পোনার সমাগম ঘটে এই ছোট্ট বাজারে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পুরো বাজারজুড়ে এক রূপালি রঙের মেলা বসেছে।

বর্তমানে চলছে জ্যৈষ্ঠ মাস। মৎস্য চাষিদের ভাষায় এটি মাছের পোনা ছাড়ার এক অন্যতম উপযুক্ত সময়। বাজারে কথা হয় নিয়মিত পোনা বিক্রেতা কাউছার ও জাকির হোসেনের সাথে। তারা জানান, মাছ চাষের একটি নির্দিষ্ট চক্র রয়েছে। সাধারণত প্রতি বছর চৈত্র ও বৈশাখ মাসে চাষিরা তাদের পুকুরের বড় মাছগুলো বিক্রি করে দেন। এরপর পুকুর সেচে, চুন ও সার দিয়ে পানি নতুন করে প্রস্তুত করা হয়। জ্যৈষ্ঠ মাস আসতেই শুরু হয় নতুন করে মাছের পোনা ছাড়ার উৎসব। চাষিদের এই বিপুল চাহিদার কথা মাথায় রেখেই বিভিন্ন অঞ্চলের হ্যাচারি ও বড় পুকুর থেকে সংগৃহীত মানসম্মত পোনা নিয়ে বিক্রেতারা প্রতিদিন ছুটে আসেন বদরপুর বাজারে। জ্যৈষ্ঠের এই উত্তপ্ত দিনেও সকালের মৃদু বাতাসে ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখরিত থাকে পুরো এলাকা।

এই হাটের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান এবং সহজলভ্যতা। বদরপুর বাজারটি মূলত একটি গ্রামীণ পরিমণ্ডলে অবস্থিত হওয়ায় এখানে শহরের মতো অতিরিক্ত খাজনা বা বাড়তি খরচের ঝামেলা নেই। ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষই অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে এবং কম খরচে মাছের পোনা কেনাবেচা করতে পারেন। দূর থেকে আসা পাইকারদের পাশাপাশি স্থানীয় ক্ষুদ্র চাষিরাও এখানে ভিড় করেন।

হাটে মাছের পোনা কিনতে আসা তাজুল ইসলাম নামের এক অভিজ্ঞ মৎস্য চাষি জানান, এই হাটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো- এটি বছরের ৩৬৫ দিনই প্রতিদিন সকালে বসে। ফলে চাষিদের পোনা কেনার জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিনের অপেক্ষা করতে হয় না। পুকুর প্রস্তুত হলেই তারা সরাসরি এখানে চলে আসেন। তাছাড়া গ্রামীণ পরিবেশে বাজারটি হওয়ায় যাতায়াত খরচও অনেক কম। বাজার থেকে পোনা কিনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এবং নামমাত্র খরচে তা পুকুরে নিয়ে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব হয়। পোনা পরিবহনে সময় কম লাগার কারণে মাছের মৃত্যুর হারও প্রায় শূন্যের কোঠায় থাকে, যা চাষিদের জন্য এক মস্ত বড় স্বস্তির বিষয়।

বদরপুরের এই মাছের পোনার হাট শুধু একটি বাজারই নয়, এটি স্থানীয় হাজারো মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস। পোনা উৎপাদনকারী, মধ্যস্বত্বভোগী, পরিবহন শ্রমিক এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী,? সবাই এই হাটকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনছেন। চান্দিনার এই রূপালি বিপ্লব গ্রামীণ অর্থনীতিকে যেমন সচল রাখছে, তেমনি দেশের আমিষের চাহিদা পূরণেও রাখছে এক অনবদ্য ভূমিকা। প্রতিদিন সকালের এই কর্মব্যস্ততা যেন শুধু মাছের পোনা বিক্রি নয়, বরং এক একটি পুকুরে নতুন করে সমৃদ্ধির বীজ বুনে দেওয়ার এক নিরন্তর মহোৎসব।